ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ভূতের সঙ্গে বসবাস

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: সংগৃহীত

আজ থেকে প্রায় বছরখানেক আগে দেশের প্রথম সারির একটা চ্যানেলে একটা প্রতিবেদন দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘ছাত্র সেজে মাদ্রাসায় জিনের বসবাস।’ বিষয়টা নিয়ে অনেক চিন্তা করছিলাম আসলে এটা কীভাবে সম্ভব, জিন যাঁদের সঙ্গে ছিল তাঁদের অনুভূতি কী ইত্যাদি। তবে কিছুদিন ধরে একটা বিষয় লক্ষ করে দেখলাম, জিনের সঙ্গে না হলেও আমি নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে বছরের পর বছর ভূতের সঙ্গে বসবাস করে আসছি।

কথাটা কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য না-ও হতে পারে, তবে কথাটি সত্য। কিছু উদাহরণ দিলে বিষয়টা আপনার কাছে হয়তো পরিষ্কার হবে। আমাদের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছোট রুম আছে প্রায় ৬০টি, যেগুলো সিঙ্গেল রুম নামে পরিচিত। আর বড় রুম আছে ১১০টির মতো। যেহেতু ছোট রুমগুলোয় ২ জন করে থাকেন, তাহলে এখানে মোট ১২০ ছাত্র থাকতে পারবেন। আবার বড় রুমগুলোয় আমরা আটজন করে থাকি। তাহলে এখানে মোট ৮৮০ জন ছাত্র থাকতে পারবেন। স্বাভাবিকভাবেই হলে এক হাজার ছাত্র রুমে থাকার কথা। যেহেতু ২০২০-২১ সেশন থেকে সিট বরাদ্দ দেওয়া বন্ধ আছে, হলে অবস্থান করা বৈধ ছাত্র সংখ্যা ৭০০–এর বেশি হওয়ার কোনো কারণ দেখছি না। তার মানে, রুমে যত সিট আছে, তার চেয়ে ছাত্র সংখ্যা কম। তারপরও ২০০–এর মতো ছাত্র বারান্দা বা গণরুমে অবস্থান করেন।

এখন প্রশ্ন হলো, বাকি সিটগুলো গেল কোথায়! না, বাকি সিটগুলো কোথাও যায়নি, সিটগুলো হলেই আছে, তবে ওগুলো ভূতের দখলে। আপনি বলতে পারেন ভূতের থাকার জন্য আবার রুম লাগে নাকি! অবশ্যই ভূতেরও থাকার জন্য জায়গা লাগে। শুধু জায়গা হলে চলে না, সবচেয়ে ভালো জায়গা তাদের লাগে। তার ওপর ভূত স্বাভাবিকভাবে একটা ভীতিকর জিনিস এবং মোটামুটি সবাই ভূতকে ভয় পায়, যে কারণে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলা দূরের কথা, কেউ চোখ তুলেও তাকায় না। কারণ, জীবনের মায়া সবারই আছে, হোক তিনি ছাত্র অথবা শিক্ষক। মাঝেমধ্যে প্রশাসন হলে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে। কিন্তু রুমগুলোর কাছে আসতেই তারা দৃষ্টি বা শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে। যে কারণে তারা রুমগুলোর আশপাশে এলে যত দ্রুত সম্ভব স্থান ত্যাগ করে।

এবার দেখুন আপনি হয়তো ছোটবেলায় শুনেছেন যখন মানুষকে ভূতে ধরে, তখন তারা শুনতে পায় না বা তারা কথা বললে তাদের কথা কেউ শুনতে পায় না। তাহলে রুমগুলো যদি ভূতের দখলে না হতো তাহলে প্রশাসন অবশ্যই দেখতে পারত বা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারত।

আরেকটা মজার বিষয় হলো ভূতের মানুষের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি খাবার লাগে। আবার অনেকেই ভাবতে পারেন ভূতের আবার খাওয়াদাওয়া বা কাপড়চোপড় লাগে নাকি। না, আপনার ধারণা সঠিক নয় বরং ভূতের স্বাভাবিক মানুষের চেয়ে বেশি কাপড়চোপড় বা খাওয়াদাওয়া করা লাগে। আপনি ভাবছেন কীভাবে? হলের যখন বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান চলে অথবা অন্য কোনো অনুষ্ঠান চলে তখন নিশ্চয়ই প্রত্যেক ছাত্রের জন্য একটা বাজেট থাকে। যদি নিদিষ্ট করে বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠানের কথা বলি, এখানে প্রত্যেক ছাত্রের জন্য সকালের নাশতা, টি–শার্ট এবং দুপুরের খাবারের জন্য বাজেট থাকে।

কিন্তু মজার বিষয় হলো সকালের নাশতাটা পুরোটাই ভূতে খেয়ে ফেলে আবার যখন টি–শার্ট দেয় তখন দেখা যায় টি–শার্ট সংকট। যদিও হলের অর্ধেক ছাত্র এসব প্রতিযোগিতায় যান না। তারপর দুপুর বেলা লক্করঝক্কর করে একবেলা খাবার দেয় কিন্তু প্রতিবার তাতেও সংকট দেখা যায়। তাহলে আমার বাজেটের খাবার ও টি–শার্ট এগুলো গেল কোথায়?  এই যে বললাম, আমাদের আশপাশে থাকা ভূত। তাদের দখল করা ভৌতিক রুমগুলোয় গেলে দেখবেন ১০ থেকে ১৫টা করে খাবার। খুবই উল্লাস করে খাচ্ছে। আবার অনেক সময় খাবার তৈরি হওয়ার আগেই তারা খেয়ে ফেলে।

এবার একটু ডাইনিং–ক্যান্টিনের কথা বলি। একই বাজার থেকে বাজার করার পর কেজিপ্রতি গরুর মাংসের টুকরা হয় ৪০–৪২টি। অথচ কেজিপ্রতি খুঁজে পাওয়া যায় ২০ টুকরার মতো। তাহলে অর্ধেক মাংস গেল কোথায়। না, কোথাও যায়নি। ওই অর্ধেক মাংস বাজারের মধ্যেই ভূতে খেয়ে ফেলেছে। কারণ, ভূতেরও একটা জীবন আছে। আপনারা হয়তো এখন ভাবতে পারেন ভূতের জীবন কেমনে থাকে। আমরা এমনও শুনে থাকি মারা যাওয়ার পর মানুষ ভূত হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এসব চিন্তাভাবনা বদলে যায়। দেখবেন, অনেকে মরার আগেই ভূত হয়ে যায়।

এটা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ক্ষেত্রে নয়, আপনি যদি যেকোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন, আশপাশে খেয়াল করলে আপনিও প্রচুর ভূত দেখতে পাবেন।

এসব জীবিত ভূতগুলো খুবই ভয়ংকর। সাধারণ ছাত্ররা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা দূরের কথা তাদের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও ভয় করেন। এমনকি একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক হতাশার সুরে বলছিলেন, আল্লাহ ছাড়া এসব ভূত কেউ তাড়াতে পারবে না। যদি বলেন, ভূতের সঙ্গে থাকার অনুভূতি কেমন। প্রথম প্রথম তো ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি একজন মানুষ। মানুষ হিসেবে কিছু মৌলিক অধিকার আছে। তবে এখন দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে এখন একটু চিন্তা–চেতনাশক্তি ফিরে এসেছে। ফলে এখন ভূতের সঙ্গে থাকতে অসুবিধা হয় না, অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

রাজিমুল হক রাকিব

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়