কাপাসিয়া হোক পর্যটনকেন্দ্র

কাপাসিয়া পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য তৈরি হবে কর্মসংস্থান, যা বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।

দেশের প্রাচীন এক জনপদ কাপাসিয়া, যেখানে এক সময় কার্পাসের ব্যাপক চাষাবাদ ছিল। মসলিন উৎপাদন ও বিক্রির জন্য ছিল একটি বৃহৎ বাণিজ্যকেন্দ্র। বাণিজ্যব্যবস্থা গ্রিক-পাশ্চাত্যের দেশগুলোয় ক্রমাগত সম্প্রসারিত হয়েছিল।

নৌপথে সুদূর আরবের সঙ্গে কাপাসিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। কার্পাস ও রেশমি বস্ত্র প্রাচীন বাংলার অর্থনীতিকে করেছিল শক্তিশালী। কাপাসিয়ার ভূমি ও আবহাওয়া তুলা উৎপন্ন হওয়ার বেশ উপযোগী ছিল। পর্যাপ্ত পরিমাণে কার্পাস তুলা উৎপন্ন হওয়ায় এই অঞ্চলের নামই হয়েছে কাপাসিয়া।

১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবেদার ইসলাম খান মুর্শিদাবাদের রাজমহল থেকে বাংলার রাজধানী স্থানান্তরের উদ্দেশ্যে কাপাসিয়ার আসেন। স্থানটি উঁচু-নিচু বলে তিনি রাজধানী স্থাপন না করে চলে গিয়ে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। কাপাসিয়া অঞ্চল সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বিশিষ্ট স্থানের অধিকারী ছিল। কাপাসিয়া বাংলাদেশের প্রাচীন এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এলাকা, যার রয়েছে সুদীর্ঘ প্রাচীন ইতিহাস।

কাপাসিয়া অঞ্চল ঐতিহাসিককালে কখনো সমৃদ্ধ জনপদ, কখনো গভীর অরণ্য, কখনো নদীগর্ভে বিলীন, আবার কখনো নতুন নতুন ভূমির ফলে সৃষ্টি হয়েছে। ভূখণ্ডগুলোর অন্তর্ভুক্ত কাপাসিয়ার সমগ্র অঞ্চল।

রাজধানী থেকে মাত্র ৬৫ কিলোমিটার উত্তরে এক অবহেলিত জনপদ ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা গাজীপুরের এই কাপাসিয়া। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাপাসিয়ার নাম। মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভূমি এই কাপাসিয়া। আবদুল বাতেন খানের (বীর প্রতীক) কথাও বলতে হয়, তিনি বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।

কাপাশিয়ার আরও সন্তান রাজনীতিতে ভূমিকা রেখেছেন। যেমন হান্নান শাহ—বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। তানজিম আহমেদ বা সোহেল তাজ ছিলেন বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী। এম এ কাদের সরকার ছিলেন সাবেক সচিব। ফকির আবদুল মান্নান শাহ রাজনীতিবিদ, এমএলএ ও পাকিস্তানের মন্ত্রী ছিলেন। যিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৬৫-৬৯ সালে পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফকির শাহাবুদ্দীন, রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী, ১৯৭২ সালে গঠিত খসড়া সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন এবং বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। সংবিধানের বিধি মোতাবেক, ১৯৭৩ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন।

শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এ উপজেলায় আজও কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। স্বাধীনতার পর এখান থেকে চারজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হলেও কাপাসিয়া আজও পৌরসভার মর্যাদা পায়নি। এলাকার অনেকেই অভিযোগের সুরে বলেন, একসময় কাপাসিয়ার অন্তর্ভুক্ত থাকা শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালিগঞ্জ বহু আগেই পৌরসভার মর্যাদা পেলেও শুধু বাদ পড়েছে এ জনপদ।

কাপাসিয়ার উল্লেখযোগ্য স্থান সুলতানপুর শাহি মসজিদ, দলোহাদীর লোহার খনি, ধাঁধারচর, শীতলক্ষ্যা নদী, ব্রহ্মপুত্র নদ, কয়েকটি বড় দিঘি প্রভৃতি। কাপাসিয়ার অতীত ইতিহাস সম্বন্ধে গবেষণা করার এখনো প্রচুর বিষয়বস্তু রয়েছে।

কাপাসিয়া পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে হলে স্থানীয় যুবকদের জন্য তৈরি হবে কর্মসংস্থান, যা বেকারত্ব সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।

কাপাসিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং নদীতীরবর্তী ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা করা প্রয়োজন। অঞ্চলটির লোকদের সম্পৃক্ত করে সরকারি উদ্যোগে অঞ্চলের মধ্যে থাকা অবৈধ দখলমুক্ত এবং অবৈধ দখল নিয়ন্ত্রণ করে অঞ্চলটির রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারলে এটি একটি স্বীকৃত গ্রামীণ প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। আর এ জন্য প্রয়োজন সরকারি উদ্যোগ এবং কাপাসিয়ার মানুষের সচেতনতা। বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

তৌফিক সুলতান
কাপাসিয়া, গাজীপুর