অনিয়মের সংস্কৃতি থেকেই বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ড

৪ এপ্রিল রাজধানীর বঙ্গবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক হাজার দোকান পুড়ে গেছে। হাজারো ব্যবসায়ী নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।

বঙ্গবাজারে আগুনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। ১৯৯৫ সালে এবারের মতোই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছিল। তারপর আবার নতুন করে গড়ে তোলা হয় বাজারটি। তবে বাজার তৈরির সময় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়নি। এ কারণে ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই আবার আগুন লাগে এবং গুলিস্তানের পাশের বহু দোকান পুড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে দেখলাম, ফায়ার সার্ভিস বলেছে, ২০১৯ সালে বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা নোটিশ দিয়েছিল; কিন্তু মার্কেট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। ফলে এবারের ভয়াবহতা দেখতে হলো। হাজারো পরিবার পথে বসে গেল। এই পরিবারগুলোর শুধু এবারের ঈদ নয়, সামনের কতগুলো ঈদে যে তাদের মুখে হাসি থাকবে না, এটা বলা মুশকিল।

প্রতিবার কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর বিভিন্ন মাধ্যম থেকে খবর বের হয়, ভবন ঝুঁকিপূর্ণ ছিল কিংবা হাজারো সমস্যা ছিল। জনমনে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে যে তাহলে আগেই কেন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়নি। আগে যদি ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো এই দুর্ঘটনা ঘটত না। কয়েক দিন আগে মাওয়া এক্সপ্রেস ওয়েতে বাস দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত হন। পরবর্তী সময়ে জানা যায়, বাসটি ফিটনেসবিহীন ছিল। এমন হাজারো ফিটনেসবিহীন বাস চলছে, কিন্তু এটা জানা যায় কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটার পর।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনা-সংক্রান্ত কার্যক্রমের ২০২২ ও ২০২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সারা দেশে এই দুই বছরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আগের ১৪ মাস ১০ দিনে সারা দেশে অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছে ১৪৫ জন। ২০২২ সালে সারা দেশে ২৪ হাজার ১০২টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় ৩৪২ কোটি টাকার বেশি সম্পদ পুড়েছে। এর আগের বছর ২১ হাজার ৬০১টি অগ্নিকাণ্ডে ২১৮ কোটি টাকার সম্পদ পুড়ে যায়। আর ২০২০ সালে সারা দেশে ২১ হাজার ৭৩টি আগুনের ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি টাকা।

সব থেকে বড় বিষয় হচ্ছে, একটা অপরাধ সংঘটিত হলে তার যদি সুষ্ঠু বিচার হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে অপরাধীরা বা অন্য কেউ সেই কাজ করার সাহস পান না। ১১ বছর আগের ঢাকার নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। একটা জিডি করা হয়েছিল, যার তদন্ত প্রতিবেদন আজও পর্যন্ত আদালতে দাখিল হয়নি বলে সংবাদমাধ্যমে জেনেছি। ২০১২ সালের আশুলিয়ায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১১২ জনের মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় মামলা হলেও এখনো বিচারকাজ শেষ হয়নি। এরপর ২০১৯ সালের চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পাঁচ বছর আগের তথ্যমতে, ঢাকা শহরের ভবনের সংখ্যা ২২ লাখ। এখন আরও বেশি। সে সময় অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ছিল ৩২১, এখন যা ৫০০ ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু সেই অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সিলগালা করে বন্ধ করে দেওয়া হয়নি। সেখানে মানুষ এখনো বসবাস করছে, কারখানা চলছে। ফলে কিছুদিন পরপর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। এখনো যদি সরকার এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে আবার বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটে যেতে পারে।

অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রচলিত আইনের ব্যবহার করতে হবে। আবাসিক ভবনে গুদাম বা কারখানা করা যাবে না। ভবনে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ ঘটাতে হবে। নীতিমালা মেনে ভবন নির্মাণ হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ, সামান্য অবহেলা হাজারো মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

  • সুকান্ত দাস
    শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া