বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: করোনা মহামারির তৃতীয় ঢেউ চলছে। করোনা মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি কেমন ছিল?

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ: শুরুতে কোনো দেশই এ ব্যাপারে তৈরি ছিল না। করোনা যে মহামারি আকারে আসবে, সে ধারণা কারও ছিল না। যদিও সার্স ও মার্স প্রাদুর্ভাবের পরে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল আরেকটি বড় আকারের মহামারি আসন্ন। বাংলাদেশেরও কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কাজেই শুরুতে এলোমেলো অবস্থা ছিল। আমাদের শিখতে হয়েছে। ধাপে ধাপে সেটা শেখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, অর্থনীতিকে সচল রাখতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিকেই প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। ২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখ প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। এপ্রিলের ১৩ তারিখ প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়। যদিও সেটার বাস্তবায়ন করতে সময় লেগেছে।

করোনার প্রথম ধাপে বিধিনিষেধের কারণে অনেক মানুষ কাজ হারান। অনেকে খাবারের সংকটে পড়েন। কিন্তু সংকটটা তিনটি কারণে তীব্র হয়নি। প্রথমত, সরকার তাদের জন্য বরাদ্দ ঘোষণা করে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে যেকোনো বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষ বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান। এবারও মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তৃতীয়ত, দেশে খাদ্যের সংকট ছিল না। সরকার সম্ভবত এক–চতুর্থাংশ দিয়েছে। বাকিটা মানুষ মানুষের জন্য করেছে। খুব নিশ্চিতভাবেই এত বড় সংকট উত্তরণের সামর্থ্য সরকারের একার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবুও ২০২০–২১ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে আড়াই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু খরচ করা হয়েছে সাড়ে ৯ হাজার কোটি টাকা।

প্রথম আলো: প্রকৃত ভুক্তভোগীদের হাতে সেটা পৌঁছেছে কি?

কাজী খলীকুজ্জমান: দরিদ্ররা অনেকখানি পেয়েছিল। পুরোটা পেয়েছে বলব না। কিছু ঝামেলা ছিল। সরকারি ত্রাণ নিয়ে সব সময় একটা ধান্দাবাজ গোষ্ঠী সক্রিয় থাকে। বঙ্গবন্ধুর সময়েও এই ধান্দাবাজি ছিল, এখনো আছে। তবে এবারে ত্বরিত কিছু ব্যবস্থা নেওয়ায় ধান্দাবাজেরা খুব সুবিধা করতে পারেনি।

প্রথম আলো: প্রণোদনার সুযোগটা তো বিত্তবানেরাই বেশি পেয়েছেন, বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা?

কাজী খলীকুজ্জমান: যাদের আছে, প্রণোদনা তারাই বেশি পেয়েছে। ৩০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল বড় ব্যবসায়ীদের। তাঁরা খুব দ্রুত পেয়ে গেলেন। ২০২০–২১ অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য। এর মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হলো ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্রদের জন্য। ছয় হাজার কোটি টাকা মাঝারিদের জন্য। মাঝারিও পেল, ক্ষুদ্ররাও অনেকে পেল। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র যাঁরা গ্রামে থাকেন, তাঁরা পাননি। ব্যাংকের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ নেই, তাঁদের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ। তাঁদের জন্য পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলেন। পরে দুই দফায় আরও তিন হাজার কোটি টাকা। যেহেতু ব্যাংক তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারে না, সে জন্য পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের মতো সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সেগুলো পৌঁছানো হয়।

প্রথম আলো: সরকারের এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও বলা হচ্ছে করোনাকালে দারিদ্র্য বেড়ে গেছে। করোনার আগে বলা হতো ২০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে। এটা এখন কোনো কোনো গবেষণায় আসছে যে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অথচ অর্থমন্ত্রী আবার এটা স্বীকার করেন না।

কাজী খলীকুজ্জমান: হিসাবের বিষয়টা মুশকিল। নানান জনের নানা হিসাব রয়েছে। এটা নির্ভর করে কী মেথডোলজি অনুসরণ করা হয়, তার ওপর। সুতরাং কত শতাংশ দারিদ্র্য বেড়েছে, সেটা বলতে পারব না। তবে করোনাকালে দারিদ্র্য ও বৈষম্য দুটোই বেড়েছে। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেও বেড়েছে।

প্রথম আলো: করোনা মহামারি এখনো শেষ হয়নি। দারিদ্র্য ও বৈষম্য যাতে না বাড়ে, সে জন্য সরকার কি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে?

কাজী খলীকুজ্জমান: কৃষিতে খুব জোর দেওয়া হচ্ছে। করোনাকালে কৃষি আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে। কৃষিতে ঋণ দেওয়া হচ্ছে, প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে কৃষি গতবারও ভালো করেছে, এবারও ভালো করেছে। এ দুই বছরে প্রকৃতিও অনুকূলে ছিল। বড় ধরনের দুর্যোগ হয়নি। অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকেও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে যারা আছে, তাদের কর্মসংস্থানের জন্য প্রচুর প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

প্রথম আলো: করোনাকালে দারিদ্র্য বিমোচনে পিকেএসএফ কী করেছে?

কাজী খলীকুজ্জমান: প্রথমত, আমরা কাজ করি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে। প্রথম কয়েক মাস বন্ধ ছিল কার্যক্রম। বিধিনিষেধ উঠে যাওয়ার পর আমরা আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলোকে দ্রুত টাকা দিয়ে দিই। অমিক্রন সংক্রমণের আগে আমরা আবার করোনা মহামারির আগের অবস্থায় ফিরে গিয়েছিলাম।

কাজী খলীকুজ্জমান: একটা অভিযোগ আছে পিকেএসএফ এত কম সুদে এনজিওদের টাকা দেয় এবং তারা গ্রাহকদের কাছ থেকে অনেক বেশি সুদ নেয়। এটা কি যৌক্তিক?

কাজী খলীকুজ্জমান: সরকারের মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আছে, তারা ২৪ শতাংশ করে দিয়েছে। তারা হিসাব করে দেখেছে এনজিওগুলো যে ঋণ দেয়, সেগুলো আদায় করা ও অন্যান্য ব্যবস্থাপনার জন্য ২১ শতাংশ খরচ হয়ে যায়। আমরা পিকেএসএফ থেকে যে উদ্যোক্তা ঋণ দিই, তার সুদের হার আরও কম ১৮ শতাংশ। জীবনমান উন্নয়নের যে ঋণ, সেটা ৮ শতাংশ সুদে দেওয়া হয়।

প্রথম আলো: ক্ষুদ্রঋণ যাদের দেওয়া হয়, তারা কি সত্যিই দারিদ্র্য অবস্থা থেকে নিজেদের উত্তরণ ঘটাতে পারে?

কাজী খলীকুজ্জমান: ওয়াশিংটনভিত্তিক গ্লোবাল মাইক্রোক্রেডিট ক্যাম্পেইন নামে একটি সংস্থা আছে। তাদের কাজ হচ্ছে বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্রঋণকে জনপ্রিয় করে তোলা। ২০১০ সালে তারা বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১৯৯০ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে জরিপ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী দরিদ্র পরিবারের যারা ঋণ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পেরেছিল।

প্রথম আলো: বাংলাদেশে যে হারে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, সেই হারে জনগণের জীবনমানের উন্নয়ন হচ্ছে না কেন?

কাজী খলীকুজ্জমান: অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমরা প্রথম যেটা শিখি, সেটা শুরু করি ব্যক্তি দিয়ে। তারপর মার্কেট শিখি। পরে মানুষ হয়ে যায় সংখ্যা, অনুপাত। অর্থনীতিবিদদের বেশির ভাগই বলেন প্রবৃদ্ধি হলে উন্নয়ন হবে। বিনিয়োগের কথা তাঁরা বলছেন, কিন্তু কোথায় বিনিয়োগ হচ্ছে, সে প্রশ্ন ঊহ্য থাকছে। একজন অনেক ধনী আর আরেকজনের কিছু নিই। দুজনের গড় মিলিয়ে হয় মাথাপিছু আয়। আমি অনেক দিন ধরে বলে আসছি প্রবৃদ্ধিই উন্নয়ন নয়। পিকেএসএফে আসার পর সেটা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করছি। মানুষ মানে বহুমাত্রিকতা। প্রকল্প একমাত্রিক।

প্রথম আলো: সরকারের যে অর্থনৈতিক নীতি, তাতে এই বৈষম্য কমানোর বিষয়টা আদৌ অগ্রাধিকার পাচ্ছে কি?

কাজী খলীকুজ্জমান: নীতিতে পরিষ্কারভাবে আছে। পরিকল্পনার দলিলে আছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারেও আছে। কাজে গিয়ে ব্যত্যয় ঘটছে। প্রকল্প যখন হয়, তখন কিছুটা সরে আসে। আর বাস্তবায়নকালে আরও সরে আসে।

প্রথম আলো: এই সরকারের গত ১৩ বছরে তো বৈষম্য কমেনি, বেড়েছে...

কাজী খলীকুজ্জমান: ২০১০ সালে গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৪৫, সেটা ২০১৮ সালে সেটা হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮ শতাংশ। শূন্য দশমিক ৫০–এর ওপরে গেলে কিন্তু খুব খারাপ অবস্থা। ভারতে গিনি সহগ শূন্য দশমিক ৫১। পাকিস্তানে আরও খারাপ। বাংলাদেশে কিছুটা হ্রাস টেনে ধরতে পারার কারণে ততটা খারাপ হয়নি। কৃষির ওপরে ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে জোর দেওয়ার কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশের জাতীয় আয়ের অংশ ছিল ২০১০ সালে ২৪ শতাংশের মতো। সেটা এখন ২৮ শতাংশের মতো হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশের শূন্য দশমিক ৭৩ শতাংশ। সেটা এখন কমে হয়েছে শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশ। এই বৈষম্য জাতীয় নীতিতে স্বীকৃত। কিন্তু সেটা বাস্তবায়নে সমস্যাটা রয়ে গেছে।

প্রথম আলো: বাংলাদেশের উন্নয়ন এখন দারিদ্র্য ও দুর্নীতির চক্রে আবদ্ধ। এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কী?

কাজী খলীকুজ্জমান: দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার উপায় হচ্ছে সরকারের যে নীতি আছে, সেই নীতি বাস্তবায়ন করা। তেলা মাথায় তেল না দিয়ে যাদের নেই, তাদের আরও বেশি সহায়তা দিতে পারলে দারিদ্র্য কমে আসবে। আমার কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা বৈষম্য। সরকারের নীতি যাঁরা বাস্তবায়ন করছেন, তাঁদের কাছে মানুষ সংখ্যা, অনুপাত। তাঁরা মানুষের কথা শোনেন না। মানুষকে জানেন না। ঘরে বসেই কর্মসূচি দিয়ে দিচ্ছেন। মানুষের সঙ্গে সংযোগবিচ্ছিন্নতার কারণে জনবিচ্ছিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। আবার প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় বেড়ে গেছে, জাতিসংঘ বলেছে সব ঠিক আছে, এসব নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগেন।

প্রথম আলো: সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। আপনার বিশ্লেষণ কী?

কাজী খলীকুজ্জমান: বিদেশি সংস্থার তথ্যকে আমি খুব গুরুত্ব দিতে চাই না। তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে আমরা দুটি চক্রে বাঁধা পড়েছি। একটা দুর্নীতি, অন্যটা বৈষম্য। দুর্নীতি এতটাই বিস্তৃত যে এর বাইরে থেকে কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। এটা নিচ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে। নদী রক্ষা কমিশনের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারা ৫০ হাজার দখলদারের তালিকা প্রকাশ করেছে। ব্যাংক পরিচালনার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাঁদের অনেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। যাঁরা ঋণ নেন, তাঁদেরও অনেকে দুর্নীতিগ্রস্ত। এ দুই পক্ষের মধ্যে যোগসাজশ আছে। আর যাঁরা ঋণ নেন, তাঁদের মধ্যে অনেকে এত প্রভাবশালী, তাঁদের কথা না শুনলে যে কর্মকর্তা, তাঁর চাকরিও যেতে পারে। কিছু কিছু ব্যাংকের যে মালিকপক্ষই নিজেরাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তারাই তাদের ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে ফেলে।

প্রথম আলো: সেবা খাতগুলোর কী অবস্থা?

কাজী খলীকুজ্জমান: সেবা খাতগুলোর একই অবস্থা। সেবা নিতে কিছু দিতে হয়। দুর্নীতি থেকে যদি দীর্ঘ মেয়াদে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, লক্ষ্য অর্জিত হবে না। ২০৩০ সাল নাগাদ আমরা মধ্য আয়ের দেশ হতে চাই। সেটা হওয়া খুব সহজ। কারণ, মাথাপিছু আয় দিয়েই তা নির্ধারিত হয়। আমাদের মূল লক্ষ্য বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা। উন্নয়নের সুবিধা প্রত্যেকের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেটা করতে গেলে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে। ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা পিছিয়ে আছে, যারা দুর্দশাগ্রস্ত, যারা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, তাদের দিকে বেশি নজর দিতে হবে।

প্রথম আলো: দুর্নীতি দমনে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে কি?

কাজী খলীকুজ্জমান: দুর্নীতি দমন কমিশন খুব যে স্বাধীনভাবে কিছু করতে পারছে তা মনে হয় না। একজন সরকারি কর্মকর্তাকে ধরতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয়। প্রাতিষ্ঠানিক নীতি পরিবর্তন করা দরকার। নীতিনির্ধারকদের অনেকে আমাকে বলেছেন, দুদকের কাজে নাক গলানো হয় না। কিন্তু বাস্তবে রাঘববোয়ালদের তো ধরা হয় না। ধরা হয় চুনোপুঁটিদের।

প্রথম আলো: ব্যবসা–বাণিজ্যেই দুর্নীতিটা বেশি হয়। সরকারের এটা নিয়ন্ত্রণ করার কথা। বাস্তবে দেখছি সরকারকেই নিয়ন্ত্রণ করছেন এই শ্রেণির ব্যবসায়ীরা।

কাজী খলীকুজ্জমান: ৭০ শতাংশের কাছাকাছি সাংসদ ব্যবসায়ী। সংসদে আইন প্রণয়নে তাঁদের ভূমিকাই প্রধান হবে। এরপর বিভিন্ন খাতেও ব্যবসায়ী মন্ত্রী-সাংসদেরা সক্রিয়। ফলে ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর চাপ নীতিনির্ধারকদের ওপরে থাকবেই। এ থেকে বের হয়ে আসতে হলে বঙ্গবন্ধুর কাছে ফিরে যেতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘কেউ খুব বেশি ধনী হবে, সেটা আমি চাই না। আমি কমিউনিস্ট নই, সমাজতন্ত্রী।’ তিনি দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর কথা বলেছিলেন, তার একটা বড় দার্শনিক ভিত্তি আছে। সেটা হচ্ছে, সুষম সমাজ।

প্রথম আলো: এখানে বিভিন্ন কমিশন হয়। সেই কমিশনগুলো রিপোর্টও দেয়। আপনি পাট কমিশনের প্রধান ছিলেন। কিন্তু কমিশনের রিপোর্ট কতটা বাস্তবায়ন করা হয়?

কাজী খলীকুজ্জমান: পাট কমিশনের ক্ষেত্রে আমরা যা যা সুপারিশ করেছিলাম, নীতিতে সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। আমরা পাটকল বন্ধ করার কথা বলিনি। পাটকল বাঁচানোর পদ্ধতি আবিষ্কার করার চেষ্টাও করা হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো। বস্ত্র ও চিনিশিল্পের অবস্থাও নাজুক। এখানে দুটি বিষয় আছে। একটা ব্যবসায়িক স্বার্থ, অন্যটা শিল্পের স্বার্থ। এখানে এখন ব্যবসায়ী পুঁজি শক্তিশালী। তারা ক্ষমতাবান। তাদের কারণে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না।

প্রথম আলো: তাহলে শিল্পমালিকদের চেয়ে ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কি নীতিনির্ধারণে বেশি প্রভাব রাখছে।

কাজী খলীকুজ্জমান: বাংলাদেশে শিল্প ঐতিহ্যই গড়ে ওঠেনি সেভাবে। পাকিস্তান আমলে তো ছিলই না। এরপর কিছু কিছু গড়ে উঠেছে। কিন্তু এখনো ব্যবসায়ী মনোবৃত্তিটা বেশি রয়ে গেছে। দ্রুত আয় করা, দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রবণতা রয়ে গেছে। ফলে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো সরকারের নীতি পরিবর্তন করে ফেলে। আবার ব্যক্তিস্বার্থেও হচ্ছে।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

কাজী খলীকুজ্জমান: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন