প্রথম আলো: কোভিড বিশ্ব অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি করেছে, তা শিথিল হওয়ার পথে কতটা স্বাভাবিক গতিতে এগোচ্ছে?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বিশ্ব অর্থনীতি অনেক ক্ষেত্রে সচল হয়েছে, কিন্তু পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া অনেকটাই অসম। ২০২১ সালে বিশ্ব অর্থনীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি একদিকে বৈশ্বিক মন্দার অবসানের আশা তৈরি করেছে। কিন্তু বর্তমান ও আগামী বছরে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ভালো নয়। দুই বছর আগে, যখন মহামারির সূচনা হয়েছিল, তখন টিকার সংকট, ভাইরাসের নতুন নতুন ধরনের বিস্তার, অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মেয়াদ, রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার কার্যকারিতাসহ অনেক বিষয়ই ছিল অজানা এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার–সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলো অনেকটাই ছিল অনুমানভিত্তিক। তাই সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পর্যালোচনার ক্ষেত্রেও বেশ মতভেদ রয়েছে।

মহামারির অর্থনৈতিক-সামাজিক ক্ষতি মোকাবিলার উদ্যোগ যখন চলমান, তখন একাধিক নতুন বৈশ্বিক সংকটের সূচনা হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত জ্বালানি, পণ্য ও খাদ্যের মূল্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। অন্যদিকে নতুন অমিক্রন ভাইরাস সংক্রমণ এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী বাড়তি অনিশ্চয়তা ও ভীতির সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে ২০২১ সালের তুলনায় বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আবারও মন্থরতা এসেছে। একটি গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, এই বছর বিশ্বব্যাপী প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৪ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে যেতে পারে।

প্রথম আলো: করোনা বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে ক্ষতিকর কী প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: করোনার আর্থসামাজিক প্রভাব বহুমাত্রিক এবং বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে। কিন্তু যদি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত খাত হিসেবে কোনোটিকে চিহ্নিত করতে হয়, তবে সেই খাত হচ্ছে শিক্ষা। বাংলাদেশে এই খাত বরাবরই উপেক্ষিত এবং শিক্ষায় বিনিয়োগ আগে থেকেই অনেক কম। এর সঙ্গে মহামারির সময়ের অব্যবস্থাপনা যুক্ত হওয়ায় শিক্ষা খাতের সংকট শোচনীয় হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে তখন সবচেয়ে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। অফলাইন ও অনলাইনে এই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা ছিল সবচেয়ে অকার্যকর ও নিম্নমানের। ডিজিটাল সহজলভ্যতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে রয়েছে সমাজে উচ্চ ও নিম্নবিত্তের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের এক হিসাব অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে ক্ষতির কারণে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে ৩১ হাজার ৪৮১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। মহামারি সৃষ্ট শিক্ষা বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক বোঝা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুবই বিপদ ডেকে আনবে।

করোনার কারণে বাংলাদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গিয়েছিল। এখন তারা পড়েছে দ্রব্যমূল্যের চাপে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য টিসিবি কার্ড ও কম দামে পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে তা কতটা ভূমিকা রাখবে?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: আন্তর্জাতিক মূল্যের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা মোকাবিলায় এ ধরনের কার্ডের প্রবর্তন একটি প্রয়োজনীয় প্রাথমিক পদক্ষেপ। তবে এর পুরো কার্যকারিতা রাষ্ট্রের সক্ষমতা ও সুশাসনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। সামাজিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্র প্রদত্ত সাহায্যের সুফল পেতে গেলে বিদ্যমান প্রশাসনিক ঘাটতি, অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির মতো বিষয়গুলো দূর করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে অনেক হতদরিদ্র পরিবার দুর্নীতির কারণে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি বলে অভিযোগ আছে। করোনার কারণে যারা নতুন দরিদ্র হয়েছে, সেই জনগোষ্ঠীর বাড়তি চাপ এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি উৎপাদন খরচ স্থায়ীভাবে বৃদ্ধির পায় এবং দাম বাড়তে থাকে, তাহলে সরকারকে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিয়ে মজুরি হারের সমন্বয় ও কৃষি খাতে ভর্তুকির মতো আরও সম্পূরক কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।

বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের বৈদেশিক আয়ের সব ক্ষেত্রেই আয় কমছে। দেশের অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বৈশ্বিক সংকটকালে বৈদেশিক আয়ের স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা অস্বাভাবিক নয়। যেসব দেশের আমদানি-জিডিপির অনুপাত কম, যেমন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১৮ ভাগ, এমন পরিস্থিতিতে বৈদেশিক আয় হ্রাস তাৎক্ষণিক উদ্বেগের বিষয় নয়। তবে এ–সংক্রান্ত সংকটের অনেকটাই নির্ভর করে তিনটা সূচকের ওপর—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পর্যাপ্ততা, বৈদেশিক ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক আয়ের উৎস। আমরা দেখেছি যে আমদানি-জিডিপির অনুপাত মাত্র ২২ ভাগ হওয়ার পরও শ্রীলঙ্কা কীভাবে সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত রিজার্ভের কারণে বাংলাদেশ হয়তো এখনই কোনো হুমকির মুখে পড়বে না, কিন্তু এ বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।

করোনার সময়ে ও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক নীতিকৌশল অবলম্বন করে চলেছে, তাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বাংলাদেশের বিশাল কর্মজীবী জনসংখ্যা ও সামাজিক বাস্তবতার বিবেচনায় সরকার অর্থনীতি ও জীবিকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে একটি ব্যবসাবান্ধব কৌশল গ্রহণ করেছে। যে কারণে করোনা সংক্রমণ যখন উদ্বেগজনক ছিল, তখনো সরকার শিল্পকারখানা খোলা রাখার জন্য একাধিকবার বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। তৈরি পোশাক খাতের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার বিষয়টিও ছিল সময়োচিত। এই পদক্ষেপগুলো রপ্তানি খাতকে প্রাথমিক ধাক্কা সামলে দ্রুত পুনরুদ্ধারের পথে সহায়তা করেছিল। তবে এটাও সত্য যে স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় মহামারির প্রথম মাসগুলোতে সরকারের কৌশল ও ব্যবস্থাপনায় বেশ ঘাটতি ছিল। বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে নীতি ও কৌশলগত সমন্বয়ের ব্যর্থতা ছিল লক্ষণীয়। করোনার পরীক্ষা ছিল অপর্যাপ্ত। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ এবং খোলার ক্ষেত্রে অসামঞ্জস্যসহ সরকারি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনগণকে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি ছিল অগোছালো ও অস্বচ্ছ। তবে করোনার দ্বিতীয় বছরে সক্রিয় টিকা কূটনীতি এবং বৈদেশিক দাতাদের সহায়তায় দ্বিতীয় ডোজ দিয়ে প্রায় দেশের ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে টিকা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে প্রশংসনীয় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এখানে এটাও বিবেচনায় রাখতে হবে যে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের পাশাপাশি রেকর্ড পরিমাণ রেমিট্যান্সের কারণে অর্থনীতি উপকৃত হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকশ্রেণির আরও প্রান্তিক হয়ে পড়া, দারিদ্র্য বাড়া, শিক্ষা খাতের সংকট এবং অভিজাত ও ধনীবান্ধব সরকারি নীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।

করোনা মহামারিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেল, তা থেকে আমাদের কী কী শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন? বিশেষ করে ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায়।

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: করোনা মহামারি আমাদের সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বিদ্যমান বহু কাঠামো ও ব্যবস্থাপনাগত ফাঁকফোকর ও ঘাটতি উন্মোচন করেছে। সরকারের উচিত এগুলো জরুরি ভিত্তিতে সমাধান করা। এ ক্ষেত্রে আমি কিছু বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। প্রথমত, বর্তমান প্রবৃদ্ধির কৌশল এবং পুনরুদ্ধার পন্থার পুনর্বিন্যাস করা। ডিজিটাল প্রযুক্তি, মেগা অবকাঠামো প্রকল্প এবং ব্যবসায়ীবান্ধব বাণিজ্যনীতি—এসবের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু এই কৌশলকে টেকসই করার জন্য আমাদের তরুণ জনশক্তির অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন ছাড়া আমাদের তরুণ কর্মী বাহিনী কখনোই জাতীয় জনসম্পদে পরিণত হবে না। নিম্নমান ও আর্থিকভাবে রুগ্‌ণ সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না হলে কখনোই বিদ্যুৎ, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ খাতের মেগা প্রকল্প টেকসই প্রবৃদ্ধি আনতে পারে না। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যৎ সংকটের মোকাবিলার জন্য সরকারকে হতে হবে সত্যিকার অর্থেই কর্মতৎপর এবং জনমুখী। মাত্রাহীন দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতার বিচারে বিশ্বব্যাংকিংয়ের শীর্ষে থেকে এবং এই ঘাটতিগুলোকে ক্রমাগত অস্বীকার করে গেলে আমাদের অগ্রগতি টেকসই হবে না। তৃতীয়ত, সংকটের সময় সরকারি কর্মসূচির কার্যকর সমন্বয় ও বাস্তবায়নের জন্য জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতান্ত্রিক নীতি ও ঐতিহ্যে ফিরিয়ে না আনা গেলে এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক শোচনীয় পরিস্থিতি আমাদের মতো অনেক দেশকেই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিভিন্ন সামাজিক সূচকে একসময় দেশটি সবচেয়ে এগিয়ে ছিল। এমন একটা অবস্থা থেকে দেশটি পতনের বিভিন্ন কারণ বিশেষজ্ঞদের মুখে শোনা যাচ্ছে। আপনার নিজস্ব কোনো মত আছে কি?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পতনের বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ক্রোনিজম, রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রীভূতকরণ, পরিবার ও স্বজনপ্রীতির সংস্কৃতি, ভুল কৃষিনীতি, অত্যধিক মাত্রার বিদেশি ঋণ গ্রহণ, রপ্তানির ভঙ্গুর ভিত্তি এবং অন্তর্মুখী শিল্পায়নের কৌশলকে এই সংকটের জন্য অনেকে দায়ী করেছেন। আমি এর সঙ্গে একটি ভিন্ন দিকের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হচ্ছে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় উচ্চাশা এবং রাজনীতিবিদদের অযৌক্তিক উদ্দীপনা। আজকের সংকটের এক দশক আগে যুদ্ধ-পরবর্তী শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি সমৃদ্ধির পথে ছিল। দারিদ্র্যের হার ২০১৬ সালের মধ্যে ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছিল। ১৯৯২ থেকে ২০০৪—এই ১৪ বছরে রপ্তানি-জিডিপির অনুপাতও বৃদ্ধি পেয়েছিল। একসময় জিডিপি ৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। এসব পরিবর্তন শ্রীলঙ্কার অর্থনীতির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস এবং অতিমাত্রার বিভ্রম সৃষ্টি করে। অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সামষ্টিক ভঙ্গুরতাকে উপেক্ষা করে সরকার জনপ্রিয় ও দৃশ্যমান বহুবিধ এবং বৈদেশিক ঋণনির্ভর মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে। এ কারণেই রপ্তানির পতনের হার, বাড়তি ঋণর বোঝা এবং ক্রমবর্ধমান সামাজিক বৈষম্যের মতো সুস্পষ্ট ও আসন্ন বিপদগুলো উপেক্ষিত হয়। অগণতান্ত্রিক এবং স্বজনপ্রীতির রাজনৈতিক ব্যবস্থা নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে এ রকম ব্যর্থতার জন্য দায়ী।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের জন্য মেগা প্রকল্পগুলোকে অনেকেই দায়ী করেছেন। বাংলাদেশেও অনেক মেগা প্রকল্প চলছে। আপনার কাছে একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ আশা করছি।

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ বিভিন্ন সামাজিক এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকে দীর্ঘ সময় ধরে ভালো করে আসছে। এ কারণেই দুটি দেশই সরকারি উদ্যোগে ভবিষ্যৎমুখী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে একটি বড় ধাক্কার মাধ্যমে অর্থনীতিতে ইতিবাচক আশাবাদ সৃষ্টির উদ্যোগ নেয়। এটা প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আরও উৎসাহিত করার এক নতুন কৌশল। এ ক্ষেত্রে দুটি দেশই অসংখ্য অবকাঠামো প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। কিন্তু প্রকল্প যথাসময়ে শেষ না হওয়া, এর বাণিজ্যিক অকার্যকারিতা, বৈদেশিক অর্থায়নের নির্ভরতা এবং প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতি—সব মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার মেগা প্রকল্পগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দরটির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পরও কেবল রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। ২০১০ সালে চালু হওয়ার পর এটি পরবর্তী সময় মুখ থুবড়ে পড়ে। সম্পূর্ণভাবে চালু হওয়া একাধিক পাওয়ার প্ল্যান্ট, বিমানবন্দর এবং হাইওয়ে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর এবং চীনা ঋণের লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ রকম পরিণতি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পের খরচ ও সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির অবমূল্যায়ন, অর্থনৈতিক সুবিধা অতিমাত্রায় ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো এবং এর পাশাপাশি প্রকল্প শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগা—এসব মিলিয়ে আমাদের মেগা প্রকল্পগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই উচিত বাগাড়ম্বর ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক সাফল্যের বাইরে তাকিয়ে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ‘গ্রে রাইনো’ ইভেন্টগুলো অবিলম্বে শনাক্ত করা এবং এগুলোর খোলামেলা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন উৎসাহিত করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি পরিসংখ্যানের বৈধ সমালোচনা এবং গোষ্ঠীতন্ত্র ও দুর্নীতি নিয়ে গণ–উদ্বেগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতার পরিবর্তন

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, মেগা প্রকল্পগুলোর খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে তা শেষ হচ্ছে না। এতে খরচ আরও বাড়ছে। প্রকল্পগুলো যথাযথ হিসাব-নিকাশ করে নেওয়া হলে তো এমন হওয়ার কথা নয়। প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দক্ষতার ঘাটতি আছে বলে মনে করেন কি?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: বিষয়টি রাজনীতি–সম্পর্কিত, এটি কেবল প্রকল্প যাচাই-বাছাইয়ের টেকনিক্যাল সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশেই আর্থিক এবং সামাজিক দিক উপেক্ষা করে রাজনৈতিক ফায়দার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়। এর মাধ্যমে দলীয় লোকজন ও সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীদের পয়সা কামানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়। মালয়েশিয়ায় ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের দীর্ঘ ৬২ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির তথ্য একের পর এক ফাঁস হতে শুরু করে। ২০১৮ সালে ক্ষমতাসীন নতুন সরকার অবাস্তব এবং অতিরিক্ত রাজস্ব ব্যয়ের উদ্বেগ বিবেচনায় চীনের সঙ্গে বহু বিলিয়ন ডলারের ইস্ট কোস্ট রেল লিংক প্রকল্প স্থগিত করে। প্রকল্পটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক দ্বারা অনুমোদিত হয়েছিল। তাঁর এক দশকের শাসন ব্যাপক আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং দুর্নীতি দ্বারা কলঙ্কিত ছিল। পরে চীনের বিআরআই প্রকল্পের অধীনে নাজিব সরকার অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর আরও দুর্নীতির প্রমাণ উঠে এসেছে। একটি পেট্রোলিয়াম এবং গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পের মাত্র ১৩ ভাগ নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারকে পুরো প্রকল্প ব্যয়ের ৮৮ ভাগ দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠীতন্ত্র, প্রকল্পের যাচাই-বাছাইয়ে অস্বচ্ছতা, আর্থিক অনিয়ম, স্বাধীন ও মুক্ত নাগরিক আলোচনার অভাব ও সংবাদপত্রের সীমিত স্বাধীনতা—উদ্বেগ বাড়িয়ে চলেছে। মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্বেগের যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

আমরা দেখছি, বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের দায় তুলনামূলকভাবে বাড়ছে। ২০০৯-১০ সালে যেখানে ঋণ পরিশোধের দায় ছিল বছরে ৮৮ কোটি ডলারের কাছাকাছি, এখন তা ১৯১ ডলার ছাড়িয়েছে। মেগা প্রকল্পগুলোর কারণে সামনে এই দায় আরও বাড়বে। সেই চাপ নেওয়ার সক্ষমতা সামনে বাংলাদেশের থাকবে তো?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: এটি একটি কোটি ডলারের প্রশ্ন। শ্রীলঙ্কায় ঋণ-জিডিপির অনুপাত ১০০ শতাংশের ওপরে। সেখানে আমাদের সূচক এখনো ৪০ ভাগের নিচে। কিন্তু মেগা প্রকল্পের বিপুল ব্যয়বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে ঋণের দায়বদ্ধতা নিয়ে ভবিষ্যতে বড় রকমের অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে মেগা প্রকল্পগুলো রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ভবিষ্যতের এই ক্রমবর্ধমান আর্থিক ভার বহন করতে সক্ষম কি না, তা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর—প্রকল্পগুলো অর্থনৈতিকভাবে কতটা লাভ ফিরিয়ে দেবে এবং আমাদের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য। যদি দুটিই নেতিবাচক হয়ে যায়, তবে আমরাও শ্রীলঙ্কার মতো সংকটের মুখোমুখি হতে পারি। দুর্বল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অতিরিক্ত উদ্বেগের আরও কারণ হলো, সুবিধাভোগী ঠিকাদার এবং লোভী রাজনীতিবিদদের ব্যক্তিস্বার্থে প্রকল্পের খরচ অসম্ভব বেড়ে যাওয়া এবং তা ঠেকাতে না পারা। নীতি বাস্তবায়নে এ ধরনের ব্যবহারিক গাফিলতির কারণে পরবর্তী সময় যে সংকট সৃষ্টি হয়, তাকে আমেরিকান চিন্তাবিদ মিশেল উকার ‘গ্রে রাইনো’ ইভেন্ট বলে অভিহিত করেছেন। এটা অনেকটা এ রকম যে একটি ধূসর গন্ডার তেড়ে আসছে, কিন্তু আত্মতুষ্টির কারণে তাকে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না।

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা এবং ইউক্রেন সংকটের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে অনিশ্চিত অবস্থার তৈরি হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: ইউক্রেন সংকট আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, একটি আঞ্চলিক সংকটের সুদূরপ্রসারী ও বহুবিধ বৈশ্বিক প্রভাব রয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে সুশাসনের মৌলিক ঘাটতি এবং অন্তর্মুখী অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে বাইরের একটি বড় ধাক্কা বহু বছরের অর্জিত অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ধ্বংস করতে পারে। বাণিজ্য এবং রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে এ ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা বেশি। অনেকটা শ্রীলঙ্কার মতো বাংলাদেশের অর্থনীতির দুই স্তম্ভই শ্রমনির্ভর। তৈরি পোশাক রপ্তানি কিংবা রেমিট্যান্সের অর্জনে কোনো রকম বৈশ্বিক ধাক্কা আমাদের অর্থনীতির বিপদ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। কোভিড-পরবর্তী বিশ্বে, বৈদেশিক শ্রমিকনির্ভর অনেক দেশে অটোমেশনের প্রবণতা জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের কিছু আঞ্চলিক রপ্তানি প্রতিযোগী, যেমন ভিয়েতনাম বাহ্যিক ঝুঁকি কমানোর জন্য ইতিমধ্যে তাদের রপ্তানি শিল্প খাতে ব্যাপক সংস্কার এনে তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়েছে। শ্রীলঙ্কার মতো অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে হলে আমাদের অবশ্যই উচিত বাগাড়ম্বর ও আত্মতুষ্টির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা। বর্তমান সময়ের অর্থনৈতিক সাফল্যের বাইরে তাকিয়ে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে ‘গ্রে রাইনো’ ইভেন্টগুলো অবিলম্বে শনাক্ত করা এবং এগুলোর খোলামেলা ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন উৎসাহিত করা। এর পাশাপাশি প্রয়োজন সরকারি পরিসংখ্যানের বৈধ সমালোচনা এবং গোষ্ঠীতন্ত্র ও দুর্নীতি নিয়ে গণ–উদ্বেগকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার মানসিকতার পরিবর্তন।

আপনাকে ধন্যবাদ।

নিয়াজ আসাদুল্লাহ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকার থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন