ওভারটাইমের ফাঁদ ও লোভ থেকে মুক্তি পাক শ্রমিকেরা

অনেক বাসচালক অতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য হন
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। দিনটিকে আমরা মে দিবস বলেও জানি। আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলন ও শ্রম অধিকার আদায়ের দিনটি বছরের পর বছর ধরে বিশ্বব্যাপী যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে। শ্রমিকদের সম্মানে মে দিবস বা ১ মে জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে পালন করে বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশ। কিন্তু যাঁদের নিয়ে এই দিবস, তাঁরা এ সম্পর্কে কতটা অবগত? অনেক শ্রমিক জানেনই না এর ইতিহাস।

উনিশ শতাব্দীর আগে কারখানার শ্রমিকদের দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হতো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়ে বেশি। কিন্তু কাজ অনুপাতে পারিশ্রমিক ছিল খুবই কম, যা তাঁদের জীবনধারণে জন্য যথাযথ ছিল না। একপর্যায়ে শ্রমিকপক্ষ ক্ষুব্ধ হতে থাকে, যা একসময় আন্দোলনে রূপ নেয়। ১৮৮৪ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে একদল শ্রমিক মালিকপক্ষকে দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মসময় নির্ধারণের দাবি জানায়। সেই দাবি পূরণ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিতে হয় বেশ কয়েকজন শ্রমিককে। পুলিশের ওপর হামলার দায়ে পরবর্তী সময়ে নির্দোষ কয়েকজন শ্রমিকনেতা ও শ্রমিককে ফাঁসি ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। সেই আন্দোলনকে স্মরণ করে এর কয়েক বছর পর ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালন করা শুরু হয়।

শ্রমিকদের অধিকার ও দাবির প্রতি সম্মান দেখিয়ে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মে দিবস পালিত হয়। স্বাধীনতার পর মে দিবস রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মে দিবসকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এর পর থেকে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয় মে দিবস। এই দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য থাকে শ্রমিকদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা। যাতে তাঁরা মে দিবসের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্ক জানতে পারেন এবং নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। কিন্তু যে উদ্দেশে আমরা মে দিবস পালন করি, সে উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রশ্ন থাকাটাও বেশ স্বাভাবিক।

মে দিবসের সকালবেলার চিত্র। সব সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ। তবু কিছু মানুষকে দেখা যায় রুটি-রুজির সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছেন কাজে। কারণ, একবেলা কাজ না করলে তাঁর পরিবারকে কাটাতে হবে অনাহারে। কারও কারও আবার মেলেনি ছুটি। ছুটির দিনে কাজের জন্য জুটবে না বাড়তি অর্থ। ৮ ঘণ্টা কাজের কথা থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম চোখে পড়ার মতো। কাজ করতে হচ্ছে ৮ ঘণ্টার অধিক। দেওয়া হচ্ছে না ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সময়ের টাকা।

মে দিবস পালন তো এই মানুষগুলোর কাছে একপ্রকার বিলাসিতা। আমরা দেখি, বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কর্মরত। প্রতিটি তৈরি পোশাক কারখানায় ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ হয় প্রতিদিন। ৬৫ শতাংশের বেশি কারখানায় হয় রাত্রিকালীন কাজ (রাত ১২ ঘটিকা পর্যন্ত)। তারপরও শ্রমিকদের যদি বলা হয়, আপনি ওভারটাইম করেন? অকপটে তিনি বলবেন, হঠাৎ বা জরুরি শিপমেন্ট থাকলে ওভারটাইম করতে হয়, অন্যথায় নয়। মিথ্যা না বললে হয়তো চাকরি হারাতে হবে। বাধ্য হয়ে তাঁকে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। কারও হয়তো মাসের অর্থনৈতিক চাহিদাও পূরণ হবে না। এ কারণে ওভারটাইম কাজ করতে শ্রমিকেরা আগ্রহী থাকেন।

শুধু পোশাকশিল্প নয়, আরও অনেক খাতে এমন পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাই। সম্প্রতি একজন বাসচালকের একটি সাক্ষাৎকার দেখলাম। তিনি দিনে ১৬-১৮ ঘণ্টা বাস চালান। মালিকপক্ষ এমন সিস্টেম তৈরি করে রেখেছে, সেখানে এত বেশি ঘণ্টা তিনি গাড়ি চালাতে বাধ্য। চালকেরাও বাড়তি আয়ের লোভে পড়ে এভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।

মে দিবস পালনই মুখ্য উদ্দেশ্য নয়, মুখ্য উদ্দেশ্য হোক শ্রমিকদের অধিকার আদায়, শ্রমিকের নিরাপত্তা। ৮ ঘণ্টার অধিক কাজ নয়। এর বেশি কাজ করলে ওভারটাইম বা অতিরিক্ত সময়ের মজুরি দিতে হবে। ওভারটাইমের একটি নির্দিষ্ট সময় থাকা প্রয়োজন, যাতে একজন শ্রমিক তাঁর শরীরের সহনীয় পর্যায় পর্যন্ত কাজ করতে পারেন। বাংলাদেশে অসংখ্য শ্রমিকসংগঠন রয়েছে। যাদের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করতে পারে। শ্রমিকদের সব দাবি মালিকপক্ষ বা সরকারের কাছে তুলে ধরতে পারে। তাতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের দূরত্ব অনেকখানি লাঘব হবে। শ্রম আইনগুলো কঠোরতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। সেই সঙ্গে তৈরি করতে হবে শ্রমিকবান্ধব আইন, যা শ্রমিকদের স্বার্থে কথা বলবে। এতে গড়ে উঠবে একটি বৈষম্যহীন শ্রমিক সংঘ এবং এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি।

মোহাম্মদ নাদের হোসেন ভূঁইয়া

শিক্ষার্থী, দ্বিতীয় বর্ষ, ব্যবস্থাপনা বিভাগ

ফেনী সরকারি কলেজ

ই–মেইল: [email protected]