ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অন্তর্ভুক্ত এ নগরী আটটি মেট্রোপলিটন থানা নিয়ে গঠিত। পুরান ঢাকা মূলত ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকা হিসেবে বেশ পরিচিত। আসলে পরিচিত নয়, বরং ব্যবসাকেন্দ্রিক এলাকাই এটি। বাঙালি নাগরিক সংস্কৃতির মধ্যে পুরান ঢাকার সংস্কৃতি আলাদা একটি জায়গা করে নেয়। তবে আধুনিকতা ও নিজস্ব সংস্কৃতিবিমুখতা সেখানে ছেদ ফেলেছে। মূলত, নগরায়ণে অব্যবস্থাপনার প্রভাবে পাল্টে গেছে পুরান ঢাকা, এর জীবনযাপন ও সংস্কৃতি।

অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, যানজট, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ—সবকিছু যেন আঁকড়ে ধরে বসে আছে পুরান ঢাকাকে। লাখো মানুষের আনাগোনার এ অঞ্চলের বড় একটি সমস্যা হলো যানজট। আর বর্তমানে এ সমস্যার যেন কোনো সমাধান নেই। এখানে মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য নেই কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা। পুরো যাতায়াতব্যবস্থাই যেন এখানে অপরিকল্পিত। নিয়ন্ত্রণহীন পরিবহনব্যবস্থাও এর জন্য দায়ী।

পুরান ঢাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে। পুরান ঢাকার এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থীর আনাগোনা। এ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একটু বাইরে নজর দিলেই দেখা মেলে অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার বাস্তব উদাহরণ।
ক্যাম্পাসের বাইরে সারা দিনই যানজট আর যানবাহনের বেপরোয়া চালনা। রাস্তার জায়গা দখল করে দাঁড়ানো একের পর এক বাস। এ যেন কোনো বাসস্ট্যান্ড। ছোট ছোট জায়গা নিয়ে নিজস্ব বাস কাউন্টার। এতে শিক্ষার্থীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। প্রশাসন কিংবা কর্তৃপক্ষের কোনো নজরদারি নেই। রাস্তায় চলাচলের দুর্ঘটনা যেন এখানে নিতান্তই স্বাভাবিক।

সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনে এক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এক যাত্রীর। এমন দুর্ঘটনা নতুন নয়। এতে শিক্ষার্থীরা সব সময় শঙ্কিত থাকেন। যানবাহনচালকদের অসতর্কতা, অসচেতনতা কিংবা অনিয়ন্ত্রিত গতি ও বেপরোয়া গাড়ি চালানো এ দুর্ঘটনার মূল কারণ। এ তো কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবস্থা।
এমনকি পুরান ঢাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা বাহাদুরশাহ পার্ক বা ভিক্টোরিয়া পার্কেরও নেই কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ। গোটা পার্ক যেন খাবারের দোকানের দখলে। ছিন্নমূল মানুষ ও টোকাইতে ভর্তি থাকে পার্কগুলো। এ কারণে পার্ককে ঘিরে মাদকের কারবার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড দেখা যায়। প্রশাসন এখানেও নীরব দর্শক।

পুরান ঢাকাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা ঐতিহাসিক স্থাপনা। রূপলাল হাউস, লালকুঠি, আহসান মঞ্জিল, জিনজিরা প্রাসাদসহ নানা রকম স্থাপনা রয়েছে এ অঞ্চলে। কিন্তু এসব স্থাপনা ঘিরে দেখা যায় অযত্ন, অবহেলা ও অব্যবস্থাপনা। কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে এগুলোর মর্যাদা, হয়ে উঠছে ধ্বংসপ্রায়।
দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা এই পুরান ঢাকা কেবল অবহেলায় হারিয়ে ফেলছে তার সর্বস্বতা। সমৃদ্ধ সংস্কৃতির চাদরে আগলে থাকা এই পুরান ঢাকা হারিয়ে ফেলছে নিজস্বতা।

পুরান ঢাকার পুরোনো ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনা উচিত। এর জন্য প্রয়োজন এক পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা। নিজেদের ঐতিহ্যগুলো এভাবে হারিয়ে ফেলতে ফেলতে একসময় আমরা হয়ে উঠব সংস্কৃতিবিমুখ। আর এটি আমাদের জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই সবকিছু হারিয়ে যাওয়ার গোড়াতেই টেনে ধরতে হবে লাগাম। আর এর জন্য প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের আন্তরিক মনোযোগ দাবি করি।

সাফা আক্তার নোলক
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়