সনদ থেকে কর্মসংস্থান: দক্ষতা উন্নয়নের প্রকৃত পরীক্ষা

সম্প্রতি চট্টগ্রাম সফরে এক তরুণের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। তিনি মেকানিক্যাল প্রযুক্তিতে চার বছরের ডিপ্লোমা করেছেন। হাতে সনদ আছে, নিজের অর্জন নিয়ে তিনি গর্বিতও। কিন্তু তিন মাস পেরিয়ে গেলেও তাঁর চাকরি হয়নি।

আমি জানতে চাইলাম, কেন? তিনি বললেন, ‘স্যার, বইয়ে যা ছিল, তা–ই শিখেছি। কিন্তু কারখানায় আসলে কী দক্ষতা প্রয়োজন, সেটা জানি না।’

এই একটি বাক্যের মধ্যেই বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তরুণদের যা শেখানো হচ্ছে এবং শিল্পকারখানা ও নিয়োগদাতারা যা খুঁজছেন—এই দুইয়ের মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই বাংলাদেশের জনমিতির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অন্যতম প্রধান বাধা।

একটি সনদ তখনই অর্থবহ, যখন তা নিয়োগদাতার কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ একজন কর্মীর হাতে যে সনদ রয়েছে, সেটি দেখে নিয়োগদাতা নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি সত্যিই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করেছেন। কিন্তু এ আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন দক্ষতার মানদণ্ড স্পষ্ট থাকে, মূল্যায়ন নির্ভরযোগ্য হয় এবং সেই যোগ্যতা দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও শিল্প খাতে সমানভাবে স্বীকৃত হয়। এ কারণেই বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্ক (বিএনকিউএফ) এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও শিল্প খাতের মধ্যে দক্ষতার একটি অভিন্ন ভাষা তৈরি করে, যা সনদের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ায়।

যেদিন আমরা অধিকাংশ তরুণের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নের উত্তর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারব, সেদিনই বলা যাবে যে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করেছে।

প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। অথচ ১৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ-তরুণী না কর্মসংস্থানে আছেন, না শিক্ষা বা প্রশিক্ষণে যুক্ত। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি লাখ লাখ অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। তাই আমাদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত কতজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো, তা নয়; বরং সেই প্রশিক্ষণ কতজনকে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথে নিয়ে গেল।

এ লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থায় অন্তত তিনটি পরিবর্তন জরুরি। প্রথমত, প্রশিক্ষণব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করতে হবে। কোন খাতে কী ধরনের দক্ষতার প্রয়োজন, সে সিদ্ধান্তে নিয়োগদাতাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা থাকতে হবে। পাঠক্রম তৈরি হবে কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতা, পেশাগত মানদণ্ড ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের চাহিদা সামনে রেখে।

আরও পড়ুন

দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে অর্জিত দক্ষতার যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে। অনেক পোশাকশ্রমিক, প্রত্যাগত অভিবাসী কিংবা দীর্ঘদিন কাজ করা নারী আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না পেলেও বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মূল্যবান দক্ষতা অর্জন করেন। রেকগনিশন অব প্রায়র লার্নিংয়ের (আরপিএল) মাধ্যমে সেই দক্ষতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া গেলে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ ছাড়াই তাঁদের জন্য কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ার উন্নয়নের নতুন সুযোগের সৃষ্টি হতে পারে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ করার সক্ষমতা, ডিজিটাল সাক্ষরতা ও নতুন কিছু শেখার আগ্রহ—এসব দক্ষতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়োগদাতারা প্রায়ই বলেন, একই ধরনের সনদধারী দুজন প্রার্থীর মধ্যে পার্থক্য গড়ে দেয় এসব দক্ষতাই।

তবে দক্ষতার উন্নয়ন কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়। সরকার, শিল্প খাত, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী ও সামাজিক অংশীদার—সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ পরিচালনা করতে হবে আর নতুন শিল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগের পরিকল্পনার শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি তৈরির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

একই সঙ্গে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যেন কেউ পিছিয়ে না থাকেন। অনেক তরুণীর জন্য এখনো নিরাপদ ও সহায়ক প্রশিক্ষণ পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রায়ই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উপযোগী প্রশিক্ষণসামগ্রীর অভাবে মূলধারার দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির বাইরে থেকে যান। আবার প্রতিবছর হাজার হাজার প্রত্যাগত অভিবাসী দেশে ফিরে এলেও বিদেশে অর্জিত তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ ব্যবহার হয় না। অথচ এই তিনটি ক্ষেত্রেই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে উল্লেখযোগ্য সুফল বয়ে আনতে পারে।

শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তরুণ থেকে অভিজ্ঞ সবাইকে জীবনব্যাপী শেখার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাফল্যও শুধু ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে নয়; বরং কতজন সম্মানজনক কর্মসংস্থান পেয়েছেন, সে সূচকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। উন্নয়ন সহযোগীদেরও জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিনিয়োগ ও কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে, যাতে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে একটি সমন্বিত জাতীয় দক্ষতাব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। এখন প্রয়োজন এমন একটি দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থা, যা প্রতিটি সনদকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করবে। শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের কাছে একটি প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এ প্রশিক্ষণ কি একজন মানুষকে সম্মানজনক কাজ পেতে সহায়তা করেছে?

যেদিন আমরা অধিকাংশ তরুণের ক্ষেত্রে এ প্রশ্নের উত্তর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারব, সেদিনই বলা যাবে যে বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নব্যবস্থা তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), সরকার, নিয়োগদাতা, শ্রমিক সংগঠন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সেই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কারণ, যে সনদ একজন তরুণকে কর্মসংস্থানের পথে এগিয়ে নিতে পারে না, সেটি শুধু একটি কাগজ নয়, এটি অপূর্ণ থেকে যাওয়া একটি প্রতিশ্রুতি।

  • ম্যাক্স টুনন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর