বিশেষ সাক্ষাৎকার: তানজীমউদ্দিন খান

রাষ্ট্রপতি বললেন, একটা মানুষের ইগো–অ্যারোগেন্স সবাইকে ডুবিয়েছে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের প্রকাশ্য উপস্থিতির অন্যতম মুখ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। গণ-অভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার গঠনের অনেক ঘটনারই তিনি প্রত্যক্ষদর্শী। এসব নিয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজীব হাসান

প্রথম আলো:

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে আগে শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের ডাকে ‘দ্রোহযাত্রা’ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। দ্রোহযাত্রার প্রস্তুতি পর্বটা কেমন ছিল?

তানজীমউদ্দিন খান: দ্রোহযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ২ আগস্ট। ইতিমধ্যে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অনেকেই অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। আগের দিন ১ আগস্ট তাঁর বাসায় আমাদের একটা অনানুষ্ঠানিক মিটিং হয়। আমরা বুঝতে চাইছিলাম, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমরা আসলে কী করতে পারি?

একটা আলোচনা হচ্ছিল সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে একটা সমাবেশ করা যেতে পারে, সেটাকে অনেক আলোচনার পর ‘দ্রোহের যাত্রা’ নাম দেওয়া হলো। মূলত রাজনীতি ও সমাজ বিশ্লেষণমূলক সংকলন ‘সর্বজনকথা’র সঙ্গে যাঁরা আমরা সম্পৃক্ত, তাঁরাসহ সংস্কৃতিকর্মীরাও ছিলেন। সামিনা লুৎফা, মাহা মির্জা ছিল, মোশাহিদা সুলতানা, কল্লোল মোস্তফা, মাহতাব উদ্দীন আহমেদসহ এ রকম বেশ কয়েকজন ছিলেন।

শেষ পর্যন্ত আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলাম যে আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আসার আমাদের কারও আর কোনো পথ নেই। হয় পরিবর্তন, আর তা না হলে আমরা আরও বেশি বিপদগ্রস্ত হব, জীবন–ঝুঁকিতে পড়ে যাব। এটাই ছিল আমাদের ‘বটম লাইন’।

প্রথম আলো:

আপনারা ৪ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখার কথা বলেছিলেন।

তানজীমউদ্দিন খান: আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল, মানুষের মধ্যে সাহস সঞ্চার করতে হলে কিংবা আন্দোলনের গতিপথ শক্তিশালী করতে হলে, সরকারের পদত্যাগ চাওয়া এবং একই সঙ্গে পদত্যাগ-পরবর্তী সরকারব্যবস্থা কী হবে, সেটার একটা রূপরেখা দেওয়া জরুরি।

এই আলাপটা নিজেদের মধ্যে আগে অত শক্তিশালীভাবে না থাকলেও ১ আগস্ট এসে সামগ্রিক একটা রূপ ধারণ করে। শেষ পর্যন্ত ৪ আগস্ট আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখার ঘোষণাটা দিলাম প্রেস কনফারেন্স করে।

এর প্রেক্ষাপট ছিল আমাদের ১ আগস্টের মিটিং। আমরা অনুধাবন করেছিলাম, শুধু সরকার পতনটাই গুরুত্বপূর্ণ না, পতন-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলানোটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

এই সময়কালে শিক্ষার্থীদের কারও কারও সঙ্গে কি যোগাযোগ বা যুক্ততা ছিল?

তানজীমউদ্দিন খান: এই যোগাযোগটা তৈরি হচ্ছিল জুলাইয়ের ১৫ তারিখ থেকে। মাহফুজ আলম আমার বাসায়ও এসেছিল। সম্ভবত সেটা জুলাইয়ের ১৫ তারিখ দিবাগত রাত, মানে ১৬ তারিখ। তবে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্রদের অনেকের সঙ্গে আমার যোগাযোগটা ছিল।

জুলাই আন্দোলনের শুরুর দিকে যোগাযোগটা হয়েছিল। আমার যত দূর মনে পড়ে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে ওরা একটা সমাবেশ করেছিল ১ জুলাই ২০২৪-এ। সেদিন আমাকে সমাবেশ থেকেই ফোন করেছিল আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। অনুরোধ জানিয়েছিল যেন তাদের সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করার জন্য শিক্ষকদের পক্ষ থেকে সেখানে যাই।

আমি জানিয়েছিলাম, আমরা শিক্ষার্থীদের দাবিদাওয়ার পক্ষে আছি। কিন্তু আমরা সরাসরি তাদের এ সমাবেশে এই মুহূর্তে যেতে চাইছি না। আমরা গেলে অনেকে এ রকম ধারণা করতে পারে যে আমরা ‘উসকানি’ দিচ্ছি!

প্রথম আলো:

আপনার সঙ্গে মাহফুজের যোগাযোগের কথা বলছিলেন…

তানজীমউদ্দিন খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছাত্র ইউনিয়নের আদনান আজিজ চৌধুরীর মাধ্যমে মাহফুজের সঙ্গে যোগাযোগ। ওদের আন্দোলনের ক্ষেত্রে কোনো কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ছিল না, অনেক বেশি ছড়ানো-ছিটানো ছিল। এতে আমার সেই সময় মনে হয়েছে, শিক্ষক নেটওয়ার্কের সাংগঠনিক অভিজ্ঞতাটা ওরা আন্দোলনের ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে।

সম্ভবত আন্দোলনের বছরখানেক আগে একদিন কলাভবন থেকে হাঁটতে হাঁটতে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে দেখা। তখন নাহিদ আমাকে প্রশ্ন করেছিল, স্যার আপনারা এত কিছুর মধ্যে টিকে আছেন কীভাবে? আসলে শিক্ষক নেটওয়ার্কে একেক সময় একেকজন দায়িত্ব নিয়েছে। আমাদের সুনির্দিষ্ট কাউকে ঘিরে সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি।

সম্ভবত জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে আদনান আমাকে ফোন করে বলে যে মাহফুজের সঙ্গে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যোগাযোগ করেছে, এনএসআই, এসবি, ডিজিএফআই। আন্দোলনটা যাতে আর বেশি দূর না যায়, সে জন্য সরকারের তরফ থেকে এ রকম একটা প্রস্তাব মাহফুজের কাছে দেওয়া হয়েছে। সরকার একটা সমাধানে পৌঁছাতে চাইছে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

আপনার সঙ্গে আলাপটা কী ছিল?

তানজীমউদ্দিন খান: আদনানই জানায়, মাহফুজ আমাদের সঙ্গে বসতে চেয়েছে, মানে শিক্ষক নেটওয়ার্কের সঙ্গে। শিক্ষক নেটওয়ার্কের সবাইকে সেই সময় একসঙ্গে পাওয়াও যাচ্ছিল না। ওর আসার কথা ছিল রাত ১২টা-সাড়ে ১২টার দিকে। ওর আসতে আসতে রাত দুইটা থেকে তিনটা। আলোচনাটা ছিল—আন্দোলনটা ওরা চালিয়ে যাবে কি না, নাকি সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসবে? আবার যেভাবে মারধর হচ্ছে, তাতে কোনো সমাধানে গেলে, তারা প্রশ্নবিদ্ধ হবে, টাকা-পয়সার লেনদেনের সন্দেহের মধ্যেও পড়তে পারে। আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে হলে ওদের আসলে কৌশলটা কী হবে?

আমার পক্ষ থেকে আলাপটা ছিল, সরকারের সঙ্গে বসার বিপদ হচ্ছে, সেই সময় সরকারের চরিত্রটা এমন যে একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য না। আমি বলেছিলাম, সরকারের সঙ্গে মিটিংটা অফিশিয়ালি ডকুমেন্টেড না হলে, কোনো গোপন মিটিং হলে সরকার তাদের মতো করে জনপরিসরে ব্যাখ্যা দেবে। প্রাইভেট ভার্সন হবে এক রকম, আবার পাবলিক ভার্সন আরেকটা দেবে। সবকিছু উপস্থাপিত হবে নিজেদের মতো করে। সে ক্ষেত্রে যা কিছু হবে, তা ডকুমেন্টেন্টেড, পাবলিকলি হতে হবে। সম্ভবত সরকার সেটাতে রাজি হবে না এবং রাজি না হলে আন্দোলন নিয়ে নতুন করে ভাবার জন্য স্পেস তৈরি হবে।

প্রথম আলো:

আপনাদের ওপরও কি কোনো চাপ ছিল?

তানজীমউদ্দিন খান: ৪ আগস্ট প্রেস কনফারেন্স শেষে শাহবাগে মিছিল করে বাসায় ফিরে আসার সময়ে কিছু শুভাকাঙ্ক্ষী শিক্ষক জানালেন, আমি যেন বাসায় না থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ জনের তালিকা করা হয়েছে। তালিকায় আমি আছি, গীতিআরা নাসরিন আছেন। আমার সহকর্মী আব্দুল মান্নান আছেন। সামিনা লুৎফা, মোশাহিদা সুলতানা, মারুফ ভাইসহ এ রকম আরও আছেন।

আমাদের উপাচার্য, প্রক্টর, সহকারী প্রক্টর—তারা এই নামগুলো গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়েছে। দুজন সহকারী প্রক্টরের এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা ছিল বলে তাঁরা জানান। এমনও শুনলাম যে আমাদের আগস্টের ৫ কিংবা ৬ তারিখে তুলে নিয়ে যাবে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

৫ আগস্ট সরকার পতনের খবরটা কীভাবে পেলেন?

তানজীমউদ্দিন খান: সকাল ৯টা-৯.৩০টায় আমার এক বন্ধু ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন করে বলল, ‘ডিসাইডেড। চলে যাচ্ছে—শেখ হাসিনা আর থাকছেন না।’ আমি আনন্দে চিৎকার দিলাম, মাকে গিয়ে বললাম।

তারপর সকাল ১০টার দিকে বেরিয়ে শাহবাগের দিকে গেলাম। তখনো এটা পাবলিক হয়নি, আমিও পাবলিক করতে পারছিলাম না। জানি না সত্যিই ঘটেছে কি না, শুধু কথার ওপর তো নির্ভর করা যাচ্ছিল না। শাহবাগে গিয়ে নিজেদের লোকজনের দেখা পেলাম, আস্তে আস্তে সবাইকে বলছিলাম, শেখ হাসিনা পালাচ্ছে, গেম ইজ ওভার। পরে তো সবাই জেনেই গেল।

প্রথম আলো:

উপদেষ্টা পরিষদ গঠন নিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ কারা করল?

তানজীমউদ্দিন খান: ৫ আগস্ট রাত থেকেই যোগাযোগ শুরু হলো। একদিকে আদনান ও বাম সংগঠনগুলোর তরফ থেকে, আরেক দিকে নাহিদের তরফ থেকে; পরিষদ গঠন করলে কতজনের, আমাদের তরফ থেকে কোন নামগুলো যাবে।

যোগাযোগ করেছিল অনিক রায়, রাগীব নাঈম, নাজিফা জান্নাতরা, মাহফুজ পুরোমাত্রায় যুক্ত ছিল, দ্রোহযাত্রার পর থেকে ওদের এই যুক্ততা আরও শক্তিশালী হয়েছিল। নাহিদ, মাহফুজ, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীরাও ছিল। সম্ভবত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং বামদের প্রতিনিধিত্ব করে এমন নামগুলো পাওয়ার লক্ষ্য থেকেই তা করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

আপনাদের তালিকায় কারা ছিলেন? কী বিবেচনায় নামগুলো এল?

তানজীমউদ্দিন খান: আমরা আলোচনা করে সবাই মিলে মোট দশটার কাছাকাছি নাম দিয়েছিলাম: আনু মুহাম্মদ, সলিমুল্লাহ খান, সারা হোসেন, বদিউল আলম মজুমদার, শহিদুল আলম, তাসনিম আরেফা সিদ্দিকী, প্রশান্ত ত্রিপুরা, ডা. বিধান রঞ্জন রায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের গৌতম দেওয়ান, শারমীন মুরশিদ, বিচারপতি আবদুল মতিন, অধ্যাপক সিআর আবরার। আমার আপত্তি এবং অনাগ্রহের পরেও তারা আমার নামটিও যুক্ত করেছিল।

বিবেচনাটা ছিল: এমন মানুষ, যাঁদের মধ্যে আন্দোলনের স্পিরিটটা আছে। এটা ’৯১ বা পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর ধরনে মাপা যাবে না, কারণ আন্দোলনটা কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি।

আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মানুষ, আমার হিসাবটা সহজ ছিল, সরকার পরিবর্তনের পরে যে প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, সেটা মূলত আসবে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে। পশ্চিমা রাষ্ট্রসহ এদের মুখোমুখি হওয়ার বৈশ্বিক চরিত্র বাংলাদেশে কে আছেন? পরের পরিস্থিতি সামলাতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাইতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।...এটা মোকাবিলা করার জন্য উনি (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) ছাড়া বিকল্প নেই, আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা সামলাতে ওনার বিকল্প ওই মুহূর্তে আর কেউ নেই।
প্রথম আলো:

মাহফুজরা ৫ আগস্ট রাতে এসেছিল, কী আলাপ হলো?

তানজীমউদ্দিন খান: মাহফুজ এল রাত ১২টার দিকে, তারপর কয়েক দফায় নাসীর, নাহিদ। শিক্ষক নেটওয়ার্কের তরফ থেকে অধ্যাপক কাজী মারুফও এসেছিলেন। নাসীর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও আমরা সবাই ফ্লোরে বসে রাত সাড়ে ৩টা-৪টা পর্যন্ত, ফজরের আজান পর্যন্ত আলাপ করলাম।

ওরা আমাদের তালিকাটা নিল। ওদের তরফ থেকেও কিছু নাম এসেছিল, যার কিছু আমরা বিরোধিতা করেছি। কিন্তু ওরা যে ওই রাতেই কার্জন হলে বা অন্য কোথাও আলাদা মিটিং করে নিজেদের একটা তালিকা তৈরি করেছে, সেটা আমাদের বলেনি। এমন একটা ভাব ছিল যেন আমাদের সঙ্গে আলাপ করেই তালিকা তৈরি হচ্ছে!

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের নাম কীভাবে এল?

তানজীমউদ্দিন খান: ওই রাতের সাইডলাইন আলাপ হিসেবে এটাও এল, বাংলাদেশে এখন কোন চরিত্র আছেন, যিনি এই জায়গায় যেতে পারেন। দু–একটি নাম এসেছিল, বিতর্ক থাকায় আমরা সরাসরি নাকচ করে দিই। নাহিদ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, প্রফেসর ইউনূসকে যে আমরা আনব, আমাদের পক্ষে যুক্তিটা কী হতে পারে?’

আমি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মানুষ, আমার হিসাবটা সহজ ছিল, সরকার পরিবর্তনের পরে যে প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে, সেটা মূলত আসবে ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে। পশ্চিমা রাষ্ট্রসহ এদের মুখোমুখি হওয়ার বৈশ্বিক চরিত্র বাংলাদেশে কে আছেন? পরের পরিস্থিতি সামলাতে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চাইতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আমি এ-ও জানালাম, আমরাও তাঁকে নিয়ে খুব স্বাচ্ছন্দ্যে নেই, নাহিদও বলল, ‘আমাদের অনেকের মধ্যেও এই স্বাচ্ছন্দ্য নেই।’ কিন্তু আলাপটা দাঁড়াল, এটা মোকাবিলা করার জন্য উনি ছাড়া বিকল্প নেই, আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিলতা সামলাতে ওনার বিকল্প ওই মুহূর্তে আর কেউ নেই। ৬ আগস্ট বঙ্গভবনে মিটিংয়ে ঢোকার আগেও একই আলাপ হয়েছে।

প্রথম আলো:

সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনার জন্য বঙ্গভবনে ছাত্রদের সঙ্গে আপনিও ছিলেন।

তানজীমউদ্দিন খান: ৬ আগস্ট সকাল ১১টা-১২টার দিকে সামিনা লুৎফা ফোন করল, সম্ভবত নাহিদই ওর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, শিক্ষক নেটওয়ার্ক থেকে দুজন প্রতিনিধিকে বঙ্গভবনে যেতে হবে, একজন পুরুষ, একজন নারী।

আমার সিদ্ধান্ত ছিল আমি যাব না। বললাম, ‘আপনি আর গীতিআরা ম্যাডাম যান।’ পরে মানজুর-আল-মতিন যোগাযোগ করল, সাড়ে তিনটার দিকে ফোন এল, ‘স্যার, আমরা একটা সাদা মাইক্রোবাসে আছি, কলাভবন থেকে আপনাদের পিক করে নেব।’ কলাভবনে গিয়ে জানা গেল, শিক্ষকদের একজন, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, অলরেডি আছেন বঙ্গভবনে, ফলে আমাদের দিক থেকে একজনের যাওয়ার সুযোগ।

সামিনা লুৎফা রাজি হলো না। আমি খুব রাগারাগি করছিলাম, শেষে মানজুর-আল-মতিন রীতিমতো চ্যাংদোলা করে ধাক্কা দিয়ে আমাকে মাইক্রোবাসে তুলে দিল। মাইক্রোবাসে ছিল নাহিদ, আখতার হোসেন, নাসীর, মাহফুজ। আসিফ মাহমুদ ও হাসনাত আবদুল্লাহও ছিল।

কার্জন হলে গিয়ে সারজিস আলমের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। ওকে ‘ছাত্রলীগ-ঘেঁষা’ বা ছাত্রলীগের বিতার্কিক হিসেবে জানতাম, কথাবার্তা ছিল না। আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থী রিফাত রশিদকেও পেলাম। ১৫-২০ জন হতে পারে, তাদের মধ্যে নাজিফা, আশরেফাসহ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরাও ছিল। মিনিবাসে বঙ্গভবনে রওনা দিলাম। পৌঁছালাম পৌনে ৫টা-৫টায়, মিটিং ছিল সাড়ে ৫টায়।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন পেলেন?

তানজীমউদ্দিন খান: আমাদের ভেতরের একটা বড় হলরুমে নেওয়া হলো, খেতে দেওয়া হলো। মিটিং শুরু হচ্ছিল না। রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারি এসে জানালেন, তিন বাহিনী প্রধান বেশ জ্যামে পড়েছেন, দেরি হবে। নাহিদ বলল, ‘চলেন স্যার, এই ফাঁকে আমরা একটু হোমওয়ার্ক করে নিই।’ হোমওয়ার্কের বিষয় ছিল কারা সম্ভাব্য উপদেষ্টা হতে পারেন, আর আমরা আলোচনায় বসে কীভাবে দর-কষাকষি করব।

প্রথম আলো:

নেগোসিয়েশনে কারা ঢুকবেন, সেটা কীভাবে ঠিক হলো?

তানজীমউদ্দিন খান: জানা গেল, আলোচনায় ছয়জন থাকতে পারবে—শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে চারজন, আর শিক্ষক তরফ থেকে দুজন। এই বিষয়ে এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে আমার সবিস্তার বর্ণনা আছে। তবু সংক্ষেপে বলি, প্রফেসর ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হবেন—এটা আমাদের দিক থেকে একরকমের সিদ্ধান্ত নেওয়া ছিল। দর-কষাকষিটা কারা করবেন, সেটা নিয়েই কথা হচ্ছিল।

শিক্ষার্থীরা ১৫-২০ মিনিট আলাপ করে জানাল: চারজন যাবে। নাহিদ, নাসীর, আসিফ, মাহফুজ। কৌশলগত কারণে আমি না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। এই সিদ্ধান্তে নাহিদ খুব অবাক হলো। আমি বললাম, শুধু একটা বিষয় নিশ্চিত করো—তোমরা চারজন পারবা তো? ও বলল, ‘স্যার, না পারার কিছু নেই, না পারলে এসে প্রেস কনফারেন্স করে বলে দেব।’ শেষ পর্যন্ত আমরা শিক্ষকদের পক্ষ থেকে কেউ ছিলাম না।

প্রবেশের সময় রাষ্ট্রপতি পেছন থেকে নাহিদের গায়ে হাত রেখে বললেন, ‘ওয়েল ডান বয়েজ, ইউ হ্যাভ অল স্যালভেজড (রক্ষা করা) বাংলাদেশ।’ আর নিজের আসনে বসতে বসতে বললেন, ‘একটা মানুষের ইগো, অ্যারোগেন্স আমাদের সবাইকে ডুবিয়েছে।’
প্রথম আলো:

আলোচনায় শেষ পর্যন্ত কী নির্ধারিত হলো?

তানজীমউদ্দিন খান: শুধু একটাই বিষয়—প্রধান উপদেষ্টা। নাহিদ পরে আভাস দিয়েছিল: সেনাবাহিনীর তরফ থেকে বিকল্প নাম দেওয়া হচ্ছিল। অধ্যাপক ইউনূস ছাড়া অন্য যেকোনো নামে তাঁরা রাজি হবে, কিন্তু অধ্যাপক ইউনূস না। ছাত্ররা সেখানে অনড় ছিল। ও বলল, ‘স্যার, একটা নাম নিয়েই ছয় ঘণ্টা পার—অন্য কোনো উপদেষ্টার নাম নিয়ে আলাপ করার সুযোগই পাইনি।’ অর্থাৎ ৬ আগস্ট বঙ্গভবনের মিটিংয়ে শুধু প্রধান উপদেষ্টাই ঠিক হয়েছে, বাকি উপদেষ্টাদের নিয়ে কোনো আলোচনা বা ঘোষণা সেদিন হয়নি।

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর্বটা কেমন ছিল?

তানজীমউদ্দিন খান: রাত ১২টা পেরিয়ে গেছে, মাহফুজ এসে বলল, ‘স্যার, ডান! প্রধান উপদেষ্টার বিষয়টা হয়ে গেছে।’ তখন আমাদের সবাইকে কনফারেন্স রুমে ডাকা হলো। ১০-১২ মিনিটের এই পর্বটা ছিল আলোচনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করা এবং তাঁর অনুমোদন নেওয়া।

প্রবেশের সময় রাষ্ট্রপতি পেছন থেকে নাহিদের গায়ে হাত রেখে বললেন, ‘ওয়েল ডান বয়েজ, ইউ হ্যাভ অল স্যালভেজড (রক্ষা করা) বাংলাদেশ।’ আর নিজের আসনে বসতে বসতে বললেন, ‘একটা মানুষের ইগো, অ্যারোগেন্স আমাদের সবাইকে ডুবিয়েছে।’

কনফারেন্স টেবিল, মাঝখানে প্রেসিডেন্ট, তাঁর ডান দিকে তিন বাহিনীর প্রধান, বাঁ দিক থেকে আমরা ১৫-২০ জন, সশস্ত্র বাহিনীর আরও ১০-১৫ জন। রাষ্ট্রপতি দু-তিনটা বাক্যে সবাইকে ধন্যবাদ দিলেন, অধ্যাপক ইউনূসকে শুভকামনা জানালেন। আমরা খুব উৎফুল্ল ছিলাম, কিন্তু রাষ্ট্রপতি, তিন বাহিনীর প্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর কারও মধ্যেই সেই উৎফুল্ল ভাব ছিল না—একটা সমাধানে পৌঁছানোর স্বস্তি ছিল, কিন্তু পরিবেশটা ছিল গুমোট। এমন একজন মানুষ প্রধান উপদেষ্টা হলেন, এটা নিয়ে তাঁদের একটা অস্বস্তি, তা বোঝা যাচ্ছিল।

প্রথম আলো:

বাকি উপদেষ্টাদের তালিকাটা তাহলে কীভাবে, কাদের হাতে চূড়ান্ত হলো?

তানজীমউদ্দিন খান: একেক তরফ থেকে একেকটা তালিকা এসেছে। এক. শিক্ষক নেটওয়ার্ক ও বাম নাগরিক ঘরানার আমাদের তালিকা, দুই. নাহিদদের তালিকা, তিন. বিএনপির তালিকা, চার. আর্মির নাম, পাঁচ. কোনো কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদকসহ অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া নাম। পরে ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা এসে নিজের পছন্দের নাম ঢোকাতে চাইলেন। তাঁদের অ্যাকমোডেট করতে গিয়ে শেষ মুহূর্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম কাটা পড়ল, পুরো তালিকা আরও এলোমেলো হলো। এই কম্পাইল করা, বাদ দেওয়া, যুক্ত করার মেকানিজমটা ঠিক কারা, কীভাবে করা হয়েছিল শেষ পর্যন্ত, তা আমার কাছে স্পষ্ট না।

প্রথম আলো:

৫ আগস্ট সেনাসদরে সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে ডাকলেন, আপনারা কেউ আমন্ত্রিত ছিলেন না, অথচ ৬ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ঠিক করতে শুধু আপনারাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন, কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। এটা কীভাবে ব্যাখ্যা করেন?

তানজীমউদ্দিন খান: এটা আমার নিজের কাছেও রহস্যময় লাগে, তবে আমার ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা হচ্ছে, এই জুলাই আন্দোলনের সূচনার মূল চালিকা শক্তি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই ছিল। ‘বৈষম্যবিরোধী’–এর ব্যানারে। ধারাবাহিক মানুষ হত্যা আর পুলিশি নির্যাতনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দলসহ মা-বাবা, ভাই-বোন, শ্রমিক-জনতা সবাই যুক্ত হয়েছে এবং আন্দোলনটি সবার হয়ে উঠেছে।

এ রকম একটা ড্রাইভিং ফোর্সকে বিবেচনায় না নিয়ে তাদের রাস্তায় রাখলে সেই সময়কার পরিস্থিতি সামলানো যাবে না। তাদেরকে রাষ্ট্রপতি নেতৃত্বে থাকা তৎকালীন সরকারের বলয়ে নিয়ে আসা, আর একই সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী ও সেনাপ্রধান, রাষ্ট্রপতিকে একটা বৈধতা দেওয়া, তাঁর পক্ষে জনসমর্থন আদায়-বঙ্গভবনে নিয়ে পুরো প্রক্রিয়া ফর্মালাইজ করা, শপথ পাঠ করার মধ্য দিয়ে, সেটাই হয়েছে। গণ-আন্দোলনটাকে রাস্তায় না রেখে সফলভাবে বঙ্গভবনে নিয়ে যাওয়া হলো, আর তাতে আন্দোলনের বৈশিষ্ট্যটাই একটা ভিন্ন মাত্রায় চলে গেল, গণ-অভ্যুত্থানের চরিত্রটা পাল্টে গেল।

প্রথম আলো:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে কী ভূমিকা রেখেছিল আর শিক্ষকেরা নাগরিক হিসেবে কী ভূমিকা রেখেছিলেন?

তানজীমউদ্দিন খান: আগে সরকারবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষক সমিতির স্বতন্ত্র অবস্থান থাকত, ন্যায্যতার প্রশ্নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সমিতিকে উপেক্ষা করতে পারত না। শিক্ষক সমিতি নাগরিকের ন্যায্যতার প্রশ্নে মুখ্য হয়ে পড়ত। তবে এবার ভিন্ন ছিল—প্রশাসন ও শিক্ষক সমিতি দুটোই সরকারি দলের অনুগত, অন্ধ অনুসারী ও নিয়ন্ত্রণে। এতে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যগত ভূমিকা অনুপস্থিত ছিল। এমনকি আধা সামরিক বাহিনী জুলাইয়ের মিছিল দমনে গুলি ফুরিয়ে গেলে ক্যাম্পাসে এসে অস্ত্র লোড-আনলোড করত; ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক হল বন্ধ ঘোষণার পর থেকে ক্যাম্পাস মূলত তাদের ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আগস্টের ১ তারিখের আগে সাদা দলের শিক্ষকদেরও সেই অর্থে নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রকাশ্যে শক্তিশালী অংশগ্রহণ ছিল না; তাঁদের অনেকেই প্রশাসনের সঙ্গে আপস করেই টিকে ছিলেন, এশিয়াটিক সোসাইটি বা শিক্ষক ক্লাবে পদ ভাগাভাগি করে যৌথ নির্বাচন করেছেন। ১-৫ আগস্টে কারও কারও উপস্থিতি দেখা গেলেও ৫ আগস্ট বিকেল থেকে অনেকের ফটো তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণার প্রবণতাই অনেক বেশি ছিল। শিক্ষক নেটওয়ার্কের সুবিধা ছিল—এটা মতাদর্শগতভাবে বৈচিত্র্যে ভরা একটা ঢিলেঢালা প্ল্যাটফর্ম; সংখ্যায় কম হলেও শিক্ষক নেটওয়ার্ক একটা সাহসের জায়গা তৈরি করেছিল।

গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারির প্রাণের ঝুঁকি নেওয়া বুদ্ধিজীবীদেরই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ইসলামোফোবিক’ তকমায় চরিত্র হনন করা হচ্ছে, বিমানবিকীকরণের মাধ্যমে কখনো হত্যাযোগ্য করে তোলা হচ্ছে।
প্রথম আলো:

অভ্যুত্থানে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ সরব, বড় অংশ নীরব ছিল। দুই বছর পর সেই ভূমিকাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তানজীমউদ্দিন খান: পরিচিত বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশের দলীয় অবস্থান ভয়ংকর মাত্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ‘উন্নয়ন’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দের আড়ালে যে অন্যায়গুলো হয়েছে—যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে অনড়, তাঁর সব অন্যায়ের প্রশ্নেও অনড় থাকার কথা; তাঁরা তা পারেননি। তাঁদের একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ ছিল যে এই সরকারের সমালোচনা করলে বুঝি, মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে দুর্বল করা হয়ে যাবে! একই সঙ্গে তাঁরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে প্রশ্নাতীতভাবে তোষামোদের পুকুরে ডুবিয়ে নিজেরা নিজেদের ব্যক্তিগত ধনসম্পদ আর সুবিধা আদায় করছিলেন।

অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে খুব ছোট কিন্তু কার্যকর এক নতুন বুদ্ধিজীবীদের বিকাশ দেখেছি, যাঁদের বড় অংশ লিবারেল। কিন্তু আগে যেমন ‘মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার’ দিয়ে সমাজকে মেরুকরণ করা হয়েছে, গত দুই বছরে নতুন মেরুকরণ হয়েছে—কে ‘ধর্মপরায়ণ’, কে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ বা কে ভারতের দোসর, কে পাকিস্তানবিরোধী—এ রকম পরিচয়ে।

গণ-অভ্যুত্থানে সামনের সারির প্রাণের ঝুঁকি নেওয়া বুদ্ধিজীবীদেরই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ইসলামোফোবিক’ তকমায় চরিত্র হনন করা হচ্ছে, বিমানবিকীকরণের মাধ্যমে কখনো হত্যাযোগ্য করে তোলা হচ্ছে।

এদের উদ্দেশ্য দীর্ঘমেয়াদি: ভবিষ্যতে নতুন ফ্যাসিবাদ এলে এঁরাই প্রতিবাদ করতে চাইবেন; তাই তাদের উদ্দেশ্য সেই বুদ্ধিজীবীদের আগেভাগেই সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করে, বিমানবিকীকরণ করে তুলে সেই সম্ভাবনাটাকে ধ্বংস করে দেওয়া। ফলে এঁদের প্রতিবাদও সিলেক্টিভ হতে বাধ্য হয়েছে—ধারাবাহিকতা থাকেনি। মাজারে হামলা, বাউলশিল্পী ও ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের ওপর আক্রমণ, নারীর ওপর হামলা ঠেকাতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সচেষ্টতার অভাব বা অনীহা এই ভীতি সমাজে আরও বাড়িয়েছে; ধারণা তৈরি হয়েছে, সরকার বুঝি ওই বিশেষ গোষ্ঠীর।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

অভ্যুত্থানের আগে ইসলামি ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য তৎপরতা ছিল না, পরে প্রকাশ্যে এসে চারটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিতল। শিবিরের অনেকে ছাত্রলীগের পরিচয়েও সক্রিয় ছিলেন। এসব কীভাবে দেখেন?

তানজীমউদ্দিন খান: অভ্যুত্থান কোনো দলের ছিল না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ‘অরাজনৈতিক’ নামটাই সবাইকে টেনেছে—শিবিরকে তখন আলাদা করে চেনাও যায়নি। আবার শিবিরের অনেকেই ছাত্রলীগের পরিচয় বা পদধারী থাকায় আবাসিক হলে আধিপত্য বজায় রেখেছিল; স্বনামে আসার পর তাদের সেই প্রভাব অনেক শক্তিশালীভাবে কাজ করেছে, যেহেতু অন্য শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর আবাসিক হলে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় (১৭ জুলাই ২০২৫ এ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল) নির্বাচনী প্রচারণার কাজটি ওভাবে করতে পারেনি।

নির্বাচনে তারা জিতেছে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায়—ওয়েলফেয়ার কর্মকাণ্ড: পানির ফিল্টার, খাবার, টিউশন। আবার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, বিশেষ করে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদে এখন গ্রামীণ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে থাকা শিক্ষার্থীরাই সংখ্যা অনেক বেড়েছে—শিবির এই পরিবর্তন ধরেছে, পরিবার পর্যন্ত পৌঁছেছে, অর্থবিত্ত, টিউশনি দিয়ে সহযোগিতা করেছে। এক শিক্ষার্থী আমাকে জানিয়েছে, ‘আব্বা বলেছেন সাদিককে ভোট দিতে।’

বিপরীতে ছাত্রদলের ভাবমূর্তির সংকট ছিল, ‘ছাত্রদল-ছাত্রলীগ’ একই, ছাত্রদলের হাতে নারীরা নিরাপদ নয়, এ রকম প্রচার ছিল শক্তিশালী। বামদের ক্ষেত্রে ‘শাহবাগী’, ‘নাস্তিক-উগ্র’ তকমা দেওয়া হয়েছে—সবকিছু মিলিয়ে সুফল গেছে শিবিরের ঘরে। আবার ছাত্রসংগঠনগুলো নিজ নিজ অভিভাবক সংগঠনের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকে আর সেসব দলের পরিকল্পনায় ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুরু থেকে ওভাবে গুরুত্ব পাইনি; এ ক্ষেত্রে জামায়াত ছিল অগ্রণী। সুবিধাও ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভেতরেও, বিশেষ করে প্রক্টর অফিসের অনেকেরই ছিল তাদের প্রতি সুদৃষ্টি, পক্ষপাতিত্ব।

আবার সমাজেরও পরিবর্তন আছে—দুর্নীতির লাগাম টানতে না পারা, রাজনৈতিক সততার শূন্যতা, রাজনৈতিক নেতাদের কথা আর কাজের ফারাকের কারণে মানুষ ‘নতুন কিছু’, নতুন বিকল্প খুঁজেছে। এই সবকিছু জামায়াত-শিবিরের সম্ভাবনা বাড়িয়েছিল।

আর গোপন পরিচয়ের রাজনীতি? ষাট-সত্তরের দশকে কেউ ছদ্মনাম নিয়েছে নিরাপত্তার স্বার্থে, পুলিশের চোখে ধুলা দেওয়ার জন্য; কিন্তু অন্য দলের ব্যানারে অনাচার আর শারীরিক নির্যাতনের অংশ হয়নি। এবার তারা এক মতাদর্শে আস্থা রেখে, আরেক দলের অন্যায়ের সহযাত্রী হয়েছে—নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গেই তারা লুকোচুরি খেলেছে, প্রতারণা করেছে। এই অনৈতিক কূটকৌশলের রাজনীতি দিনের শেষে প্রশ্নবিদ্ধ হয়, জনমনে ভীতি তৈরি করে।

তবু তারা জিতেছে, কারণ অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক আর অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে থাকা শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়া এখন খুবই সময়কেন্দ্রিক, সাময়িক লাভালাভটা তাদের অনেকের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূ্র্ণ। তবে ব্যতিক্রম তো নিশ্চয় রয়েছে।

প্রথম আলো:

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তানজীমউদ্দিন খান: অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য ছিল, আইনশৃঙ্খলায় ছিল না। অনেক ঘটনা সদিচ্ছা থাকলে বন্ধ করা যেত; সদিচ্ছাটাই ছিল না। সবচেয়ে বড় কথা—তাঁদের অনেকেই গণ-অভ্যুত্থানের সামগ্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে অনেক দূরে ছিলেন। কেউ কেউ পদে গিয়ে ক্ষমতাকে দায়িত্ব হিসেবে না দেখে সনাতনি, পুরোনো রাজনীতিবিদদের মতোই উপভোগ করেছেন। অথচ এত মানুষ আত্মাহুতি দিয়ে যে পরিবর্তন চেয়েছিলেন, তার আভাসটুকুও শক্তিশালীভাবে তৈরি হয়নি।

প্রথম আলো:

অভ্যুত্থানের মুখ যে ছাত্রনেতৃত্ব—এনসিপি—তাদের রাজনৈতিক যাত্রা কোথায় দাঁড়াল?

তানজীমউদ্দিন খান: রহস্যময় কারণে তারাও সেই আকাঙ্ক্ষা থেকে সরে গেছে। দল গঠনের প্রক্রিয়ায় সত্যিকারের গণতান্ত্রিক চর্চা ছিল কি না, প্রশ্ন আছে। ওরা আমাদেরই শিক্ষার্থী; অনানুষ্ঠানিক আলাপে মনে হয়েছে, তাদের রাজনীতি অল্প কয়েকজনের কোটারিতে বন্দী হয়ে গেছে। যে অন্তর্ভুক্তিমূলকতা, বৈষম্যহীনতা ও নতুন বন্দোবস্তের কথা দিয়ে শুরু, সেখান থেকে তারা দূরে সরেছে; পুরোনো রাজনীতির ছাঁচেই ঢুকে পড়েছে—নির্বাচনের ধরনসহ—এবং সেই ছাঁচ থেকে বের হওয়ার চেষ্টাও করেনি। নিজেদের রাজনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য যেখানে, সেখানেই গেছে।

প্রথম আলো:

এখন বিএনপি ক্ষমতায়। রাষ্ট্র সংস্কার, জবাবদিহি—এসবের ভবিষ্যৎ কী? গণ-অভ্যুত্থানের অর্জনকে কীভাবে দেখেন?

তানজীমউদ্দিন খান: আশাবাদী তো হতেই চাই; কিন্তু কারণ কম। সংসদেও মানুষের দুর্দশার চেয়ে অপ্রাসঙ্গিক আলাপে অনেক ক্ষেত্রে মনোযোগ বেশি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, আবারও সেই আগের মতোই ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার পরিবর্তে নেতা-তোষণ, সেই টেন্ডার কাহিনি আর পদ-পদবি ‘কেনাবেচা’র সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা বহমান থেকে গেল।

মূল সংকট রাজনৈতিক সততার অভাব সবার মাঝে—নতুন দলগুলোতেও। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথা ও কাজের অমিল কমছে না; বরং বাড়ছে। এই ফারাকটা না কমাতে পারলে সংস্কারের প্রশ্নও আর প্রাসঙ্গিক থাকে না। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ে হয়তোবা পরিবর্তনের চেষ্টা আছে, আন্তরিকতা আছে, প্রচার আছে; কিন্তু প্রশ্ন হলো, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান কি সরকারি বা বিরোধী দলের সবার মস্তিষ্কের ভেতরটায় পরিবর্তন আনতে পেরেছে? বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসি নিয়োগ পর্যন্ত—বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে যেহেতু আমি ছিলাম, প্রসঙ্গটা চলে আসে—কীসের ভিত্তিতে নিয়োগ হচ্ছে, তার সঙ্গে অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক অস্পষ্ট; লবিং, নেটওয়ার্ক, লেনদেনই যেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অর্জন আছে—এই যে এত খোলামেলা কথা বলছি, আগের শাসকগোষ্ঠী নেই, অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রত্যাশিত পরিবর্তন এখনো অনেক দূরে। সাধারণ মানুষের প্রয়োজনে মনোযোগ না দিয়ে আমরা আত্মপরিচয়ের রাজনীতিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা অন্য কোথাও পারস্পরিক বিদ্বেষ আর ঘৃণা বিস্তারে মগ্ন। তাতে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের সংকট আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে।

প্রথম আলো:

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

তানজীমউদ্দিন খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।