কয়েক বছর আগে অনেক আরব দেশ, বিশেষ করে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো হয়তো ইরানে হামলা চালিয়ে সেখানকার শাসন পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে ইতিবাচকভাবে দেখত।
গত কয়েক দশক এই দেশগুলো ইরানকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখে এসেছে। ইরানকে তারা সবচেয়ে বড় আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে। কিন্তু বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানে এমন একটি হামলার কথা ভাবছেন, তখন আরব নেতারা মার্কিন প্রশাসনকে ইরান আক্রমণ না করতে তদবির করছেন।
২৭ মাস ধরে আরব নেতারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলের তাণ্ডব লক্ষ্য করছেন। তাঁরা দেখেছেন, ইসরায়েল কীভাবে ‘মহান ইসরায়েল’ ধারণা বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এটি বাইবেল থেকে কল্পনা করে নেওয়া ইসরায়েলের একটি সম্প্রসারণবাদী ধারণা। তারা ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ইরাকের ইউফ্রেটিস নদী থেকে মিসরের নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত করতে চায়।
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ইসরায়েল সম্পূর্ণ অবৈধভাবে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আরব ভূখণ্ড দখলে নিয়েছে। ইসরায়েল শুধু গাজায় গণহত্যা চালিয়ে এবং ভূখণ্ড দখলের পরিকল্পনা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননে দখল আরও বিস্তৃত করেছে।
আরব নেতাদের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা হলো, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ইসরায়েল মার্কিন মিত্র কাতারের ওপর অপ্রত্যাশিতভাবে আক্রমণ চালায়। এর আগে জুন মাসে অঞ্চলটির একমাত্র পরমাণবিক শক্তিধর দেশ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করিয়েছিল ইসরায়েল।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, পরিপূর্ণ আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল তার অবস্থান এত পরিষ্কারভাবে আগে কখনো প্রকাশ করেনি। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আক্রমণ করলে তা ইসরায়েলের আগ্রাসন সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার সম্প্রসারণকে আরও শক্তিশালী করবে।
এই কাঠামোগত পরিবর্তনই ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েল হামলার বিরুদ্ধে আরব নেতাদের বিরোধিতার পেছনে মূল কারণ।
যদিও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার গুঞ্জন থেকে নিজেদের দূরে রাখার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। কিন্তু তথ্যপ্রমাণ থেকে এটা স্পষ্ট যে ইরানের বর্তমান সরকারবিরোধী আন্দোলনকে খুব সক্রিয়ভাবে উসকে দিচ্ছে ইসরায়েল, যা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের জন্য পথ তৈরি করে দিচ্ছে।
এ মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং ইসরায়েলের বর্তমান ঐতিহ্য বিষয়কমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু এ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসরায়েলের এজেন্টরা সামনে থেকেই ইরানের প্রতিবাদ–আন্দোলনকে উসকে দিচ্ছেন।
ইসরায়েলের গণমাধ্যম চ্যানেল-১৪ জানিয়েছে, ইরানি প্রতিবাদকারীদের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দিচ্ছে ইসরায়েল। গণমাধ্যমটির খবরে দাবি করা হয়, চলমান সহিংসতায় কয়েক ডজন ইরানি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন।
এ প্রতিবেদনগুলো আরব নেতারা নিশ্চিত করেই ইরানে শাসন পরিবর্তনে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনকে রাজি করাতে ইসরায়েলের কয়েক দশকের প্রচেষ্টা এবং দেশে দেশে শাসন পরিবর্তন ও আঞ্চলিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে আমেরিকানদের দীর্ঘ ইতিহাসকে বিবেচনায় নিয়ে পাঠ করবেন।
আরব অঞ্চলের শাসকেরা এখন মনে করছেন, ইরানের যেমন শক্তিক্ষয় হয়েছে, তাতে দেশটিতে আক্রমণ করা অপ্রয়োজনীয়। তাঁরা মনে করছেন, এটি বিপরীত ফলই বয়ে আনবে।
তবে ইসরায়েলের আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার বিষয়টিই ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল জোটের সংঘাত বা ইরানের বর্তমান শাসন পরিবর্তনের বিষয়ে আরব নেতাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে একমাত্র হিসাব নয়।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে চলা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবর্তনগুলোও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০২৩ সালের পর থেকে ইরান ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচিকে ব্যাহত করেছে।
ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার বাসার আল-আসাদের পতন হয়। লেবাননে ক্রমাগত বোমাবর্ষণের মুখে হিজবুল্লাহর শক্তিও ব্যাপক মাত্রায় ক্ষয় হয়েছে।
আরব অঞ্চলের শাসকেরা এখন মনে করছেন, ইরানের যেমন শক্তিক্ষয় হয়েছে, তাতে দেশটিতে আক্রমণ করা অপ্রয়োজনীয়। তাঁরা মনে করছেন, এটি বিপরীত ফলই বয়ে আনবে।
আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে দুর্বল ইরান নিয়ন্ত্রণযোগ্য, কিছু ক্ষেত্রে কাম্যও। কিন্তু ইরান যদি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, তার জন্য আরব দেশগুলোকে যে মূল্য চুকাতে হবে, তার চেয়ে সম্ভাব্য লাভ অনেক কম।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় প্রয়োজন স্থিতিশীলতা।
ইরানের ওপর হামলা হলে এবং তার জবাবে ইরান প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নিলে তেল ও গ্যাসের দামে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে দেশগুলো উদ্বিগ্ন।
ইরানের পাল্টা আঘাতে হরমুজ প্রণালি হুমকির মুখে পড়তে পারে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহনের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। মিসরের আশঙ্কা হলো, ইরানে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
এখানে আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিকভাবে ইরানের সঙ্গে নিজেরাই ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইসরায়েলের আগ্রাসন ও সম্প্রসারণবাদী নীতির প্রতিক্রিয়ায় এটা ঘটেছে। সৌদি আরব ও ইরান ২০২৩ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কাতারে ইসরায়েলের হামলার পর সেই সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়।
মিসরের সঙ্গেও ইরানের সম্পর্কের উন্নতি ঘটেছে।
এর পাশাপাশি ইসরায়েলের লাগামহীন আগ্রাসন ও ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ঘটনা আরব রাষ্ট্রগুলোর আঞ্চলিক হুমকি মূল্যায়নের কাঠামোটা বদলে দিতে বাধ্য করেছে।
মোহাম্মদ এলমাসরি দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক
মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত