default-image

অফিস ছুটির চরম ব্যস্ত সময়ে, মিরপুর ২ নম্বরের প্রধান সড়ক পার হতে গিয়ে আবদুর রউফ যখন চলন্ত একটা গাড়ির সামনে পড়ে যান, তখন কি তিনি জানতেন, শুধু তাঁর মতো মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য দেশে আলাদা একটা আইন আছে? নাম ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন’। এই আইনের ২০টি উপধারায় শুধু তাদের জন্য প্রযোজ্য এ রকম অন্তত ২৮টি অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। তার মধ্যে একটি অধিকার হলো ‘প্রবেশগম্যতা’।

এতে বলা হয়েছে, চারপাশের সবকিছুতে অবাধে চলাচলের অধিকার প্রতিবন্ধীর রয়েছে। যানবাহন ও সেবা প্রদানের সব ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতামুক্ত প্রবেশগম্যতা থাকতে হবে। এ জন্য সব গণস্থাপনা এবং অবাধ যাতায়াত আছে এমন ব্যক্তিগত স্থাপনা এমনভাবে সংস্কার করতে হবে, যাতে প্রতিবন্ধীরা সেখানে অবাধে প্রবেশ করতে পারে। কাগজের গণ্ডি ছাড়িয়ে এই আইন যদি বাস্তবে কার্যকর থাকত, তাহলে অন্তত গাড়িতে চড়তে রউফদের জন্য হুইলচেয়ার ঢোকার উপযোগী আলাদা সিঁড়ি থাকত, রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং থাকত, অফিস–আদালতে থাকত লিফট, নিদেনপক্ষে বিশেষ সিঁড়ি। এসবের কিছুই তাদের আমরা দিতে পারিনি। সহসা দেওয়া হবে, এমন কোনো লক্ষণও আমরা দেখছি না।

বিজ্ঞাপন

আইন ও রাষ্ট্রের কথা থাক। এর বাইরেও আরেকটা বিষয় আছে, তাকে বলে শিষ্টাচার। পালন না করলেও অমান্যকারীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা ঠোকা যাবে না। এই শিষ্টাচার বলেই আমরা বাসে নারী, বয়স্ক বা প্রতিবন্ধীকে আসন ছেড়ে দিই। অন্ধকে হাত ধরে ব্যস্ত রাস্তা পার করে দিই। মনে হচ্ছে অধুনা আমরা শিষ্টাচারের সব দায় থেকেই মুক্তি লাভ করেছি। নইলে মাঝরাস্তায় চলন্ত গাড়ি থেকে কেন আমরা প্রতিবন্ধী নারীকে ফেলে দেব, কেনই–বা চলন্ত গাড়ির সামনে পড়ে যাবেন আবদুর রউফ?

আবদুর রউফের মতো কাউকে রাস্তা পার হতে উদ্যত দেখেই তো সামনের গাড়িগুলোর থেমে যাওয়া উচিত ছিল, অন্তত গতি তো ধীর হয়ে যাওয়ার কথা। এমন তো নয় যে বাইরে থেকে আবদুর রউফের প্রতিবন্ধকতা বোঝা যাচ্ছিল না, তাই গাড়ির গতি রোধ করেননি চালকেরা। রউফের হাতে রীতিমতো দৃষ্টিগ্রাহ্য একটা ক্রাচ ছিল, তারপরও যে কেউ থামেনি, তার কারণ চালকদের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা নয়, তার চেয়ে বড় এক প্রতিবন্ধিতা। এই প্রতিবন্ধিতার নাম শিষ্টাচারপ্রতিবন্ধিতা। তাঁরা বা আমরা সবাই কমবেশি এতে আক্রান্ত। এই প্রতিবন্ধিতা যত দিন না আমরা কাটিয়ে উঠতে পারব, তত দিন বাহ্যিক যত উন্নতিই করি না কেন, মনমানসিকতায় সভ্য হওয়া থেকে অনেক দূরে রয়ে যাব।

সম্পাদকীয় থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন