ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প যেভাবে পুতিনের সঙ্গেও যুদ্ধে জড়িয়ে গেলেন

আলাস্কায় ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনফাইল ছবি

ইরানের আয়াতুল্লাহদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সামলাতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাঁধে চাপ কম ছিল না। এর মধ্যেই নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মার্কিন গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, রাশিয়া তেহরানকে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। ফলে স্পষ্টভাবে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্প একই সঙ্গে মস্কোর বিরুদ্ধেও এক প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন।

হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকে রাশিয়ার সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ককে দ্ব্যর্থক বললেও কম বলা হয়। ইরান সংঘাতের শুরুতেই ট্রাম্প প্রায় এক ঘণ্টা ধরে পুতিনের সঙ্গে নানা বিষয়ে আলোচনা করেন। এরপর থেকেই ইউক্রেন বিষয়ে তাঁর অবস্থান নিয়ে ইউরোপীয় মহলে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

ইউক্রেনে মস্কোর লক্ষ্য স্পষ্ট—পূর্বাঞ্চলীয় দনবাস পুরোপুরি দখল করা। কিন্তু ইরান নিয়ে ক্রেমলিনের কৌশল ততটা সরল নয়। রাশিয়া ও ইরান একটি বিস্তৃত প্রতিরক্ষাচুক্তির অংশীদার হওয়ার ফলে তেহরান ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে সহায়তা করেছে। তবু আয়াতুল্লাহদের প্রতি ভ্লাদিমির পুতিনের দৃষ্টিভঙ্গি দ্বিধাগ্রস্তই রয়ে গেছে; বিশেষ করে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে। ইরান পরমাণু চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর থেকে পুতিন বরাবরই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পক্ষে জোর দিয়েছেন।

এ ছাড়া গত বছরের মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ অভিযানের সময় (যেখানে মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক অবকাঠামো ধ্বংস করা) তেহরানকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে পুতিনের ব্যর্থতা এটিই প্রমাণ করে যে মস্কো-তেহরান সম্পর্ক আদর্শগত ঘনিষ্ঠতার চেয়ে অনেক বেশি সুযোগসন্ধানী ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট। আর এই সুযোগসন্ধানী মনোভাবই ব্যাখ্যা করে কেন এখন রাশিয়া তেহরানকে এমন গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে, যা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি কিংবা উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করা সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান যখন ইরানের বিরুদ্ধে এক সংকটময় পর্যায়ে পৌঁছেছে, তখন পুতিন সম্ভবত হিসাব কষছেন—তেহরানকে তথ্য দিয়ে তিনি কীভাবে এই যুদ্ধের গতিপথ মস্কোর পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে পারেন। যদি ইরানের সরকার সব প্রত্যাশা ভেঙে টিকে যায়, তাহলে রাশিয়া বলবে—এতেই প্রমাণিত হলো যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও তারা বিশ্বরাজনীতিকে নিজের মতো করে চালাতে পারে না। এতে ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিনের বড় ধরনের দাবিগুলো আরও জোর দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার পথ খুলে যাবে।

গত মাসের শেষে ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করার পর থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা মহলে খবর ছড়ায়—রাশিয়া ইরানকে মার্কিন সেনা, জাহাজ ও বিমান চলাচলের অবস্থান ও গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে। এসব তথ্যের বড় অংশই এসেছে রাশিয়ার উন্নত স্যাটেলাইটের চিত্র থেকে।

এখন আরও তথ্য সামনে এসেছে—সৌদি আরবে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পরিকল্পনায় নাকি মস্কোর সরাসরি ভূমিকা ছিল। ওই হামলায় প্রায় ৩৭০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি ই-৩ সেন্ট্রি রাডার বিমান ধ্বংস হয়, সঙ্গে কয়েকটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অন্যতম সফল হামলা হিসেবে ধরা হচ্ছে। এতে অন্তত ১৫ জন মার্কিন সেনা আহত হন।

ভলোদিমির জেলেনস্কির মতে, এই হামলার আগে ক্রেমলিনের স্যাটেলাইট তিনবার সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটির ছবি তুলেছিল। তাঁর দাবি, এই সফল হামলার পেছনে রুশ গোয়েন্দা সংস্থার বড় ভূমিকা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধে রাশিয়ার এই সরাসরি সহায়তা সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইরানে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার সময় ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে ভাবা জরুরি।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলার ব্যাপারে আগেও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। গত বছরের শেষ দিকে সিরিয়ায় তিনজন মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর তিনি ইসলামিক স্টেটের ঘাঁটিতে একাধিক বিমান হামলা চালান। তাই এবারও তাঁর ওপর রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার চাপ থাকবে। কারণ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক যেমনই হোক, বাস্তবতা হলো পুতিন এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাঁর লক্ষ্য, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিজয় ঠেকানো।

এই পরিস্থিতিতে গত এক বছরে পুতিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আলোচনা চালিয়ে গেছেন, তা আসলে কোনো ফল দেয়নি। তাই বোঝা দরকার—মস্কোর সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহ পুতিনের নেই। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও কড়া হতে হবে। তারা হয় ইউক্রেনকে বেশি সাহায্য দেবে, না হয় ইরানের পক্ষে রাশিয়া যা করছে, সেটা থামানোর চেষ্টা করবে। যেভাবেই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য একটাই—যুদ্ধের একটা স্পষ্ট জয় নিশ্চিত করা। তবে তা সম্ভব হবে কি না, সেটা সময় বলবে।

  • কন কফলিন দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ–এর এক্সিকিউটিভ ডিফেন্স অ্যান্ড ফরেন অ্যাফেয়ার্স এডিটর

    দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত