ষোলো বছরের এক রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়ের অবসানের পর বাংলাদেশ আজ দাঁড়িয়ে আছে নীরবতা ও উত্তেজনার এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে। ২০২৪ সালের রাজপথ যখন রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, তখন স্লোগানগুলো কেবল কোনো ব্যক্তির পতনের দাবি ছিল না। সেগুলো ছিল একটি জরাজীর্ণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের আহ্বান। এখন ২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রহর ঘনিয়ে আসছে।
সেই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, আমরা কি শুধু শাসক বদলাতে চেয়েছিলাম, নাকি শাসনতন্ত্রের আত্মাটাকেই নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছি। ১৮ কোটি মানুষের এই জনপদে ভোটের হাওয়ায় তাই কেবল উত্তেজনা নেই, আছে গভীর আত্মজিজ্ঞাসাও।
দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে এবারের ব্যালট পেপার কেবল পছন্দের প্রার্থীকে জেতানোর উপায় নয়, এটি নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণ দেওয়ার সুযোগ। মাঠের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো যখন ক্ষমতার সমীকরণ কষছে, তখন সাধারণ মানুষের হিসাবটা ভিন্ন। মানুষ এখন আর শুধু ‘উন্নয়ন’ শব্দে তৃপ্ত হতে চায় না। তারা চায় মর্যাদার রাজনীতি। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী কিংবা উদীয়মান নতুন রাজনৈতিক শক্তি সবার জন্যই এবারের নির্বাচন কঠিন পরীক্ষা। কারণ, এবারের ভোটাররা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নয়, বরং জবাবদিহির স্পষ্ট নিশ্চয়তা চাইছে। বিশেষ করে সেই তরুণ প্রজন্ম, যারা জুলাইয়ের তপ্ত দুপুরে বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই হবে আগামী নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
নির্বাচনের সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটের প্রস্তাব এবারের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এটি মূলত একটি জাতির নতুন করে জেগে ওঠার পরীক্ষা। মানুষ কি আবার পুরোনো তিক্ততার রাজনীতিতে ফিরে যাবে, নাকি সহনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এক নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তুলবে। দ্রব্যমূল্যের চাপ আর প্রশাসনিক সংস্কারের ধীরগতিতে জনমনে যখন বিরক্তি বাড়ছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। শূন্যতা পূরণের লড়াই যেন আবার কোনো নতুন স্বৈরতন্ত্রের জন্ম না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বমঞ্চ আজ বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টি ঢাকার অলিগলিতেও। তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, আমরা নিজের আয়নায় নিজেদের কীভাবে দেখতে চাই। নির্বাচন এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা হতে পারে, কিন্তু সেই দিনের রায়ই নির্ধারণ করে দেবে আগামী কয়েক দশকের গতিপথ। ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে গণতন্ত্র এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি বেঁচে থাকার অক্সিজেন। আগামী ফেব্রুয়ারির সূর্যোদয় কেবল নতুন সরকারের বার্তা নিয়ে আসুক, তা নয়। সেই সূর্যোদয় যেন নিয়ে আসে এক নতুন ভোরের নিশ্চয়তা, যেখানে রাষ্ট্র হবে মানুষের, আর ক্ষমতা হবে সেবার।
শাম্মী শফিক জুঁই শিক্ষার্থী: ইডেন মহিলা কলেজ, ঢাকা