default-image

অপরাধ প্রতিরোধ ও দমনে প্রবেশন আইনটির ক্রমবর্ধমান প্রয়োগ একটি ভালো অগ্রগতি। কারণ, অপরাধীকে সাজা দেওয়ার বয়স ও পারিপার্শ্বিক অবস্থার বাছবিচার গুরুত্বপূর্ণ। লাতিন ‘প্রোবো’ শব্দ থেকে এসেছে প্রবেশন। এর অর্থ ‘আমি আমার সামর্থ্য প্রমাণ করতে পারি’। এই সামর্থ্য মানে ভুল শোধরানোর সুযোগ পেয়ে কাজে লাগানো। নাগরিক প্রমাণ করবেন যে তিনি আইন ভঙ্গকারী নয়, আইন মান্যকারী হিসেবেই জীবনযাপনে সক্ষম।

অধস্তন আদালত এবং হাইকোর্ট বিভাগও প্রবেশন আইনটির প্রয়োগ শুরু করেছেন। সর্ব সাম্প্রতিক একটি মাদক মামলায় হাইকোর্ট বিরল আদেশ দিয়েছেন। পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তি প্রৌঢ় মা এবং ছেলে-মেয়ের (স্ত্রীর বিষয়ে উল্লেখ না থাকাটা লক্ষণীয়) যত্ন নেবেন। দেড় বছর প্রবেশন কর্মকর্তার তদারকিতে থাকবেন। দণ্ডিত ব্যক্তি সন্তোষজনক আচরণ করলে বাকি সাজা রেয়াত পাবেন। এর আগে মাগুরায় মাদক মামলায় অভিযুক্ত ৯ জন এখন বই পড়া, সিনেমা দেখা ও গাছ লাগানোর শর্ত পূরণ করছেন। চাচির ওপর এক হামলাকারী প্রবেশন শর্ত পূরণ করায় খালাস পান। কক্সবাজারের চকরিয়ায় গত আগস্টে ভিসা প্রতারকের ছয় মাসের সাজা ১২ শর্তে স্থগিত করেছেন। বই পড়া, ৪০টি গাছ রোপণ ও নেশা না করার মতো শর্ত দেন আদালত। গত অক্টোবরে একই আদালত মাদক মামলায় তিন আসামিকে আগামী ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মাদকবিরোধী প্রচারণা এবং স্কুলের বাচ্চাদের শিক্ষা উপকরণ কিনে দেওয়ার মতো শর্তে সাজা স্থগিত করেন।

বিজ্ঞাপন

সুতরাং এটা খুবই ইতিবাচক যে দেশে সাম্প্রতিক কালে প্রবেশন আইনের প্রয়োগ শুরু হয়েছে এবং তা বাড়ছে। তবে প্রবেশনব্যবস্থার মূল সাফল্য বিচার বিভাগ এবং নির্বাহী কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করবে। সাধারণত স্থানীয় সমাজসেবা কর্মকর্তাকেই প্রবেশন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এ ব্যবস্থা থেকে সুফল পেতে হলে নির্দিষ্টভাবে একটি সুষ্ঠু নীতিমালার আওতায় সারা দেশে মেধাবী ও যোগ্য ব্যক্তিদের প্রবেশন কর্মকর্তা নিয়োগ দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে নামকাওয়াস্তে কাজ চালানোর মনোভাব পরিহার করতে হবে।

এতে কোনো সন্দেহ নেই, অপরাধ সংঘটন এবং অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তি প্রদানে আমাদের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে একটা পরিবর্তন আনা দরকার। তাই কেবল কঠোর দণ্ডদানের প্রবণতার বিপরীতে এবং জেলগুলো ভরে ফেলার মতো পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রবেশন আইনটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টাকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাই। শুধু আদালতের আদেশনির্ভর থাকলে এর সাফল্য আসবে না। প্রবেশন কর্মকর্তাদের ভূমিকাই সব থেকে বেশি কার্যকর হতে পারে। দণ্ডিত ব্যক্তির কাউন্সেলিংকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। গতকাল চকরিয়ার সমাজসেবা কর্মকর্তা আমাদের জানিয়েছেন, মাদক মামলায় দণ্ডিত উল্লিখিত তিন আসামি এ পর্যন্ত কতটা কী আদেশ প্রতিপালন করেছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন। কারণ, আদালতকে রিপোর্ট দিতে তিন মাস সময় আছে। আসামিরা তাকে অবহিত করেনি। আসলে বিষয়টি এ রকম যান্ত্রিক হওয়া উচিত নয়। প্রবেশন কর্মকর্তাকে অবশ্যই মানবিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে আসামিদের সঙ্গে একটা যোগাযোগ রক্ষা করে যেতে হবে।

উন্নত গণতন্ত্রে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় প্রবেশনের ব্যাপক অনুশীলন চলে। কমিউনিটির স্বার্থে বিনা বেতনে কাজ করা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কোর্স সম্পন্ন করা, কারাগার থেকে প্যারোলে মুক্তি নেওয়ার মতো বিষয় প্রবেশন আইনের আওতায় থাকে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশন আইন প্রথম প্রবর্তন করে ভারত, ১৯৫৮ সালে। এর দুই বছর পরে পাকিস্তানও এটি অনুসরণ করে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার প্রবেশন আইনটি কার্যকর করতে উদ্যোগী হয়। ১৯৭৩ সালে আইনটিকে হালনাগাদ করা হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আইনটির যথাপ্রয়োগ বাংলাদেশের কোনো সরকারের আমলেই ঘটেনি। এখন যখন এর প্রয়োগ শুরু হয়েছে, তখন এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ আমরা আশা করব।

মন্তব্য পড়ুন 0