পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপি যে কৌশলে ‘বাংলাদেশ কার্ড’ খেলেছে

নির্বাচনে জয়ের খবরে কলকাতায় বিজেপি কর্মীদের উল্লাস। ৪ মে ২০২৬ছবি: রয়টার্স

পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের নির্বাচন নানা কারণেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেসকে সরিয়ে দিয়েছে। এটি এমন এক মুহূর্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে, যখন দীর্ঘদিনের একটি সীমান্ত-প্রশ্ন নতুন নির্বাচনী তীব্রতা অর্জন করে এবং বাংলাদেশের বিষয়টি রাজ্যের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভাষ্যে কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।

ভোটের রায় ছিল স্পষ্ট। ভারতের নির্বাচন কমিশন ২৯৪টির মধ্যে ২৯৩টি আসনের ফলাফলে দেখায়, বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন এবং তৃণমূল ৮০টি; ফলতা কেন্দ্রের ফল এখনো বাকি রয়েছে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়ায়।

এই বিপুল জয়কে একমাত্র কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃণমূলকে মোকাবিলা করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব (অ্যান্টি-ইনকামব্যান্সি), তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাদের শাসনামলে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার দাবির মতো নানা সমালোচনা। এর পাশাপাশি বিজেপির ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো।

আরও পড়ুন

এই বিচ্ছিন্ন উপাদানগুলোকে আদর্শগতভাবে একসূত্রে গেঁথে দেয় ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’। এটি অসন্তোষকে রূপ দেয় সভ্যতাগত নিরাপত্তার প্রশ্নে। বাংলাদেশ এমন এক আয়নায় পরিণত হয়, যেখানে পশ্চিমবঙ্গকে নিজেকে দেখতে আহ্বান জানানো হয়—হিন্দু না মুসলিম, শরণার্থী না অনুপ্রবেশকারী, সীমান্তবাসী না জাতির অংশ, বাঙালি না রাষ্ট্রবিরোধী। এটিই ছিল বিজেপির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাফল্য।

তারা বাংলাদেশকে এমন এক ভাষায় রূপান্তর করে, যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব, জনসংখ্যা, কল্যাণনীতি ও আনুগত্যকে ব্যাখ্যা করা হয়। এটি সম্ভব হয় কারণ, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তন আসে।

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বৈধতা, সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলার সংকট নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণ করে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, গণবিক্ষোভের মুখে হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সংখ্যালঘুদের দোকান, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে।

আরও পড়ুন

চলতি বছরেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জনতার সহিংসতা ও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর চাপের কথা উল্লেখ করেছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

পশ্চিমবঙ্গে প্রচারিত প্রতিটি ঘটনার সত্যতা নির্বাচনী দৃষ্টিকোণ থেকে যতটা না গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেগুলো যে রাজনৈতিক ধারণা তৈরি করেছিল; পশ্চিমবঙ্গের বহু হিন্দু ভোটারের মধ্যে এই অনুভূতি জন্মায় যে পূর্ব সীমান্তটি একধরনের ঝুঁকিপূর্ণ সীমানা।

বিজেপির প্রচার এই ঝুঁকির অনুভূতিকে তিনটি পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত প্রতিশ্রুতিতে রূপান্তর করে। প্রথমত, দলটি নিজেকে বাংলাদেশ থেকে নিপীড়িত হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে, বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মাধ্যমে। এই আইন বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগত শরণার্থীদের জন্য ভারতীয় নাগরিকত্ব পাওয়ার দ্রুত পথ তৈরি করে—তবে সেটা মুসলমানদের জন্য নয়। এই আইনের বিধিমালা ২০২৪ সালের মার্চে জারি করা হয় এবং প্রথম নাগরিকত্ব সনদ দেওয়া হয় ২০২৪ সালের মে মাসে।

দ্বিতীয়ত, বিজেপি অবৈধ অভিবাসনকে তৃণমূলের কথিত ‘ভোটব্যাংক’ রাজনীতির প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে, যা মুসলমানদের পক্ষে কাজ করে বলে তারা দাবি করে।
তৃতীয়ত, তারা এ দুটি বিষয়কে রাজ্য ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করে—তাদের ইঙ্গিত ছিল, কেবল বিজেপি সরকারই কলকাতাকে নয়াদিল্লির সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রশ্নে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারবে। এই কৌশলের বুদ্ধিমত্তা ও ঝুঁকি ছিল এর দ্বৈত বার্তায়। বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু অভিবাসীদের জন্য এটি স্বীকৃতি দেয় আর বাঙালি মুসলমানদের প্রতি তৈরি করে সন্দেহ।

এই দ্বৈত বার্তার কেন্দ্রে ছিল মতুয়া প্রশ্ন। মতুয়ারা পূর্ববঙ্গ (যা দেশভাগের আগে এ নামেই পরিচিত ছিল) এবং বাংলাদেশ থেকে আগত দলিত শরণার্থীদের একটি সম্প্রদায়। তারা শুধু একটি জাতিভিত্তিক ভোটব্যাংক নয়; তারা ১৯৪৭ সালের দেশভাগের জটিলতার প্রতীক। দীর্ঘদিন ধরে তারা জাতিগত প্রান্তিকতা, বাস্তুচ্যুতি, অনিশ্চিত নাগরিকত্ব, নথিপত্রের অনিশ্চয়তা এবং কল্যাণ ও রাজনৈতিক স্বীকৃতিতে বৈষম্যের মতো জটিল বোঝা বহন করে আসছে।

১৫ বছর ধরে তৃণমূল কল্যাণমূলক জনতুষ্টিবাদ ও বাঙালি স্বাতন্ত্র্যবাদের এক মিশ্রণ তৈরি করেছিল—এই বিশ্বাসে যে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদকে প্রতিরোধ করবে। ২০২৬ সালের রায় ইঙ্গিত দেয়, সেই স্বাতন্ত্র্যবাদ আর কার্যকর নয়। বিজেপি এখন বাংলায় হিন্দুত্বের ভাষায় কথা বলতে শিখে গেছে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় তৃণমূল কংগ্রেস কল্যাণমূলক কর্মসূচি ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে মতুয়াদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি আরও অস্তিত্বগত এক প্রস্তাব সামনে আনে—নাগরিকত্বকে তাদের ওপর সংঘটিত ঐতিহাসিক অন্যায়ের সংশোধন হিসেবে উপস্থাপন করে।

এ কারণেই ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কটি এত গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কেবল একটি প্রশাসনিক কার্যক্রম ছিল না; বিজেপি এটিকে এমন এক গণভোট হিসেবে তুলে ধরে, যেখানে নির্ধারিত হবে—কে এই ভূখণ্ডের অংশ।

২৭ লাখ মানুষ তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানান। সমালোচকেরা দাবি করেন, এই সংশোধন প্রক্রিয়া বিশেষভাবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু করেছে; তবে বিজেপি এটিকে ‘গণতান্ত্রিক পরিশুদ্ধি’ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

আরও পড়ুন

এখানেই ‘বাংলাদেশ ফ্যাক্টর’ কেবল বক্তব্যের স্তর ছাড়িয়ে অবকাঠামোগত বাস্তবতায় রূপ নেয়। সীমান্ত যেন পুনরুৎপাদিত হয় ভোটকেন্দ্রে, তালিকায় আর নাগরিকত্ব প্রমাণের নথিপত্র হাতে উদ্বিগ্নভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের দীর্ঘ সারিতে।

পশ্চিমবঙ্গে লাখ লাখ অনিবন্ধিত বাংলাদেশি অভিবাসীর বসবাস নিয়ে যে দাবি উঠেছিল, তার জবাবে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিকভাবেই উল্লেখ করেন যে আন্তর্জাতিক সীমান্ত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে এবং বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনই কাজ করে। তিনি বিজেপির এই বক্তব্যকে সাম্প্রদায়িক বলে নিন্দা জানান।

তবে এই যুক্তিগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক। এগুলো অভিযোগের জবাব দিয়েছে; কিন্তু ভয় দূর করতে পারেনি।

১৫ বছর ধরে তৃণমূল কল্যাণমূলক জনতুষ্টিবাদ ও বাঙালি স্বাতন্ত্র্যবাদের এক মিশ্রণ তৈরি করেছিল—এই বিশ্বাসে যে বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদকে প্রতিরোধ করবে। ২০২৬ সালের রায় ইঙ্গিত দেয়, সেই স্বাতন্ত্র্যবাদ আর কার্যকর নয়। বিজেপি এখন বাংলায় হিন্দুত্বের ভাষায় কথা বলতে শিখে গেছে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ ফ্যাক্টর বিজেপিকে স্থানীয় উদ্বেগ, যেমন চাকরি, অপরাধ, দুর্নীতি ও কল্যাণমূলক সুবিধার অপচয়—এসবকে জাতীয় ক্ষতির বৃহত্তর বর্ণনার সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ দেয়। এর ফলে হিন্দু সংহতি সংখ্যাগরিষ্ঠের আগ্রাসন হিসেবে নয়, বরং আত্মরক্ষার উপায় হিসেবে উপস্থাপিত হয়। এটি তৃণমূলকে এক জটিল অবস্থায় ফেলে—একদিকে মুসলিম নাগরিকদের পক্ষে অবস্থান নিলে ‘অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থক’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ঝুঁকি। অন্যদিকে দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তান ও পরে বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী-অভিবাসী সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা বললে ‘ভোটার তৈরি’ করার অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা।

বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে; সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্যকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এগুলোকে ব্যবহার করে ভারতের মুসলমানদের বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করাও গ্রহণযোগ্য নয়।

দেশভাগ, ভাষা, অভিবাসন, নদী, শ্রম, আত্মীয়তা, স্মৃতি ও শোক—এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বরাবরই পশ্চিমবঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই নির্বাচনী প্রচারে যে পরিবর্তনটি এসেছে, তা হলো এর রাজনৈতিক রূপ। সীমান্ত নিজেই একটি নির্বাচনী অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। বিজেপির বিজয়ের একটি কারণ হলো, তারা বুঝেছে ইতিহাস সব সময় দূর অতীতে সীমাবদ্ধ থাকে না; ভোটকেন্দ্রে মানুষের সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে প্রয়োজনে সেটাকে ডেকে আনা যায়।

  • নীলাদ্রি চট্টোপাধ্যায় সুইডেনের লিনিয়াস ইউনিভার্সিটির একজন ইতিহাসবিদ ও জ্যেষ্ঠ প্রভাষক

স্ক্রল থেকে নেওয়া; ইংরেজি থেকে অনূদিত।

*মতামত লেখকের নিজস্ব