ইংরেজির নামকরা শিক্ষক মিসেস মিডলটন। একদিন ক্লাসে এসে বললেন, ‘আজ আমি তোমাদের সহজ কিছু তথ্য দেব। তথ্যগুলো পর্যালোচনা করে তোমাদের একটি শিরোনাম লিখতে হবে। স্কুলের অভিভাবকদের কাছে পাঠানো চিঠির জন্য।’
মিসেস মিডলটন বলতে শুরু করলেন। ‘আগামী সোমবার আমাদের শহরে শিক্ষকদের এক বড় প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উদ্বোধন করবেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মিস্টার ওয়াটসন। সঙ্গে থাকবেন দেশের নামকরা আরও কিছু শিক্ষা গবেষক এবং আমাদের স্কুলের গভর্নর। বিষয়—পড়ানোর সৃজনশীল পদ্ধতি। আমাদের স্কুলের সব শিক্ষকদেরই এই প্রশিক্ষণে অংশ নিতে হবে।’
শিক্ষার্থীদের লেখা শিরোনামগুলো জমা পড়ছে। জোরে জোরে পড়তে শুরু করলেন মিসেস মিডলটন। ‘সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে শহরে সম্মেলন’, ‘শিক্ষকদের সৃজনশীল পদ্ধতিতে পড়ানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে’, ‘শিক্ষাসচিব শহরে আসছেন’ ইত্যাদি। কিন্তু মিসেস মিডলটন যে শিরোনাম খুঁজছিলেন, সেটি পেলেন না। অভিভাবকদের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিরোনামটি হলো ‘আগামী সোমবার স্কুল বন্ধ থাকবে’।
আমার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের একাধিক ডিগ্রি রয়েছে—মাস্টার্স, পিএইচডি। অনেকের সঙ্গে এমবিএ। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থেকে। অনেকেই নিজ বিষয়ে জগদ্বিখ্যাত। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিষয় সহজ করে সবাইকে বোঝানোর ক্ষমতা সবার এক রকম নয়। জটিল বিষয় অন্যকে সহজে বোঝানোর ক্ষমতা যাদের আছে, তরতর করে ওপরে উঠতে পারে। যাদের নেই, বিষয়গত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে পড়ে।
মিসেস মিডলটনের ওই ক্লাসের ছাত্রী ছিলেন নোরা ইফরন, যাকে পরবর্তীতে আমেরিকার খ্যাতনামা সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে দেখা যায়। যেকোনো বিষয়ের সারমর্ম, সহজ কথায়, কম শব্দে, সবার বোধগম্য করে তোলার এ প্রয়োজনীয় শিক্ষা নোরা এই একটি ক্লাস থেকেই পেয়েছিলেন। জীবনে কখনো ভোলেননি।
আমার ক্যারিয়ারের বয়স প্রায় দুই যুগ। পাশ্চাত্যের কোম্পানিগুলোয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ক্যারিয়ারে উন্নতি করার জন্য বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আর্টিকুলেশন অর্থাৎ সহজ করে, প্রয়োজনীয় কথা, ন্যূনতম শব্দে লেখা বা বলার দক্ষতা সবচেয়ে বেশি দরকার কাজের জায়গায় সাফল্যের জন্য। মার্কিন সাময়িকী ফোর্বসের এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ শতাংশ মানুষ কাজের জায়গায় ব্যর্থতার জন্য কার্যকর কমিউনিকেশন স্কিলের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন।
আমার ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় আমি যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তাদের একাধিক ডিগ্রি রয়েছে—মাস্টার্স, পিএইচডি। অনেকের সঙ্গে এমবিএ। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর থেকে। অনেকেই নিজ বিষয়ে জগদ্বিখ্যাত। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিষয় সহজ করে সবাইকে বোঝানোর ক্ষমতা সবার এক রকম নয়। জটিল বিষয় অন্যকে সহজে বোঝানোর ক্ষমতা যাদের আছে, তরতর করে ওপরে উঠতে পারে। যাদের নেই, বিষয়গত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে পড়ে।
প্রায় এক যুগ আগে। আমি তখন ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট। ওষুধ কোম্পানির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা আমাদের কাজ। বিশ্বের অন্যতম এক ওষুধ কোম্পানিতে আমাদের ডাক পড়ল। পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় গবেষণার খরচ বেড়ে যাচ্ছে। গবেষণার মান ঠিক রেখে বিশ্বের অন্য কোনো কোনো জায়গায় কম খরচে গবেষণা করা যায়। খুঁজে বের করে, আমাদের পরামর্শ জানাতে হবে। আমার ম্যানেজার ড. নিক এডওয়ার্ড। কেমব্রিজ থেকে পাস করা। পড়াশোনা অনেক, অগাধ পাণ্ডিত্য। নিক আমাকে ডেকে নিয়ে বলল, ‘এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে আমাদের আগে অন্তত দুটো কোম্পানি চেষ্টা করেছে। কিন্তু ম্যানেজমেন্টের কাছে কোনোটি যুক্তিগ্রাহ্য মনে হয়নি। সুতরাং বুঝতেই পারছ, তোমার সামনে একটা বড় চ্যালেঞ্জ আছে।’ আমার টিম কাজ শুরু করল। আমাদের গবেষণালব্ধ পরামর্শ তৈরি।
এ ধরনের প্রেজেন্টেশনে আমরা সাধারণত মূল পরামর্শগুলো ছোট আকারে রাখি। মূল কথাগুলো যাতে সহজভাবে সবার বোধগম্য হয়। একবার পড়লেই যেন বোঝা যায়। বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে থাকে, যাতে যে যার প্রয়োজনমতো পড়ে নিতে পারে।
আধা ঘণ্টার মধ্যেই আমাদের প্রেজেন্টেশন শেষ হয়ে গেল। বড়কর্তারা বললেন, আমাদের পরামর্শ তাঁদের পছন্দ হয়েছে। কোম্পানির নিজস্ব টিম আমাদের পরামর্শগুলো বাস্তবায়ন করবে। মিটিং শেষ। বের হয়েছি। এমন সময় পেছন থেকে একজন ভদ্রলোক ডেকে বললেন, ‘তোমার কি হাতে সময় আছে? আমি এরিখ। এর আগের দুবার তোমরা আজ যা যা বললে, আমি একই কথা বলেছিলাম, কিন্তু বড়কর্তারা আমার কথা শোনেনি।’ এরিখের অফিসে গিয়ে ওর প্রেজেন্টেশনগুলো দেখলাম। এক শর বেশি পাতার প্রেজেন্টেশন। সংখ্যার আধিক্য। বিবরণ বিস্তারিত। কিন্তু মূল বক্তব্য একই রকম। এরিখ ইউরোপের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। সঙ্গে মাস্টার্স ও পিএইচডি। এরিখ নিজ থেকে বলল, ‘তোমাদেরটা অনেক সহজ।’
গবেষণা বলছে, ২০০০ সালে, কোনো বিষয়ে আমরা খুব একটা চেষ্টা ছাড়া একটানা ১২ থেকে ১৪ সেকেন্ড মনোনিবেশ করতে পারতাম। এর থেকে বেশি সময় মনোনিবেশ করার জন্য ওই বিষয়ে আমাদের আগ্রহ জন্মাতে হবে। এখন এটি দাঁড়িয়েছে মাত্র আট সেকেন্ডে। অর্থাৎ আপনার মূল বক্তব্য অন্যকে বোঝানোর জন্য আপনার হাতে সময় মাত্র আট সেকেন্ড। এই আট সেকেন্ডে আপনি অপর প্রান্তের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হলেই পরবর্তী আট সেকেন্ড পাবেন। এই সেকেন্ডে আপনার এমন কিছু বলতে পারতে হবে, যাতে আপনার শ্রোতা তার পরবর্তী চার সেকেন্ড আপনার বিষয়ের প্রতি মন দেন।
এক দিনে অন্তত ৫০টির মতো ই-মেইল পড়তে ও লিখতে হয়। কাজের জায়গায় আমাদের সবারই চাপ বেড়েছে। আপনার একটি প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে হবে, হাতে সময় কম। সহকর্মীকে ই-মেইল বা জিজ্ঞাসা করলেন। দেখবেন, মূল যে তথ্য আপনি জানতে চাইছেন, তা বিস্তারিত বিবরণের ভেতর হারিয়ে গেছে বা আপনাকে একাধিক সম্পূরক প্রশ্ন বা ই-মেইল করতে হচ্ছে উত্তরটি জানার জন্য। অনেক প্রেজেন্টেশন ১৫ মিনিট শোনার পরও বোঝা যায় না মূল বক্তব্য কী। কোনো কোনো প্রতিবেদন পাতার পর পাতা পড়েও কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায় না।
এভাবেই অপর প্রান্তের মানুষটি সম্পর্কে আপনার ধারণা গড়ে ওঠে। তার দক্ষতা বা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আপনার মতামত তৈরি হয়।
ছোট করে, সঠিকভাবে নিজের বক্তব্য বলতে বা লিখতে হলে যেকোনো বিষয়ে যে অগাধ জ্ঞান থাকা দরকার, তা নয়; বিস্তৃত শব্দভান্ডার আর ভাষার ওপর দারুণ দক্ষতা না থাকলেও চলে। দরকার হলো বিষয়টা নিয়ে, যে প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন, সেটা নিয়ে ভাবা। বিষয়টাকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করে তার উত্তর খোঁজার চেষ্টা করুন। ছোট বাক্য আর সহজ শব্দ ব্যবহার করুন। তথ্য বা জ্ঞানের ঘাটতি থাকতেই পারে। জটিল শব্দ ব্যবহার করে নিজের অজ্ঞতাকে ঢাকার বা নিজের পাণ্ডিত্য দেখানোর চেষ্টা না করাই ভালো। যেকোনো কিছু লেখার পরে ভাবতে হবে আরও সহজ বাক্যে ভাবটিকে প্রকাশ করা যায় কি না।
২ গুণ ২? সহজ। ৪ গুণ ৪? এটাও সহজ। ১৬ গুণ ১৬? এবার আপনার মস্তিষ্ক ভাবতে শুরু করেছে। আমার ওপর হয়তো কিছুটা বিরক্তও বটে। অপ্রত্যাশিত আমাদের মস্তিষ্ক অতিমাত্রায় সক্রিয় হলে আমরা বিরক্ত হই। অমনোযোগী হয়ে পড়ি। তথ্য আর তত্ত্বের ভারে আপনার বক্তব্য বুঝতে অন্যের মস্তিষ্ক যেন অতিমাত্রায় সক্রিয় করতে না হয়।
কাজের ক্ষেত্রে আপনার কথা বলা আর লেখার ধরনই আপনার ব্র্যান্ড তৈরি করে। ব্র্যান্ড তো আর এক দিনে হবে না। দরকার নিয়মিত অনুশীলন, অন্যকে পর্যবেক্ষণ ও অনুকরণ।
ড. সুব্রত বোস প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের গ্লোবাল ভাইস প্রেসিডেন্ট
[email protected]