বিএনপি ইশতেহারের ‘ডিসক্লেইমার’ কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিএনপির ইশতেহার ঘোষণাফাইল ছবি

নির্বাচনী ইশতেহার অনেকটা রাজনীতিকদের ‘স্বপ্নের দলিল’। আকাশের চাঁদ হাতে এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যেমন ইশতেহারে থাকে, উন্নয়নের জোয়ারে ভাসিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারও আমরা দেখেছি। নির্বাচনের আগে প্রতিটি দলই সুপাঠ্য, আকর্ষণীয় এবং জনতুষ্টিবাদী ইশতেহার ঘোষণা করে। বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রধান দলগুলো ইশতেহার ঘোষণা করল।

সর্বশেষ শুক্রবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন দলের ইশতেহার ও রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা ঘোষণা করলেন, তখন তিনি শেষে একটি ‘ডিসক্লেইমার’ বা সতর্কবার্তা যুক্ত করলেন। তিনি স্পষ্ট বললেন, দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে না পারলে কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

ইশতেহারের বাইরের এ কথাটিই মনে হয়েছে আসল কথা। দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয়ের অনুপস্থিতিতে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি বা প্রযুক্তির যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, তা বালুর বাঁধের মতো ভেসে যাবে। এটি তারেক রহমান নিজেও যে ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছেন, সেটি তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট। এখন দেখার বিষয় তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে এর কতটা প্রয়োগ করে। আগামী সরকারের সফলতা বা ব্যর্থতা অনেকাংশে নির্ভর করবে নিজ দলের নেতা–কর্মীদের ওপর এই তিন নীতি কতটা প্রয়োগ করতে পারবে, তার ওপর।

আরও পড়ুন

বিএনপির শীর্ষ নেতার বক্তব্যকে কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। তিনি বাংলাদেশের ভঙ্গুর রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জের একটি নির্মোহ চিত্র উপলব্ধি করেই এ তিন বিষয়ে জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। বিএনপির ইশতেহারে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি, বেকার ভাতা, সাইকেল রাইড শেয়ারিং, ব্যাংকিং কমিশন গঠন, কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের মতো অনেক উচ্চাভিলাষী ও দরকারি প্রতিশ্রুতি আছে। তারেক রহমানের চিহ্নিত ওই তিনটি বিষয়—দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহি অনুপস্থিত থাকলে ইশতেহার কেবল একটি সুলিখিত কাগজের তাড়া হয়েই থাকবে বৈকি।

যেমন বিএনপির ইশতেহারে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, নদী ও খাল খনন এবং ২৫ কোটি গাছ লাগানোর মতো ইতিবাচক পরিকল্পনা আছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা দেখলে বোঝা যায়, নদী দখল, বালু উত্তোলন এবং বনভূমি উজাড় করার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকেন। শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা বা তুরাগ নদের তীরের অবৈধ স্থাপনাগুলো কাদের? অধিকাংশই কোনো না কোনো প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির।

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ‘আইনের শাসন’ কি এই রাঘববোয়ালদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? নাকি দল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লুটেরারাও ভোল পাল্টে নতুন সরকারের ‘আশ্রয়’ নেবে?

যদি ‘আইনের শাসন’ কঠোর না হয়, তবে সকালে ঘটা করে গাছ লাগানোর কর্মসূচি হবে, আর রাতে সেই দলেরই স্থানীয় নেতারা ইটভাটার জ্বালানির জন্য বন উজাড় করবে। নদী খননের জন্য ড্রেজার বসানো হবে, কিন্তু সেই ড্রেজার দিয়ে তোলা বালু বিক্রি করে পকেট ভারী করবে দলেরই আরেক অংশ। দখলদার উচ্ছেদ করতে গিয়ে যদি দেখা যায় অপরাধী নিজ দলের নেতা, তখন আইন কি তার নিজস্ব গতিতে চলবে? এই জবাবদিহি নিশ্চিত না করতে পারলে পরিবেশ রক্ষার সব পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে, এমনটি মনে করছেন অনেকে। কিন্তু দলের ভেতরেই যদি এমন কোনো গোষ্ঠী তৈরি হয়, যারা বিদ্যুৎকেন্দ্র বা জ্বালানি তেল আমদানির ‘কমিশন’ খেতে চায়, তবে ‘দুর্নীতি’র বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কি টিকবে? সে ক্ষেত্রে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি ব্যর্থ হতে বাধ্য। এখানে প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহি, যা কেবল কাগজে নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।

আরও পড়ুন

ইশতেহারে আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, রেল ও নৌপথের উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পের সমার্থক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘দুর্নীতি’ আর ‘দীর্ঘসূত্রতা’। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বালিশ–কাণ্ড কিংবা ফরিদপুর মেডিকেলে পর্দার দাম—এসব ঘটনা দুর্নীতির ভয়াবহতাকে নির্দেশ করে। এ ছাড়া রাস্তার কাজে রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার বা পিচ ঢালাইয়ের দুদিন পরেই রাস্তা উঠে যাওয়ার নজির অহরহ। এসবের মূলে রয়েছে ঠিকাদারি সিন্ডিকেট, যারা স্থানীয় এমপি বা মন্ত্রীদের আশীর্বাদপুষ্ট।

ইশতেহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে এই ‘কমিশন বাণিজ্য’ বন্ধ করতে হবে। তারেক রহমান যে ‘দুর্নীতি’ ও ‘জবাবদিহি’র কথা বলেছেন, তা এখানে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক। যদি দলীয় নেতা–কর্মীরা ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে এবং কাজের মান যা-ই হোক বিল তুলে নেয়, তবে হাজার কোটি টাকার বাজেট দিয়েও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ঠিকাদার যদি দলের লোক হয়, তবু কি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে? এই প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে অবকাঠামো উন্নয়নের ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন

ইশতেহারে বিএনপি ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সুশাসন ফেরানোর কথা বলেছে। একটি ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠনের অঙ্গীকারও করা হয়েছে। শুনতে চমৎকার। কিন্তু গত এক দশকে আমরা দেখেছি, কীভাবে ব্যাংকিং খাতকে ‘পারিবারিক সম্পত্তি’তে রূপান্তর করা হয়েছে। হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে, আর দেশে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমেছে। এসবের সঙ্গে জড়িত কারা? অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, যাঁরা সরকারের ঘনিষ্ঠ কিংবা দলের দাতা।

এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ‘আইনের শাসন’ কি এই রাঘববোয়ালদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে? নাকি দল পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে লুটেরারাও ভোল পাল্টে নতুন সরকারের ‘আশ্রয়’ নেবে? ইশতেহারে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও পুলিশি হয়রানি বন্ধের অঙ্গীকার করা হয়েছে। এটি বর্তমান সময়ে জনগণের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু অতীতে আমরা দেখেছি, পুলিশ প্রশাসনকে রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার না বানিয়ে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পোস্টিং, প্রমোশন—সবকিছুই হয়েছে দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে।

তারেক রহমান ‘আইনের শাসন’-এর ওপর জোর দিয়েছেন। এর অর্থ হলো, পুলিশ কেবল বিরোধী দলকে দমন করবে না, নিজ দলের কেউ অপরাধ করলেও তাকে ছাড় দেবে না। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে যদি বিএনপিও পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী মত দমন করতে শুরু করে এবং নিজেদের নেতাকর্মীদের ‘সাত খুন মাফ’ করে দেয়, তবে লক্ষ্য অর্জিত হবে না। থানার ওসি যদি আইনের চেয়ে স্থানীয় নেতার ফোনের নির্দেশকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তবে সুশাসন অধরাই থেকে যাবে।

গাছ কাটা, নদী দখল, টেন্ডারবাজি বা ব্যাংক লুট—সবকিছুর মূলেই থাকে রাজনৈতিক প্রশ্রয়। অতীতে আমরা দেখেছি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় গিয়ে নিজেদের নেতা–কর্মীদের আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। যদিও বিএনপিকে এ ক্ষেত্রে আলাদা করা যায়। কারণ, দলের নেতা–কর্মীদের শাস্তির মুখোমুখি করার নজির বিএনপি দেখিয়েছে। আশার কথা হলো তারেক রহমানের বক্তব্যে মনে হয়েছে তিনি শুধু বলছেন না, করে দেখাবেন। কারণ তিনি বলেছেন, যেকোনো মূল্যে দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবেন।

  • ফারুক হোসাইন লেখক ও স্বাধীন গবেষক

    ইমেইল: [email protected]

    *মতামত লেখকের নিজস্ব