নবম ও দশম গ্রেড: বেতন–বৈষম্য কেন কাটবে না

বাংলাদেশের সরকারি চাকরির বেতনকাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন উঠছে। এর মধ্যে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো নবম ও দশম গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান অস্বাভাবিক বেতন ব্যবধান। জাতীয় বেতন স্কেলে নবম গ্রেডকে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা পদ এবং দশম গ্রেডকে দ্বিতীয় শ্রেণির পদ হিসেবে গণ্য করা হলেও বাস্তবতা হলো, এই দুই গ্রেডে নিয়োগ পেতে প্রার্থীদের যে পরিমাণ প্রস্তুতি, প্রতিযোগিতা ও মানসিক শ্রমের মুখোমুখি হতে হয়, তাতে খুব বেশি ফারাক থাকে না।

সরকারি ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগপ্রক্রিয়া লক্ষ করলে দেখা যায়, নবম গ্রেডের একটি পদের জন্য প্রার্থীকে যেভাবে প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক—এই বহুস্তরীয় বাছাইপ্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়, দশম গ্রেডের পদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই ধরনের কঠিন যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া দুজন প্রার্থীর মধ্যে সামান্য নম্বরের ব্যবধানে একজন নবম গ্রেডে আর অন্যজন দশম গ্রেডে নিয়োগ পান। অর্থাৎ দুই গ্রেডের প্রার্থীর মধ্যে যোগ্যতাগত রেখা এতটাই সূক্ষ্ম যে তাকে দুটি ভিন্ন স্তর না বলে একই ধারাবাহিকতার সামান্য এদিক-ওদিক বলাই সংগত।

অথচ বর্তমান বেতনকাঠামোয় নবম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন যেখানে বাইশ হাজার টাকা, সেখানে দশম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন ষোলো হাজার টাকা। প্রায় কাছাকাছি যোগ্যতা ও পরিশ্রম সত্ত্বেও আর্থিক প্রতিদানে মূল বেতনের এই ২৭ শতাংশেরও বেশি (কিংবা প্রায় ৩৭ শতাংশ কম-বেশি) ব্যবধান স্বাভাবিকভাবেই ন্যায্যতার প্রশ্ন তোলে। তুলনা করলে দেখা যায়, দশম ও একাদশ গ্রেডের মধ্যে বেতন ব্যবধান এর চেয়ে অনেক কম, অথচ সেখানে যোগ্যতাগত ব্যবধান আনুপাতিকভাবে বেশি। অর্থাৎ সমস্যাটি নিছক গ্রেডব্যবস্থার স্বাভাবিক স্তরভেদ নয়, বরং কাঠামোগত অসামঞ্জস্যের একটি সুনির্দিষ্ট দৃষ্টান্ত।

কেউ কেউ বলতে পারেন, গ্রেডব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যই স্তরভেদ তৈরি করা, তাই ব্যবধান থাকা স্বাভাবিক। এই যুক্তি আংশিক সত্য—স্তরভেদ প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রশ্ন হওয়া উচিত ব্যবধানের মাত্রা নিয়ে, তার অস্তিত্ব নিয়ে নয়। বাজেট সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গও এখানে আসতে পারে, যা বাস্তব একটি চ্যালেঞ্জ। তবে প্রস্তাবিত সমন্বয় নতুন কোনো বিপুল ব্যয়ের সংযোজন নয়, বরং বিদ্যমান বেতনকাঠামোর একটি যৌক্তিক পুনর্বিন্যাস মাত্র, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য।

এই প্রেক্ষাপটে প্রস্তাব করা যায়, নবম গ্রেডের বেতন বাইশ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রেখে দশম গ্রেডের প্রারম্ভিক বেতন আঠারো থেকে বিশ হাজার টাকায় উন্নীত করা হোক। এতে দুই গ্রেডের মধ্যে ব্যবধান চল্লিশ শতাংশ থেকে নেমে দশ থেকে আঠারো শতাংশের মধ্যে দাঁড়াবে, যা প্রার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা ও প্রচেষ্টার সঙ্গে অনেক বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই সমন্বয়ের সুফলও কম নয়। বর্তমানে বহু মেধাবী প্রার্থী কম বেতনের আশঙ্কায় দশম গ্রেডের চাকরি এড়িয়ে বছরের পর বছর কেবল নবম গ্রেডের প্রস্তুতিতে অটল থাকেন। এতে একদিকে তাঁদের কর্মজীবন বিলম্বিত হয়, অন্যদিকে প্রশাসনে অভিজ্ঞ ও যোগ্য জনবলের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়—একই মেধাবী গোষ্ঠী বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আবর্তে ঘুরপাক খায়, যা জাতীয় মানবসম্পদের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। বেতন ব্যবধান কমলে এই প্রবণতা হ্রাস পাবে। পাশাপাশি ন্যায্য পারিশ্রমিকের উপলব্ধি কর্মীর মনোবল ও উৎপাদনশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত—প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিষয়ক গবেষণায় এটি বারবার প্রতিষ্ঠিত সত্য। বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী নিত্যপণ্যের বাজারে তুলনামূলক কম বেতনভুক্ত দশম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জীবনযাত্রার মান বজায় রাখাও ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নবম ও দশম গ্রেডের এই বেতন ব্যবধান নিছক একটি আর্থিক ইস্যু নয়—এটি ন্যায্যতা, কর্মপ্রেরণা ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি বিষয়। সরকারের উচিত অবিলম্বে পে কমিশনের মাধ্যমে এই নির্দিষ্ট অসামঞ্জস্য পর্যালোচনা করে একটি বাস্তবসম্মত ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যাতে প্রতিটি কর্মচারীর পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হয়।

হাসান

চাকরিপ্রত্যাশী