সরকারপ্রধানের আগাম দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা, ২০২৩ সালকে কঠিন বছর ঘোষণা করা, বিএনপির সফল বিভাগীয় গণসমাবেশ, দেশের চলমান বিদ্যুৎ-জ্বালানিসংকট, অসহনীয় মূল্যস্ফীতি, ডলার-সংকটসহ বৈশ্বিক মন্দার আভাস ইত্যাদির সম্মিলিত প্রভাবে ভবিষ্যতে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কা আছে, এমন ভয়ে কেউ কেউ ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে ফেলার ভাবনায় তাড়িত হয়ে থাকতে পারেন। এটা ব্যাংকের তারল্য বা নগদের সংকট নয়; বরং আস্থার সংকট।

এমতাবস্থায় নিয়ন্ত্রক বা রেগুলেটর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত বাণিজ্যিক ব্যাংককে এই বলে সতর্ক করা যে তারা যাতে মাঝারিসহ বড় চেক অনার করার সময় গ্রাহক হয়রানি না করে। যেকোনো নগদায়নকে সহজ করে। কোনো ব্যাংক যাতে প্রবেশপথে বা অর্থ উত্তোলন বুথের সামনে লিখে না রাখে যে, এক লাখ টাকার বেশি উত্তোলনে এত কর্মদিবস আগে জানাতে হবে। ৫ লাখ টাকার বেশি নগদায়নে যাতে গড়িমসি করা না হয়, গ্রাহকদের না ঘোরায়। বড় চেক অনারে যে পজিটিভ পে-স্লিপের ব্যবস্থা আছে, সেটার হয়রানিমুক্ত বাস্তবায়ন হয়। মেয়াদি জমা, ফিক্সড ডিপোজিট কিংবা সঞ্চয়ী স্কিম ভাঙাতে কোনো ব্যাংক যাতে বাধা না দেয়। কোনো ব্যাংকের খারাপ আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব আকারে ছড়িয়ে গেলে আস্থার সংকট গভীর হবে।

সুস্পষ্টভাবে, ব্যাংকিং খাতে অনাস্থা ও তারল্যসংকটের সঙ্গে নীতিগত সমস্যার সংযোগ রয়েছে। মেধাহীন নিয়ম, অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দেশিত পলিসি, মূল্যস্ফীতি সহায়ক ভুল মুদ্রানীতি, তারল্যসংকট-সহায়ক আমানত ব্যবস্থা, খেলাপিসহায়ক ঋণদান, দায়হীন অক্ষম নিয়ন্ত্রণ, সরকার দলীয়দের নতুন ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া, বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালনায় দুর্বৃত্তপনার লাগাম পরানোর শক্তিহীনতাসহ সব কাজকর্মেই বাংলাদেশের ব্যাংকের অক্ষমতার চিত্র ফুটে উঠছে।

মানুষ বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা রাখে না, ফিক্সড ডিপোজিট সঞ্চয় করে না। ফলে গ্রাহক যে বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে টাকার বিনিময়ে সেবা চায়, তাকেই সেবার নিশ্চয়তা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত নিজের রেগুলেটরি ক্ষমতা পোক্ত করা, ব্যাংকিং সেবায় কিংবা অর্থ উত্তোলনে হয়রানি হচ্ছে কি না, যেসব যাচাই-বাছাই করে পদক্ষেপ নেওয়া। গ্রাহক যদি বুঝতে পারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সঠিক সময়ে সঠিক নিয়ন্ত্রণটা করছে না, তাহলে তারল্যসংকট না থাকলেও আস্থার সংকট কিছুতেই কমবে না।

আস্থার সংকট কেন? উত্তরটা গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। কয়েকটা উদাহরণ দিই, ‘দুর্বল ১০ ব্যাংক চিহ্নিত, নাম বলেননি গভর্নর’(ইত্তেফাক ৪ আগস্ট ২০২২)। দুর্বল এই ১০ ব্যাংকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিগত কয়েক বছরে ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়নি। এ কারণে গ্রাহকের মনে আশঙ্কা জেগেছে, তার ব্যাংকটির কী অবস্থা!

‘৯ ব্যাংক মূলধনও খেয়ে ফেলেছে, ঘাটতি ছাড়াল ১৯ হাজার কোটি টাকা’ ২৮ মার্চ ২০১৮। ‘খারাপ অবস্থায় ১০ ব্যাংক’(১৯ জানুয়ারি ২০২০) বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্যামেলস রেটিং নিয়ে সমকাল প্রতিবেদন। ‘ব্যাংক খাতে এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩৩ হাজার কোটি টাকা (১৪ নভেম্বর ২০২২, প্রথম আলো)’। ‘বাড়বাড়ন্ত খেলাপি ঋণ’, ‘সব সুবিধা খেলাপিদের জন্যই’ (১৫ নভেম্বর ২০২২, প্রথম আলো)। বাংলাদেশ ব্যাংক এসব অপব্যবস্থাপনা ও জালিয়াতি থামানোর প্রশ্নে কার্যত অক্ষম ও নিষ্ক্রিয় বলে গণমাধ্যমের এসব খবরে মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট প্রবল হবে, এটাই স্বাভাবিক।

পরিচালকেরা ৬ থেকে ৯ বছর টানা পদে থাকতে পারেন বলে বেসরকারি ব্যাংকে স্বেচ্ছাচারিতা ও জবাবদিহিহীনতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তাঁরা ঋণদান পদ্ধতিকে অ্যাবিউজ করছে। জাতীয় সংসদে খোদ মন্ত্রী বলেছেন, পরিচালকেরা নিজেদের মধ্যে ঋণ বিতরণ করে লক্ষকোটি টাকার কাছাকাছি খেলাপি করেছে। বেসরকারি ব্যাংকে এক পরিবারের চার পরিচালক অনুমোদনের আইন সরকার করেছে। যেকোনো রাজনৈতিক-সংকটে এসব পারিবারিকভাবে পরিচালিত ব্যাংকের ব্যাপারে মানুষের আশঙ্কা আছে। যদি সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তন কিংবা রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে আমানত গায়েব করে মালিক-পরিচালকেরা পালিয়ে যান, তাহলে আমানতের কী হবে!

অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম ১৫ নভেম্বর প্রথম আলোতে লিখেছেন, ‘গত সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকার যে হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক, তা মোটেও সঠিক নয়। অবলোপন করা ঋণ, আদালতে মামলা চলছে এমন ঋণ এবং বারবার পুনঃতফসিল করা ঋণের হিসাব খেলাপি ঋণে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। সব মিলিয়ে দেখলে বর্তমানে খেলাপি ঋণ চার লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। খেলাপি ঋণের বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।’

অভিযোগ আছে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা এখন সরাসরি ব্যাংক দেয় না। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিকুইজিশন দিয়ে আনতে বাড়তি সময় লাগে। পদ্ধতিগত ঝামেলায় অনেকে বেকায়দায় পড়ছেন, বিভ্রান্তও হচ্ছেন। এদিকে ডলারের বাস্তব সমস্যার কারণে, পণ্য আমদানির এলসি বা ঋণপত্র বন্ধে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা সমস্যায় আছে। এই সব মিলে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর অনাস্থা আসলে এমনি এমনি আসেনি।

বাংলাদেশে কয়েক বছর থেকেই ব্যাংক আমানতের সুদের চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। ফলে ব্যাংকে টাকা রাখলেই লোকসান। ব্যাংকে টাকা রাখলে গড়ে সুদ পাওয়া যায় ৪ শতাংশের সামান্য বেশি, অথচ সরকারি হিসেবেই মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি, বেসরকারি হিসেবে আরও বেশি। বছর শেষে প্রকৃত বিচারে আমানতকারীর কোনো লাভ নেই, বরং সরকারের কর কর্তনের পরে দ্বিতীয় ধাপে লোকসান হয়! ব্যাংকে টাকা রাখলে যদি সেটা কমে যায়, মানুষ অর্থ উঠিয়ে ফেলবে, এটাই স্বাভাবিক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত দ্রুত ব্যাংকিং খাতে দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করে, আমানতে সুদের হার বাড়িয়ে, খেলাপি ঋণ বন্ধ করে, প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম্যের বিপরীতে সঠিক ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করে, ব্যাংকের পুলিশি আচরণ বন্ধ করে, ব্যাংক আমানতে কর কমিয়ে, সঞ্চয়ে সুদ বাড়িয়ে আস্থা তৈরি করা, গ্রাহকের আমানত সুরক্ষা করার দায়িত্ব নেওয়া। অর্থহীন সস্তা কোনো বিজ্ঞাপন না দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিচালন ও নীতিগত কাজে মনোযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলেই বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ ভাবে টাকা দিতে পারে না। বাণিজ্যিক ব্যাংকের নগদের সংকট হলে প্রথমে অন্য ব্যাংক থেকে কলমানি রেটে টাকা ধার করবে। সেখানেও না পেলে স্থায়ী আমানতের বিপরীতে একটা হারে সুদে ও শর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করবে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, সেটার সরল অর্থ অনেকেই ভিন্নভাবে নিতে পারে। চলমান তারল্যসংকটের কিছু কাঠামোগত কারণও আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারের বন্ড কিনে নিয়ে সরকারকে টাকা ছাপিয়ে দিচ্ছে, অথচ বন্ড কেনার কথা বেসরকারি ব্যাংকের। বিধিবিদ্ধ প্রক্রিয়ায় না গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ছাপানো দেশে মূল্যস্ফীতি তৈরি করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিবি কি সরকারকে বন্ড ফিরিয়ে দিয়ে সমপরিমাণ অর্থ ‘মানি মার্কেটে’ ফেরত দিতে পারছে?

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিসংকটে কারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বেড়েছে। দ্রব্যমূল্য আকাশছোঁয়া। মানুষ সঞ্চয় ভেঙে দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করতে বাধ্য হচ্ছে। মূল্যস্ফীতির বিপরীতে সুদের হার অন্তত অর্ধেক বলে আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখতে আগ্রহী হচ্ছেন না। একদিকে নগদায়ন বাড়ছে, অন্যদিকে নতুন জমার হার কমেছে বলে ব্যাংকে তারল্য কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকে বা খোলা বাজারে ডলার বিক্রি করছে বলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকের তারল্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চলে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে নতুন সম্পদ তৈরি না হলে এই অর্থ কেন্দ্রীয় থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকে এমনি এমনি ফিরবে না।

তারল্য ফেরাতে বাণিজ্যিক ব্যাংককে বৈদেশিক রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয় বাড়তে হবে। কিংবা বেসরকারি বিদেশি ঋণ আনতে হবে, চলতি বছরে ১৮ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের দায় বকেয়া রেখে নতুন বৈদেশিক ঋণ কঠিন। রপ্তানি আয় বাড়িয়ে ডলার আয় বাড়ালে, প্রবাসী আয় বাড়ালে—নতুন সম্পদ হিসেবে ডলারের বিপরীতে ব্যাংকে নতুন টাকা আসবে বা তারল্য তৈরি হবে। কিন্তু ব্যাংক রেটের ওপর অনাস্থায় রেমিট্যান্স হুন্ডিতে চলে যাচ্ছে। সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবরেও প্রবাসী আয় কমেছে, অক্টোবরে আট মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন প্রবাসী আয় (৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ কম) এসেছে। ইপিবির হিসেবে অক্টোবরে রপ্তানি আয়ও গত বছর একই মাসের তুলনায় কমেছে প্রায় ৮ শতাংশ। (প্রথম আলো ৩ নভেম্বর)।

এমতাবস্থায় অভ্যন্তরীণ আমানত বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়ে, এবং খেলাপি ঋণ ফেরত এনে তারল্যসংকটের কাঠামোগত সমাধান ছাড়া বিকল্প নেই। বাণিজ্যিক ব্যাংককে অবশ্যই মূল্যস্ফীতির হারের বেশি বা অন্তত সমান হারে সুদ দিতে হবে। না হলে ব্যাংক দেউলিয়ার ঝুঁকিতে না পড়লেও নগদায়ন বাড়বে। তারল্যসংকট সমাধানের প্রধান খাত দুর্বৃত্তায়িত প্রশ্রয়ে, ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তৈরি করা খেলাপি ঋণ ফেরানো।

 খেলাপি ঋণ না ফিরিয়ে ‘ব্যাংকে টাকার সংকট হলে দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক’—এ কথা বলার অর্থ ভালো না। এর অর্থ এমনও হতে পারে, একদিকে বিশেষ মালিকানাধীন ব্যাংকের ঋণ ইচ্ছাকৃত খেলাপি করা হবে, অন্যদিকে সরকার জনগণের টাকা বেইল আউট করে অসৎ মালিকদের ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখবে। অতীতে সরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ দিয়ে মূলধন খেয়ে ফেলা বেসরকারি ব্যাংক বাঁচিয়ে রাখার ঘটনা দেখেছি। সরকার পরিবর্তন হলে কিংবা দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা হলে এসব ব্যাংকে রক্ষিত আমানতের কি হবে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে ভয় আছে। তাই বাংলাদেশের ব্যাংকের উচিত সস্তা বিজ্ঞপ্তি না দিয়ে, ‘কীভাবে ব্যাংকে টাকা রাখাকে লাভবান করা যায়’—সে ব্যবস্থা করা।

সুস্পষ্টভাবে, ব্যাংকিং খাতে অনাস্থা ও তারল্যসংকটের সঙ্গে নীতিগত সমস্যার সংযোগ রয়েছে। মেধাহীন নিয়ম, অর্থ মন্ত্রণালয় নির্দেশিত পলিসি, মূল্যস্ফীতি সহায়ক ভুল মুদ্রানীতি, তারল্যসংকট-সহায়ক আমানত ব্যবস্থা, খেলাপিসহায়ক ঋণদান, দায়হীন অক্ষম নিয়ন্ত্রণ, সরকার দলীয়দের নতুন ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া, বাণিজ্যিক ব্যাংক পরিচালনায় দুর্বৃত্তপনার লাগাম পরানোর শক্তিহীনতাসহ সব কাজকর্মেই বাংলাদেশের ব্যাংকের অক্ষমতার চিত্র ফুটে উঠছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বৃত্ত মালিকানা, রাজনৈতিক প্রশাসনের ভূত সরিয়ে, সরকারের ছায়া কেটে একটা স্বাধীন ও সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হোক, এটাই দেশের মানুষের চাওয়া।

ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব টেকসই উন্নয়নবিষয়ক লেখক। গ্রন্থকার: চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশ; বাংলাদেশ: অর্থনীতির ৫০ বছর; অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবিত কথামালা; বাংলাদেশের পানি, পরিবেশ ও বর্জ্য। [email protected]