প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রোদে শুকানো বা আগুনে পোড়ানো ইট ব্যবহার হয়ে আসছে। সহজলভ্যতা ও অল্প খরচের জন্য এর জনপ্রিয়তা এবং ব্যবহার সর্বাধিক। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক জনগণের প্রয়োজনীয় বাসস্থানের জন্য নষ্ট হচ্ছে শত শত হেক্টর কৃষি জমি, উজাড় করা হচ্ছে বন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে প্রতিদিন গড়ে ২২৫ হেক্টর ভূমি এবং বছরে ৮২০০০ হেক্টর ভূমি নষ্ট হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে আবাসন তৈরি ও ইটভাটার জন্য মাটি সংগ্রহ করা। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে এই বিশাল বহুতল ভবন নির্মাণে কংক্রিট, অ্যালুমিনিয়াম সিট, প্লাস্টিক, কাচ ফাইবার, স্টিল এবং ধাতব বস্তুর ব্যাপক ব্যবহার হলেও বাংলাদেশসহ বহু স্বল্পোন্নত দেশে প্রধানত ব্যবহার হচ্ছে ইট।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট ইটভাটার সংখ্যা সাড়ে ৮ হাজারেরও বেশি। অধিকাংশ ইটভাটাই মানছে না কোনো নিয়ম, প্রতিনিয়তই নষ্ট করে যাচ্ছে পরিবেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান: মাটি, বায়ু, কাঠ এবং ওজন স্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণা বলছে, ১৯৯০ সাল থেকে প্রতি বছর ৪২ হাজার হেক্টর হিসাবে গত ২০ বছরে অন্তত ৮ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর বনভূমি হারিয়েছে দেশ। অতিরিক্ত কয়লা পোড়ানোর ফলে নির্গত হচ্ছে ধূলিকণা, পার্টিকুলেট কার্বন, কার্বন মনোক্সাইড, সালফারের এবং নাইট্রোজেনের অক্সাইডসমূহ যা চোখ, ফুসফুস ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
দেশে গ্রিনহাউজ গ্যাস উৎপাদনের সর্ববৃহৎ উৎস হলো ইটভাটা। ইটভাটায় প্রতিবছর কয়লার ব্যবহার ৪.৭৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন; কাঠের ব্যবহার ১.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন; মাটির ব্যবহার ২৮৪০ মিলিয়ন সিএফটি; কার্বন নিঃসরণ ১১.৫৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। যার ফলাফল বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছ। নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউ’র সহযোগিতায় পরিবেশ অধিদপ্তরের গবেষণায় উঠে আসে শুষ্ক মৌসুমে ঢাকার বায়ু দূষণের জন্য ইটভাটা দায়ী ৫৮ ভাগ। বায়ুতে ক্ষতিকারক উপাদান পিএম২.৫ (পার্টিকুলেট ম্যাটার ২.৫) এর অন্যতম উৎস ইটভাটা।
ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড ইভাল্যুয়েট এবং হেলথ ইফেক্ট ইনস্টিটিউট বোস্টনের গবেষণা অনুযায়ী পিএম২.৫ হচ্ছে ক্ষতিকর বস্তুকণা যার ব্যাস ২.৫ মাইক্রোমিটারের নিচে। এই ক্ষতিকর বস্তুকণা খুব সহজেই আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে চলে যায় যেটি অনেক মৃত্যুর জন্য দায়ী। গবেষকদের ধারণা মতে এই ক্ষতিকর বস্তুকণা ঢাকার ১ লাখের বেশি লোকের মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
দ্য স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার রিপোর্টের গবেষণা অনুযায়ী ১৯৯০ সালে ঢাকায় পিএম২.৫ এর মাত্রা ছিল ৬৫ কিন্তু ২০১৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী সেটি ১০১ এ পৌঁছেছে যা গ্রহণযোগ্য মাত্রার প্রায় দ্বিগুণ। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের তথ্য অনুযায়ী কার্বন ডাই-অক্সাইড কণা এবং কার্বন মনক্সাইড কণা শ্বসনতন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করে এবং এটি ফুসফুস ক্যানসার তৈরির জন্য দায়ী। এ ছাড়াও কার্বন ডাই-অক্সাইড অক্সিজেন গ্রহণে বাধাগ্রস্ত করে এবং কার্বন মনোক্সাইডকে নীরব ঘাতক বলা হয়। সালফারের অক্সাইড সমূহ চোখ ফুসফুসের এবং গলার সমস্যা সৃষ্টি করে। জমির ওপরের স্তরের মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহার করছে। এতে পুষ্টি উপাদান সমৃদ্ধ মাটি ইট তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাধারণত মাটির পৃষ্ঠ থেকে গভীরে পুষ্টি উপাদান ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। আর ৪/৫ ফুট গভীরতায় পুষ্টির পরিমাণ খুবই অল্প। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমি যেভাবে তার উৎপাদনশীলতা হারাচ্ছে সে হিসাবে মাটি পুড়িয়ে ইট বানানো বন্ধ না করলে ২০৪০ সালে দেশের প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ খাদ্যঘাটতিতে পড়বে। সালফার ও নাইট্রোজেনের অক্সাইড সমূহ অ্যাসিড বৃষ্টির জন্য দায়ী এতে ফসলের হানি ও নদীর মাছ মরে যাচ্ছে। এ ছাড়াও ইটভাটার কারণে আশপাশের এলাকায় পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।
পোড়ামাটির অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে বিকল্প নির্মাণসামগ্রী প্রয়োজন যা হবে সার্বিকভাবে কৃষিবান্ধব, পরিবেশবান্ধব, ভূমিকম্পসহ অন্যান্য দুর্যোগ সহনীয়, টেকসই, সর্বোপরি ব্যয়সাশ্রয়ী। এর সহজ সমাধান হিসেবে কংক্রিট ব্লক ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকরী হবে।
সিমেন্ট, বালু ও প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ৪ মিলি পাথরের কণা বা ডাস্ট সমন্বয়ে এই ব্লক তৈরি করা হয়। ম্যানুয়েল, মেকানিক্যাল বা হাইড্রোলিক মেশিন ব্যবহার করে এ ব্লক তৈরি করা যায়। মেশিনগুলো বৈদ্যুতিক হওয়ায় বায়ুদূষণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখে না। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজাইনমাফিক বিভিন্ন মান ও দামের ব্লক তৈরি করা যায়।
কংক্রিট ব্লক হলো, সলিড, ইন্টারলকিং বা থার্মাল যেকোনো ধরনের হতে পারে। হলো ব্লকের ওজন কম, ইটের তুলনায় মজবুত ফলে অধিকতর ভূমিকম্প সহনীয়। তাছাড়া প্রচলিত ইটের সমতুল্য কংক্রিট ব্লক মূল্যসাশ্রয়ী (২৫% কম) হওয়ার কারণে অধিকতর তাপ কুপরিবাহী। ফলে গরম ও শীতে ঘর আরামদায়ক ও বিদ্যুৎসাশ্রয়ী হয়। কার্বন নিঃসরণ প্রচলিত ইটের প্রায় শতকরা ২০ ভাগ। বাড়ির নির্মাণকাজে ইটের বিকল্প ব্যবহারে অধিক মাত্রায় বায়ু দূষণ কমে যাবে। পাশাপাশি কৃষি জমির ক্ষতির পরিমাণ কমবে এবং দেশের মোট উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হবে না।
মো. মাহির দাইয়ান
পরিবেশকর্মী, ঢাকা