রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া নিয়ে দায়িত্বহীনতা কেন

সর্বোচ্চ বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ছবি: সংগৃহীত

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটে ঢুঁ মারলেই স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা পাওয়া যায়। কোন বছরে কাকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, তা জানাটা মাত্র এক ক্লিকের ব্যাপার। সরকার ৫ মার্চ ১৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কার দিয়েছে। তালিকায় রয়েছে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম (সমাজসেবায়)। তাঁকে আগে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের ওয়েবসাইটেই ঢুঁ মারেন সাংবাদিকেরা। দেখা যায়, ১৯৭৭ সালে তাঁকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এক ব্যক্তিকে দুবার স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া যায় না। বিষয়টি ৫ মার্চই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের দৃষ্টিতে আনা হয়েছিল। তখন একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সংশোধন করা হয়েছে, তবে পুরস্কারের তালিকায় নয়, পুরস্কার দেওয়ার নীতিমালায়। নতুন নীতি অনুযায়ী, একজন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান একবার কোনো ক্ষেত্রে পুরস্কারটি পাওয়ার পর ২৫ বছর অতিবাহিত হলে তাঁদের অন্য কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য আবার স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া যাবে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের অফিস আদেশটি জারি হয়েছে ৮ মার্চ। অন্যদিকে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে দ্বিতীয়বার পুরস্কার দেওয়া হয় তিন দিন আগে, ৫ মার্চ। নিয়ম সংশোধনের আগে দেওয়া পুরস্কার কি বৈধ হলো, এ প্রশ্ন উঠবেই। এতে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মর্যাদা মোটেও ক্ষুণ্ন হবে না, বরং প্রশ্ন উঠবে পুরস্কারের তালিকা তৈরি করা ব্যক্তিদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নিয়ে।

স্বাধীনতা পুরস্কার

প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৬ সালে একুশে পদক ও ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া শুরু হয়। আর রোকেয়া পদক দেওয়া শুরু হয় ১৯৯৫ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে। ১৯৭৭ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পুরস্কারপ্রাপ্তদের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট ৩৮৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়েছে, যেটি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। সর্বোচ্চ সংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুরস্কারটি দেওয়া হয়েছে এবার ২০২৬ সালে—২০ জনকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে প্রতিবছর ১০-১১ জনকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। বিএনপি সরকারের সময়ে (২০০১-২০০৬) গড়ে প্রতিবছর চারজনকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতা পুরস্কার দেয় বছরে গড়ে ১০ জনকে।

নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, সুযোগসন্ধানীরা সরকারকে ‘খুশি’ করার জন্য নানা কাজ করবে, যা আসলে বৃহত্তর সমাজে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা সরকারেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে, যেটা দেখা গিয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। নতুন সরকারের উচিত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং অতি উৎসাহী ও সুযোগসন্ধানীদের সুযোগ না দেওয়া।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালে ৭ জনকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু নতুন বিএনপি সরকার সংখ্যাটি ২০ জনে নিয়ে যায়। এই তালিকায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পাশাপাশি রয়েছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত সংস্থা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নামও। কেউ কেউ বলছেন, স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় যেহেতু আগেই ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম রয়েছে, সেহেতু এবার শুধু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নাম রাখলেই হতো। তাহলে অযথা বিতর্ক তৈরি হতো না। আর সংখ্যা না বাড়িয়ে পুরস্কারের মর্যাদা রক্ষার কথাও বলছেন কেউ কেউ।

খালেদা জিয়াকে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার তিন দিন পরই তাঁকে ‘গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ সম্মাননা দিয়েছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতি স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়ার পর কেন খালেদা জিয়াকে সরকারেরই একটি মন্ত্রণালয় আবার অপেক্ষাকৃত সাধারণ একটি স্বীকৃতি দেবে, তা নিয়ে সমালোচনা করছেন কেউ কেউ। খালেদা জিয়াকে নিয়ে এই বিতর্কের ক্ষেত্র তৈরি করার তো কোনো প্রয়োজন ছিল না।

অনেকের আশঙ্কা, নামকরণ ও পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার প্রবণতা আবার ফিরে আসে কি না। অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৬ বছরে দেশের ৯৭৭টি অবকাঠামো ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর পরিবার ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের নামে। 

আরও পড়ুন

বাংলা একাডেমি পুরস্কার বিতর্ক

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫-এর জন্য মনোনীত হয়েছিলেন কবি মোহন রায়হানসহ ৯ জন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত অন্যদের এ পুরস্কার তুলে দেওয়া হলেও মোহন রায়হানকে দেওয়া হয়নি। মোহন রায়হান বলেছেন, ৪১ বছর আগে তাঁর রচিত একটি কবিতাকে অজুহাত করে তাঁর পুরস্কার স্থগিত করা হয়।

সমালোচনার মুখে ২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি জানায়, মোহন রায়হানকে পুরস্কারটি দেওয়া হবে। তবে পরে মোহন রায়হান জানান, তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিতে চান। গতকাল বুধবার পর্যন্ত তাঁর পুরস্কার হস্তান্তর করার খবর পাওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে ২০২৪ সালের ১১ আগস্টের একটি ঘটনা স্মরণ করা যায়। সেদিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কার্টুনিস্ট মেহেদি হকের একটি কার্টুন নিজের ফেসবুক পেজে শেয়ার করেছিলেন। কার্টুনটিতে তারেক রহমানকে ব্যঙ্গ করা হয়েছিল। তবে তারেক রহমান সেটি শেয়ার করে লিখেছিলেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্টুন আঁকার স্বাধীনতা ফিরে এসেছে দেখে আমি গভীরভাবে আনন্দিত।’

তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার আগেই পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর তাঁর সরকারের একটি মন্ত্রণালয় বাংলা একাডেমি পদক নিয়ে যে কাণ্ডটি করেছে, তা অগ্রহণযোগ্য। হয়তো সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নজরে আসার পর মোহন রায়হানকে বাংলা একাডেমি পুরস্কারটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কী হয়, সেটা দেখার বিষয়।

নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, সুযোগসন্ধানীরা সরকারকে ‘খুশি’ করার জন্য নানা কাজ করবে, যা আসলে বৃহত্তর সমাজে গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা সরকারেরই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে, যেটা দেখা গিয়েছিল বিগত সরকারের আমলে। নতুন সরকারের উচিত এসব বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং অতি উৎসাহী ও সুযোগসন্ধানীদের সুযোগ না দেওয়া।

রাজীব আহমেদ প্রথম আলোর হেড অব ডিপ নিউজ

* মতামত লেখকের নিজস্ব