প্রশ্নটা খুব সহজ। দেয়াল থেকে একজনের ছবি নামিয়ে সেখানে আরেকজনের ছবি টাঙিয়ে দিলে কি একটি জাতির ইতিহাস নতুন করে লেখা যায়? ডাকসু সংগ্রহশালার সাম্প্রতিক ‘সংস্কার’ ঠিক এ প্রশ্নকেই আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ডাকসু সংগ্রহশালায় বেশ কিছুদিন ধরে সংস্কার চলছিল। অবশেষে গত রোববার সংগ্রহশালা যখন খুলল, দেখা গেল, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ—প্রায় প্রতিটি পর্ব থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের আগের উপস্থিতি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। মুক্তিসংগ্রামের আরও বেশ কিছু স্মারকেরও অবস্থান বদল হয়েছে, সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। যুক্ত হয়েছে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি, যার একটি ১৯৪৮ সালের সেই ভাষণের মুহূর্তের, যেখানে তিনি উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।
যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় ভাষা আন্দোলনের জন্ম, ঠিক সেখানেই ভাষা-প্রশ্নে বাংলা জনপদের প্রথম প্রতিপক্ষকে সম্মানের আসন দেওয়া নিছক অসতর্কতা নয়; এটি একটি সুচিন্তিত রাজনৈতিক বার্তা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটিকে স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আখ্যা দিয়ে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও প্রশ্ন-উদ্বেগগুলো তাতে মিলিয়ে যায় না।
প্রথম উদ্বেগটি ঐতিহাসিক। শেখ মুজিব বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি—এ সত্য প্রশ্নাতীত ও অমোচনীয়। ইতিহাসে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীসহ আরও অনেকের অবদান আছে; কিন্তু দ্বিধান্বিত জাতিকে চূড়ান্ত মুক্তির দিকে নেতৃত্ব দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েছিলেন মুজিবই।
শেখ মুজিবের শাসনামল সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। একদলীয় বাকশাল, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, ভিন্নমত দমন কিংবা রক্ষীবাহিনীর নিপীড়নের জন্য তাঁকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু সমালোচনা আর অপসারণ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের জন্ম-ইতিহাস ১৯৭১ সালে শুরু হয়নি। সেই ইতিহাসে জিন্নাহ আছেন। কিন্তু মুজিব ও জিন্নাহ সময়, পরিপ্রেক্ষিত ও তাঁদের রাজনৈতিক ভূমিকার বিবেচনায় পরস্পরের প্রতিস্থাপনযোগ্য নন। মুজিবের জায়গায় জিন্নাহকে বসানোয় কোনো ‘ভারসাম্য’ তৈরি হয় না, বরং উল্টো—ইতিহাস নির্মাণের একটা স্থূল চেষ্টা প্রকাশিত হয়।
ছবি নামিয়ে-তুলে ইতিহাস লেখা যায় না। এভাবে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পটিই উন্মোচিত হয়, আর ধরা পড়ে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীনতা, যা ভাঙচুরকে বারবার ইতিহাস রচনা ভেবে বসে। মনে রাখবেন, সংগ্রহশালা টিকে থাকে, কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। দেয়ালের ছবি যিনি আজ বদলান, ইতিহাস একদিন তাঁকেও যথাস্থানে বসিয়ে দেবে।
জিন্নাহ পাকিস্তানের ইতিহাসের অনিবার্য চরিত্র, বাংলাদেশের অতীত বুঝতেও তিনি প্রাসঙ্গিক; কিন্তু এই ভূখণ্ডের মানুষের আকাঙ্ক্ষার পক্ষে তিনি কোনো দিন দাঁড়াননি। তাঁকে সমালোচনামূলক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া কেবল ছবি হিসেবে দেয়ালে তুলে দেওয়া মানে তাঁর ভূমিকাকে নীরবে বৈধতা দেওয়া। এটি নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়, একটি বাছাই করা উল্টো-ভাষ্য।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তীকালে জামায়াতসহ কিছু ডানপন্থী শক্তি ইতিহাসের এমন এক নতুন ভাষ্য নির্মাণে সক্রিয়, যা এই জাতির যাপিত অভিজ্ঞতার বিপরীত। এ ঘটনা তারই একটি প্রকাশ। প্রত্যেককে তার প্রাপ্য কৃতিত্ব ও প্রাপ্য সমালোচনা—দুটিই দিতে হয়। সেটাই ইতিহাসচর্চা। ছবি অদলবদল সেই চর্চা নয়।
দ্বিতীয় বিবেচনাটি একটু তাত্ত্বিক এবং খানিকটা পরিহাসেরও। ক্ষমতার জোরে ইতিহাসের কোনো অংশ মুছে ফেলার চেষ্টা, বাংলাদেশের মতো এমন নগ্নভাবে না হলেও অন্যান্য দেশেও বিভিন্ন সময় কমবেশি দেখা গেছে, যায়। কিন্তু এ ব্যাপারে পরিষ্কার উপসংহার হলো, এই জবরদস্তি প্রায়ই উল্টো ফল দেয়। যাকে মুছতে চাওয়া হয়, সে বরং আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
সমাজ-মনোবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, চাপিয়ে দেওয়া বিস্মৃতি জন্ম দেয় পাল্টা-স্মৃতির। ডাকসুতে ঠিক তা-ই ঘটল। মুজিবের ছবি নামিয়ে তাঁকে খর্ব করা যায়নি; বরং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে টেনে আনা হয়েছে। জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা, এর জায়গায় গোলাম আযমের জুতাপেটার ছবি সেঁটে দেওয়া—নিঃশব্দে মুছে ফেলার বদলে সংগ্রহশালা পরিণত হয়েছে এক জীবন্ত রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে।
ইতিহাস থেকে কাউকে জোর করে সরাতে গেলে সে শহীদের মর্যাদা পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে অবশ্য নতুন করে সেই মর্যাদা আরোপের প্রয়োজন নেই। তিনি তো শহীদ হয়েছেনই। তিনি এই জাতির ইতিহাসে এক হিরণ্ময় ট্র্যাজিক হিরো। তাঁকে ডাকসু সংগ্রহশালার দেয়াল থেকে সরানোর চেষ্টা তাই সেই ট্র্যাজেডির অনুরণনকেই আরও গাঢ় করে তোলে। এটাই ‘আইকন’ ভাঙার চিরকালীন পরিহাস: ‘আইকন’ যত জোরে ভাঙা হয়, তার ছায়া তত দীর্ঘ হয়।
তৃতীয় প্রসঙ্গটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরতর ব্যাধি নিয়ে। পঁচাত্তরের পর মুজিবকে মোছা হয়েছে, আবার শেখ হাসিনার পনেরো বছরে মুজিব বাদে বাকি সবাইকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। মোছা হয়েছে আরও অনেককে; আর এখন চলছে আরেক দফা মোছামুছি। প্রতিটি ক্ষমতার পালাবদল যেন পূর্বসূরিকে দেয়াল থেকে নামিয়ে দেওয়ার উৎসব।
নাম বদলে দাও, প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলো, ভাস্কর্য-স্মারক গুঁড়িয়ে দাও। রাজনীতিবিজ্ঞানের পরিভাষায় প্রতিপক্ষ আর শত্রুর মধ্যে একটা পার্থক্য টানা হয়। পরিণত গণতন্ত্র প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে না, তার বৈধতা স্বীকার করে নিয়ে সহাবস্থান করে।
আমাদের রাজনীতি এখনো প্রতিপক্ষকে শত্রুজ্ঞান করে মুছে ফেলতে চায়। অথচ পরিণত জাতি তার সব চরিত্রকে—কৃতিত্ব, কলঙ্কসহ ইতিহাসের একই ঘরে জায়গা দেয়। কাউকে দেবতাতুল্য বানায় না, কাউকে অস্তিত্বহীনও করে না। অপসারণ ও অস্বীকারের এই সংস্কৃতি স্মৃতি ও ঐতিহ্যের উদার সহনশীলতার ঠিক বিপরীত মেরু। প্রতিবার এটি আমাদের ইতিহাসকে আরও ভঙ্গুর করে তোলে।
সবশেষে প্রাতিষ্ঠানিক দায়। ডাকসু সংগ্রহশালা কোনো দল বা পরিষদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি জাতির ঐতিহাসিক আকর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সংরক্ষিত সম্পদ। এর মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, ডাকসুর নয়। ডাকসুর কাজ প্রশাসনকে সহায়তা করা, সমান্তরাল প্রশাসন গড়ে তোলা নয়। কোনো একটি পক্ষ রাতারাতি নিজের মর্জিমাফিক এমন ঐতিহাসিক সংগ্রহ ঢেলে সাজাতে পারে না।
আজ যদি এক পক্ষ পারে, কাল আরেক পক্ষও একই অধিকার দাবি করবে। আর সংগ্রহশালা পরিণত হবে দলীয় প্রচারবোর্ডে। এর বিকল্প হলো পেশাদার কিউরেশন, প্রামাণ্য তালিকাভুক্তি, উৎস যাচাই ও সংরক্ষণের সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি; রাজনৈতিক খেয়ালখুশি নয়।
অনেকে যথার্থই বলছেন, ডাকসু ভবন রাজনৈতিক নেতাদের প্রতিকৃতির গ্যালারি হওয়ার কথা নয়; বরং সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী শিক্ষার্থী, বরেণ্য শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ-গবেষণাগার-পাঠাগার, ক্যাম্পাস ও হলজীবনের ছবিই বেশি মানানসই। ডাকসু সংগ্রহশালা ডাকসু এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেড়ে ওঠার সামগ্রিক উপস্থাপন হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
তাহলে গোড়ার প্রশ্নের উত্তরে ফেরা যাক। ছবি নামিয়ে-তুলে ইতিহাস লেখা যায় না। এভাবে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক প্রকল্পটিই উন্মোচিত হয়, আর ধরা পড়ে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির দীনতা, যা ভাঙচুরকে বারবার ইতিহাস রচনা ভেবে বসে। মনে রাখবেন, সংগ্রহশালা টিকে থাকে, কিন্তু ক্ষমতার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। দেয়ালের ছবি যিনি আজ বদলান, ইতিহাস একদিন তাঁকেও যথাস্থানে বসিয়ে দেবে।
কাজী মারুফুল ইসলাম অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
মতামত লেখকের নিজস্ব
