আর্থিক খাতে একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটছে। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির দায়ে সাবেক এক এমডিসহ নয়জন দণ্ডিত হয়েছেন। একে কি শুভসূচনা বলবেন, না বিরল দৃষ্টান্ত; যেখানে বড় বড় কেলেঙ্কারির বিচার হয়নি।

সালেহউদ্দিন আহমেদ: একের পর এক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটছে সুশাসন, জবাবদিহি এবং দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে। নজরদারির অভাব, যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং শাস্তির বিধানের অভাব অনেক অন্যায়কারী এবং অন্যায় মনোভাবাপন্ন লোককে অনেকটা উৎসাহিত করছে। এটা মোটেও কাম্য নয়। সোনালী ব্যাংকের এমডি ও অন্য কর্মকর্তাদের দণ্ড হয়েছে। এটা ভালো দিক, তবে লেগেছে প্রায় এক যুগ। তা ছাড়া এমন অনেক অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা এখনো বিচারের আওতায় আসেনি, আবার অনেকের বিচার এখনো শেষ হয়নি। তদন্তের পর্যায় দীর্ঘায়িত হলে ঘটনাগুলো বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়। এখন প্রয়োজন দ্রুত বিচার শেষ করে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান করা।

আর্থিক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খবরদারি ও নজরদারি কতটা আছে? যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়েছে এবং পি কে হালদারের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ আছে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ: আর্থিক খাতের ওপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাধিক্য এবং ব্যাংকের কিছুটা মন্থর প্রক্রিয়ার জন্য আশানুরূপ হচ্ছে না। নজরদারি আরও গতিশীল করতে হবে। অডিট, পরিদর্শন, ভিজিল্যান্স, অন-সাইট ও অফ-সাইট বিভাগ—সব কটি আরও সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেবে, এটাই কাম্য। ব্যাংকে কোনো অনিয়ম ও বিচ্যুতি ঘটলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। রিজার্ভ চুরির বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। তবু আপাতদৃষ্টে মনে হয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারি ও সতর্কতার কিছুটা দুর্বলতা ছিল এবং বিষয়টি জানার পর অতি দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।

প্রথম আলো: ব্যাংকের নয়–ছয় সুদের হার আবার শিথিল করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। নয়–ছয় হার অনেক ব্যাংক এখনো মানছে না। তাহলে কি আগের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: একটি বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে সুদ বা অন্য কোনো বিনিময় হার নির্ধারণ করা সঠিক নয়। এই প্রক্রিয়া থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি দুই দশক আগে। অতএব, এই নির্দিষ্ট সুদের হার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তদ্রূপ ইদানীং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারও একটা অঙ্কে বেঁধে দেওয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। সেটাও আমি মনে করি সঠিক নয়। সেটা করলে অবশ্যই অত্যন্ত স্বল্প সময়ের জন্য আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে নিতে হবে।

করোনা মহামারি আমাদের অর্থনীতিকে খুব বেশি নাজুক করতে না পারলেও ইউক্রেন যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কি যথেষ্ট প্রস্তুত ছিল বলে মনে করেন? না থাকলে কোথায় ঘাটতি ছিল?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য পণ্য, যেমন সেবা, যাতায়াত—এগুলোর দামও বেড়ে যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি অনেকটা সরবরাহের কারণে। বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে দেশেও দাম বাড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যে হারে আমদানি করা পণ্যের দাম বাড়ছে, সে হারের চেয়ে দেশীয় বাজারে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বেশি। দেশীয় পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহের প্রক্রিয়ায় পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে কিছুটা যোগসাজশ থাকতে পারে। তা ছাড়া ঘাটে ঘাটে চাঁদা, মধ্যস্বত্বভোগী লোকদের কমিশন আদায়, পরিবহনের ভাড়া ইত্যাদিও কারণ। সরকারের পক্ষ থেকে নজরদারির দুর্বলতা ছিল এবং সময়মতো কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। শুধু পর্যবেক্ষণ করা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে আলোচনাই যথেষ্ট নয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পরিদর্শন—এগুলোও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পণ্যের চাহিদা, সরবরাহ, মজুত, আমদানি এবং সরকারের ভান্ডারে কী পণ্য কতটুকু মজুত, এগুলোর প্রতি সব সময় নজর রাখতে হবে।

টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ছে। এর জন্য পণ্যবাজারে কতটা প্রভাব পড়ার কথা, আর পড়েছে কতটুকু? মূল্যস্ফীতি রোধে সরকারের পদক্ষেপকে আপনি যথাযথ মনে করেন কি না?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: ডলারের মূল্যমান বেড়ে যাওয়ায় আমাদের আমদানি করা সব দ্রব্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, যেটা দেশে উৎপাদনকারী পণ্য ও আমদানি করা পণ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে আগের প্রশ্নের উত্তরে বলেছি এবং সেগুলো যথেষ্ট নয়। সেই সঙ্গে প্রয়োজন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্যহ্রাস টেনে ধরা। এর জন্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারে নজরদারি এবং দেশে রেমিট্যান্স ও রপ্তানির অর্থপ্রবাহ বাড়ানো; প্রয়োজনবোধে এফডি আহরণের মাধ্যমে দেশে ডলার আনার প্রচেষ্টা নেওয়া।

এত দিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল কি না? মাথাপিছু আয় বাড়তি দেখানোই এর উদ্দেশ্য কি না?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: ডলারের মূল্য সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকেই কিছুটা সতর্ক থাকা দরকার ছিল। রপ্তানির অর্থ, রেমিট্যান্স ইত্যাদি আহরণে প্রণোদনা দিয়ে কিছুটা অস্থায়ী পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাহিদা, সরবরাহ, মূল্যস্ফীতি এবং আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য–সম্পর্কিত দেশগুলোর মুদ্রামান যাচাই করে এখন সময় এসেছে টাকার যৌক্তিক মান পর্যালোচনা করার। আমার মনে হয় না যে মাথাপিছু আয় বাড়িয়ে দেখানোর জন্য ডলারের মান নিয়ে কিছু করা হয়েছে।

সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে, শিল্পগোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে আঁতাত করে তাদের মালিকানাধীন ব্যাংকগুলো থেকে পরস্পরের ঋণের সুদ মওকুফ করিয়ে নিচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও তাদের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয় সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি সন্তোষজনক নয়। পরিচালক নিয়োগ, তাদের নীতি ও পরামর্শ অনেক সময় নির্মোহ ও তথ্যভিত্তিক হয় না। যে জন্য অনেক সময় ঋণ প্রদান, সুদ মওকুফ—এগুলো যুক্তিসংগত হয় না। ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তাঁর সহকর্মীদের কার্যক্রমে অনেক সময় পরিচালকের ও বাইরের হস্তক্ষেপ থাকে। অনেক শিল্পগোষ্ঠীর মালিক ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে থাকেন, তাঁরা নিজ ব্যাংকের সুবিধা না নিলেও অন্য ব্যাংক থেকে সেটা নিতে পারেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আর্থিক নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা নিয়মগুলো যথাযথভাবে পরিপালন করা হচ্ছে কি না, সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নজরদারি করতে হবে। আরও প্রয়োজন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শক্ত অবস্থান নেওয়া।

মূল্যস্ফীতি, বিনিময়ের হার, প্রবৃদ্ধির হার, সুদের হার—বলা হয়ে থাকে, এর যেকোনো একটিতে সমস্যা হলে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে। বাংলাদেশ কোনটিতে বেশি নাজুক অবস্থায় আছে? উত্তরণের উপায় কী?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: চারটি সূচক নিঃসন্দেহে অর্থনীতির ওপর প্রভাব বিস্তার করে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময়ের হার আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। এগুলোর সমস্যা থেকে উত্তরণের কথা আমি ইতিমধ্যেই বলেছি। ব্যাংকিং খাতের উন্নয়ন, মুদ্রাবাজারের কার্যকারিতা, ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ গ্রহণের যৌক্তিকতা—এগুলো সুদের হারকে যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাবে। সেটাকে নির্দিষ্ট হারে রাখা ঠিক হবে না। প্রবৃদ্ধির হার মোটামুটি সন্তোষজনক, তবে এটাকে ধরে রাখতে হলে উপরিউক্ত আলোচনার বিষয়গুলো গুরুত্ব দিতে হবে। উল্লেখ্য, প্রবৃদ্ধির হার একটি সূচকমাত্র, এটা মানুষের জীবনযাত্রার একমাত্র মান নির্ণায়ক নয়। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামাজিক উন্নয়ন–সমতার সূচকগুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

সরকার আগামী অর্থবছরে ৪ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা মোট রাজস্ব পাওয়া যাবে বলে আশা করছে। আমরা দেখছি, এক দশকেই অর্থ পাচার হয়েছে সোয়া ৪ লাখ কোটি টাকা। বড় বড় প্রকল্পের পেছনে বিপুল ব্যয়ও আছে। ফলে এই রাজস্ব আদায় শেষ পর্যন্ত কতটা ফলপ্রসূ হবে?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: আমাদের বাজেটে সব সময়ই বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রাজস্ব আদায় করা। খরচ করা তো ব্যাপার নয়, খরচের কতগুলো প্রক্রিয়া আছে, সে অনুযায়ী সেটি হতে থাকে। দেখতে হবে আমাদের আয়ের উৎসটাকে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারছি। আমাদের এখানে পরোক্ষ যে কর মানে ভ্যাট, সেটি আদায় করা যায় সহজে। কিন্তু প্রত্যক্ষ যে কর মানে ইনকাম ট্যাক্স বা আয়কর, সেটি ঠিকভাবে আদায় হয় না। আমাদের কর আদায়ের হার ভারত, এমনকি নেপাল থেকেও কম। আমাদের এখানে মানুষ আয়কর ফাঁকি দেয়। বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা যথাযথভাবে কর দেয় না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, অর্থের অপচয়। অর্থ তো পাচার হচ্ছেই, আবার বড় বড় প্রকল্পের পেছনে বাড়তি অর্থ খরচ হয়। পাঁচ বছরের প্রকল্পের মেয়াদ বেড়ে হয়ে যাচ্ছে দশ বছর। সময় বাড়ার কারণে খরচও বাড়ছে। পদ্মা সেতু নির্মাণে খরচ হওয়ার কথা ছিল ১০ হাজার কোটি টাকা, সেটি করা হলো ৩০ হাজার কোটি টাকায়। রূপপুর প্রকল্পের বিষয়টা শেষ পর্যন্ত কি হয় জানি না। ফলে রাজস্ব আদায় করে সেটিকে ফলপ্রসূ করতে গেলে এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতেই হবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। কিন্তু আমরা অর্থ পাচার বন্ধ করতে পারলাম না কেন? এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে দায়িত্ব ছিল, সেটি তারা পালন করতে পেরেছে?

সালেহউদ্দিন আহমেদ: অর্থ পাচার বন্ধ না হওয়ার কারণ আর্থিক খাতে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নজরদারির অভাব। সর্বোপরি অর্থ পাচার সম্পর্কে কিছু তথ্য জানা সত্ত্বেও দ্রুত পদক্ষেপ না নেওয়াও একটি কারণ। দেশের আইন, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাইরের দেশের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ, আইনগত পদক্ষেপ—এগুলো অবশ্য করণীয় বিষয়। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বিএফআইইউ, দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন—সবার সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপে অর্থ পাচার রোধ করা যায় এবং পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যায়। তবে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার চেয়ে পাচার বন্ধ হওয়ার দিকেই বেশি নজর দিতে হবে। এটি তো বেসিক জায়গা। পানামা পেপারসে যাঁদের নাম আসছে, তঁাদের টাকা কীভাবে ফিরিয়ে আনবেন। সেখানে আন্তর্জাতিকভাবে আইনি মোকাবিলার বিষয় আছে। এখন কারা অর্থ পাচার করল, তাদের তালিকা না করে তাদের চিহ্নিত না করলে অর্থ পাচার বন্ধ হবে না।

প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

সালেহউদ্দিন আহমেদ: আপনাদেরও ধন্যবাদ।