অর্থনৈতিক বৈষম্যের শীর্ষে মুয়াজ্জিন

বর্তমান সমাজে অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার মানুষের তালিকায় প্রথম সারিতেই রাখা যায় দেশের গ্রাম ও শহরের অধিকাংশ মসজিদের মুয়াজ্জিনদের। সময়নিষ্ঠ, সহজ-সরল ও মিতব্যয়ী জীবনযাপন তাঁদের দৈনন্দিন বাস্তবতা। নিয়মিত আজান দেওয়া থেকে শুরু করে মসজিদের প্রায় সব ধরনের কাজই তাঁদের করতে হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মসজিদের সভাপতি বা সম্পাদকদের নির্দেশ মেনেও কাজ করতে হয়।

মসজিদে দায়িত্ব পালনের সুবাদে অনেক মুয়াজ্জিন মসজিদে থাকা ও খাওয়ার সুবিধা পেলেও তাঁদের পরিবারের ভরণপোষণের কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। দেশে এমন লক্ষাধিক মুয়াজ্জিন আছেন, যাঁদের মাসিক বেতন মাত্র দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। এই সামান্য আয়ে একটি পরিবারের ন্যূনতম চাহিদা মেটানো যে প্রায় অসম্ভব, তা বলাই বাহুল্য।

গ্রামগঞ্জে এখনো একটি প্রচলিত ধারণা আছে—মুয়াজ্জিনদের খাওয়াদাওয়া সব ‘ফ্রি’। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দু-তিন হাজার টাকায় একজন মানুষ কীভাবে স্বামী হিসেবে, পিতা হিসেবে কিংবা সন্তান ও বৃদ্ধ মা–বাবার প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন? আমরা বাংলা সাহিত্যের ‘লালসালু’ উপন্যাসের মজিদের চরিত্র নিয়ে আলোচনা করি, অথচ আমাদের পাশের মসজিদের সময়নিষ্ঠ, নিষ্ঠাবান ও নির্লোভ মুয়াজ্জিনের জীবনসংগ্রাম আমাদের ভাবনায় নাড়া দেয় না।

একজন মুয়াজ্জিন এই সামান্য পারিশ্রমিকেই সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যান, ভবিষ্যতে যেন সে দেশের কল্যাণে কাজ করতে পারে—এই আশায়। তাঁরা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সম্মানের সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় তাঁদের দায়িত্ব পালন করে যান।

এখন প্রশ্ন হলো—এ সমস্যার সমাধান কীভাবে করা যায়?

প্রথমত, স্থানীয় সমাজ ও মসজিদ কমিটিকে নিয়মিত মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হবে। তাঁদের বেতন দিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে কি না, কোনো ঋণের বোঝা আছে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজ নিয়ে মসজিদ কমিটির সভার মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। অনেক মসজিদে দেখা যায়, মুয়াজ্জিনকে নিজে এসে বেতন চাইতে হয়—এটি চরম অমানবিক ও অবমাননাকর। আমরা যেমন ব্যাংক বা নির্ধারিত ব্যবস্থায় বেতন পাই, তেমনি মুয়াজ্জিনদেরও নির্দিষ্ট তারিখে ব্যাংক বা গ্রহণযোগ্য অন্য মাধ্যমে নিয়মিত বেতন পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয়ভাবে মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি কার্যকর বেতন বা ভাতাকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কিছু সহায়তা ও প্রশিক্ষণ থাকলেও তা গ্রাম পর্যায়ের মুয়াজ্জিনদের কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না। প্রান্তিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা যেমন সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন পান, তেমনি মুয়াজ্জিনদের জন্যও একই ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে তাঁদের ন্যূনতম অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং চাকরি হারানোর ভয় নিয়ে তাঁদের কাজ করতে হবে না। প্রয়োজনে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্তত দুই মাস আগে নোটিশ দেওয়ার বিধান থাকা উচিত।

মসজিদ কমিটির প্রতি বিনীত অনুরোধ—শুধু মুয়াজ্জিন নয়, তাঁদের পরিবারের সামগ্রিক অবস্থাও বিবেচনায় নিন। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয়ভাবে মুয়াজ্জিনদের জন্য মাসিক ভাতা, তাঁদের সন্তানদের জন্য বিনা মূল্যে শিক্ষা, পরিবার-পরিজনের জন্য চিকিৎসাসেবা এবং সম্মানসূচক রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা জরুরি। বাংলার লাখো মুয়াজ্জিনের বাস্তব অবস্থা আজও উপেক্ষিত।

যুবসমাজের জন্য মুয়াজ্জিনরা হতে পারেন এক অনন্য আদর্শ। একজন শিক্ষার্থীর জীবনে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়, আর মুয়াজ্জিন সেই সময়ের জীবন্ত প্রতীক—যিনি আজীবন সময়নিষ্ঠ থাকার শিক্ষা দিয়ে যান। যুবসমাজের উচিত তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের খোঁজ নেওয়া, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং যেন কোনোভাবেই তাঁরা সামাজিক হেনস্তার শিকার না হন, সে বিষয়ে সচেতন থাকা।

জি এম মারুফ, শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়