মাসদার হোসেন অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ। রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ মামলার বাদী হিসেবে তাঁর বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। ২০০৭ সালে তিনি সারা দেশের সাবরেজিস্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রণকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশনের (আইজিআর) দায়িত্ব পালন করেছিলেন। জমি নিবন্ধনের ৮ দিনের মধ্যেই নামজারি করা বিষয়ে ৯ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় একটি সিদ্ধান্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মিজানুর রহমান খান
default-image

প্রথম আলো: ২০০৭ সালে আপনি আইজিআর ছিলেন। জমি নিবন্ধনসংক্রান্ত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত কীভাবে দেখেন?

মাসদার হোসেন: এর দুটি দিক আছে। প্রথমত আমি ডিজিটালাইজেশনের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। কিন্তু জমি নিবন্ধনের আট দিনের মধ্যেই নামজারি হবে, এটা অসম্ভব। বাস্তবতাবিবর্জিত চিন্তা। এখানে শুরুতেই বলে রাখি, কেবল গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে আমি আমার মত রাখছি। এ বিষয়ে সরকারি ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে। আপাতত যেটুকু বোঝা যাচ্ছে, সেটা ভীষণ গোলমেলে। কারণ, বিদ্যমান আইনই তো বলছে, ৪৫ দিনের মধ্যে নামজারি সম্পন্ন করতে হবে। সেটা তো অচল। এবং কেন তা অচল, ৪৫ দিনের সীমা কেন অর্জন করা গেল না তার ব্যাখ্যা কি কেউ আমাদের দিয়েছে? সুতরাং ৪৫ দিনে যা দেওয়া যায় না, সেটা কীভাবে ৮ দিনে করা যাবে, তার সদুত্তর আমাদের জানা নেই। আইজিআর পদে ২০০৭ সালে সাত মাসের মতো দায়িত্বে ছিলাম। এবং জজিয়তির অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ৪৫ দিনের সময়সীমা ১০ ভাগ দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও তা অনুসরণ করা হয় না। আমার ভ্রান্তি হতে পারে, তবে অনুমান করি, এখনো ৪৫ দিনের শর্ত ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েই চলেছে।

প্রথম আলো: আপনি তখন কী দেখেছিলেন? কী করেছিলেন?

মাসদার হোসেন: দলিলের সার্টিফায়েড কপি নিতে দুই থেকে সাত বছরও বিলম্ব ঘটে। অথচ দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জন্য এটা প্রয়োজনীয়। নামজারি ছাড়াও বহু কাজে এর দরকার পড়ে। মন্ত্রিসভা বলল, এই দলিল তাৎক্ষণিক দেওয়া যায় কি না? আমি তখন ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন (আইজিআর) হিসেবে আইন উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের দেখা করি। তাঁকে বলি, এর একটা সমাধান হলো একত্রে তিনটি মূল দলিল তৈরি করা। সাবরেজিস্ট্রার বিধিমতে নিবন্ধন করে একটি তাঁর দপ্তরে সংরক্ষণ করবেন। দাতা ও গ্রহীতা অন্য দুটি পাবেন। তিনি সম্মত হন এবং তেজগাঁওয়ে আমরা এর বাস্তবায়ন শুরু করে দিলাম। সাত দিন চলেছিল। অকস্মাৎ আমাকে বদলি করা হলো। সেই প্রকল্পের ইতি সেখানেই ঘটল। এরপর নজরে এল গত সোমবারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের খবর।

তখনকার আরেকটি ঘটনা। সুনামগঞ্জের সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন পিয়নের কাছ থেকে পাঁচ কোটি টাকা উদ্ধার হলো। তাঁরা অফিসে ভুয়া স্লিপ জমা দিতেন। টাকা ভাগাভাগি করে নিতেন। তাই প্রজ্ঞাপন জারি করলাম যে সব টাকা দিতে হবে পে–অর্ডারের মাধ্যমে। সাত দিন চলল। এরপর আমাকে বদলি করা হলো। সেই প্রকল্পের সেখানেই ইতি।

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলো: মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে করা হয় বলে সমন্বয় করা কষ্টসাধ্য ছিল, এ জন্য দীর্ঘসূত্রতাও ছিল। নিবন্ধনেও কিছুটা অস্পষ্টতা ছিল। আবার নামজারির ক্ষেত্রেও ঝামেলা হতো।

মাসদার হোসেন: আমি তাঁর প্রতি সম্মান রেখে বলতে চাই, এতে তিল পরিমাণে বাস্তবতা নেই। কারণ, একজন রেজিস্ট্রার যখন দলিল নিবন্ধন করেন তখন খাজনার রসিদ, নামজারি তথা মালিকানাসংক্রান্ত সব তথ্য যাচাই না করে করেন না। নামজারি করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এসব নিয়েই তো দলিল তৈরি হয়। এখন মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত পত্রিকায় পড়ে প্রতীয়মান হয় যে রেজিস্ট্রারকেই দ্বৈত ভূমিকা দেওয়া হয়েছে। তিনিই সহকারী কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করবেন। রেজিস্ট্রারকে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনের কাছ থেকে তথ্য জেনে দলিল করতে। কিন্তু তাঁর কাছে তো এমন তথ্য নেই, যা রেজিস্ট্রারের জানা নেই। জানা না থাকলে তঁার পক্ষে তো দলিল নিবন্ধন করার তো প্রশ্নই আসে না। আবার বলা হয়েছে, নিবন্ধনের পরে সহকারী কমিশনারকে অবহিত করতে হবে, বর্তমান আইন এটা অনুমোদন করে না। আপনি বলবেন, তারা আইন সংশোধন করে নেবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার যুক্তি কী? মানুষের দুর্ভোগ কমানোর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। মনে রাখতে হবে, যে আইনে দলিল নিবন্ধন হচ্ছে তা ১৭৮১ থেকে ১৯০৮ পর্যন্ত প্রায় ১৭টি আইনের ভিত্তিতে। সময়ের ব্যবধানজনিত ত্রুটিবিচ্যুতি ছাড়া ১৯০৮ সালের আইনটি আজও চমৎকারভাবে কার্যকর। ডিজিটাল ও মোবাইল তখন ছিল না। এখন প্রযুক্তির সঙ্গে আইনের সমন্বয় ঘটাতে হবে। আইন হালনাগাদ করতে হবে। প্রক্রিয়ার গলদ দূর করতে হবে। কিন্তু আট দিনের মধ্যে নামজারির জন্য সরকারি দুটি ভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর যে জোর দেওয়া হলো, তা পুরোপুরি অপ্রাসঙ্গিক। যেখানে সমন্বয় অবান্তর, সেখানে সেটা নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত বিস্ময়কর।

প্রথম আলো: ৪৫ দিনের পরিবর্তে ৮ দিন যদি নির্দিষ্ট করে এবং সেটা বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়?

মাসদার হোসেন: (হাসি) আমাদের অভিজ্ঞতা তো আমরা ভুলে থাকব না। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে শিরোনাম হলো। কিন্তু এ রকম আইন যদি করাও হয়, তাহলে তার কী পরিণতি হতে পারে, সেটা বুঝতে আপনি দ্রুত বিচারসংক্রান্ত বিশেষ আইনগুলোর বিধানাবলি স্মরণ করুন। কোথাও হয়তো ১২০ বা ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার বিধান লেখা আছে। কিন্তু এসব বিধান তো অভ্যাসগতভাবে অকার্যকর থাকছে।

প্রথম আলো: সফটওয়্যারে জমি নিবন্ধন ও নামজারির কার্যক্রম সমন্বয় করা হবে। এটা ১৭টি উপজেলায় চলছে, এক বছরের মধ্যে সারা দেশে, এটা ভালো নয়?

মাসদার হোসেন: অবশ্যই ভালো। এই ডিজিটাল সমন্বয়কে স্বাগত জানাই। কিন্তু ১৭টি উপজেলায় কী চলছে, সেটা আপনাকে বুঝতে হবে। এই প্রকল্প সফল হোক, সেটা চাই। কিন্তু এর সঙ্গে আট দিনের মধ্যে নামজারির কী সম্পর্ক, তা মাথায় আসছে না। কারণ, জরিপ অধিদপ্তর অনলাইনে ইতিমধ্যে ৪ কোটি ৩০ লাখ রেকর্ড অনলাইনে দিয়েছে। ধরুন, আপনার ৭টি খতিয়ানে জমি আছে। আজ সেখানে আমবাগান আছে। আপনি আগামীকাল জামবাগান করলেন। তো এটাকে জামবাগান করার পরে যদি তা বিক্রির জন্য সাবরেজিস্ট্রারের কাছে আসে, তাহলে তা জামবাগান হিসেবেই আসতে হবে। সেটা আগেই করবেন সহকারী কমিশনার। কিন্তু দলিল বিক্রির নিবন্ধনের প্রস্তাবিত আট দিনের মধ্যে তো আপনি আমবাগানকে জামবাগান করতে পারবেন না। সুতরাং আমি সংশয়গ্রস্ত যে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের নামে আসলে সহকারী কমিশনারের দায়িত্ব অযথা বৃদ্ধি করা হচ্ছে কি না। এতে জটিলতা আরও বাড়বে। আইনের অনুমান হচ্ছে, বৈধ কাগজপত্রসংবলিত দলিল নিবন্ধনের আবেদন উপস্থাপন করা হচ্ছে। সাবরেজিস্ট্রার এটা নাকচ করতে পারেন না। তবে তঁাকে যাচাই করে নিতে হবে। তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে এটা সম্পাদন করতে হবে।

প্রথম আলো: কত দিনের মধ্যে নামজারি সম্ভব?

মাসদার হোসেন: নামজারির অংশটি কিন্তু সহকারী কমিশনারের। নিবন্ধিত দলিলের মূল অনুলিপিটা সহকারী কমিশনারের হস্তগত হওয়াটিই মুখ্য। সেখানেই সব তথ্য থাকবে। সেই কারণেই আমি একত্রে তিনটি মূল দলিলের বিধান করেছিলাম। আমি মনে করি, তেজগাঁও কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রি অফিসে সাত দিন কীভাবে কাজ হয়েছিল, তার মূল্যায়ন করা হোক। এবং তার আলোক সিদ্ধান্ত হোক।

১৯০৮ সালের আইনের ৬৩ ধারায় একটি উত্তম সংশোধনী আনা হয়েছিল ২০০৫ সালে। সেই থেকে নিবন্ধনের সময় দলিলে গত ২৫ বছরের জমির ইতিহাস এবং দরকারি সব তথ্য লেখা থাকে। এবং এর কোনো ব্যত্যয় ছাড়াই এই বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে। সুতরাং আমি মনে করি, সহকারী কমিশনারের কাছে ওই ‘মূল দলিল’ দ্রুত পৌঁছানো নিশ্চিত করা হোক। তখন প্রতিটি দলিল নিবন্ধনের স্বল্প দিনের মধ্যে নামজারি করা সম্ভব।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

মাসদার হোসেন: ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0