নির্বিচার গাছ কাটায় পাখিসহ বিভিন্ন উদ্ভিদনির্ভর প্রাণীর আশ্রয়স্থল ধ্বংস হচ্ছে, পরিবেশে কার্বন ডাই–অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে, যা আগামী দিনে আমাদের জন্য হুমকিস্বরূপ। ব্যাপক হারে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের কারণে কলকারখানা ও গৃহস্থালির বর্জ্য যথাস্থানে না ফেলা, অধিক হারে যানবাহন ব্যবহার, খাদ্যের চাহিদা মেটাতে কৃষিজমিতে অধিক পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার, নদী ভরাট ইত্যাদি কর্মকাণ্ড প্রাকৃতিক পরিবেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাপক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অসংখ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৮ (ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন করিবেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবে।’ সুতরাং অধিক হারে বৃক্ষরোপণ, শিল্পায়নের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ রোধে সচেতন হওয়া ইত্যাদি সোচ্চারমূলক কার্যক্রমই পারে প্রকৃতি সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে। প্রকৃতি সংরক্ষণের ফলে সমৃদ্ধ হবে দেশ, সমৃদ্ধ হবে জাতি।

প্রকৃতি হলো সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে ও মানুষের লাগামহীন দূষণমূলক কর্মের ফলে প্রতিনিয়তই ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতি। যে পরিবেশ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে নিজের সবটুকু দিয়ে লালনপালন করছে এ সমাজের মানুষকে, অন্যদিকে নির্মম মানুষই নির্বিচার ধ্বংস করছে প্রকৃতি। যার কারণে প্রকৃতি দিন দিন ভয়ানক রূপ ধারণ করছে। বাতাসে ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবেশ দূষিত হচ্ছে লাগামহীনভাবে, এ কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে পৃথিবীর আবহাওয়া। শুধু তা-ই নয়, পরিবেশদূষণের কারণে জলজ প্রাণীদের জলে থাকতে কষ্ট হয়, কারণ তারা পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন পায় না। উদ্ভিদ সতেজ থাকতে পারছে না।

বনজঙ্গল অবাধে উজাড় হচ্ছে, এ কারণে বাসস্থানসংকটে পড়ছে বন্য প্রাণীগুলো। পরিবেশের বিপর্যয়ের প্রভাবে অনেক বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, দাবানল, সুনামি, বন্যা, খরা প্রভৃতির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হার বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বেড়েই চলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। আর সে কারণে তলিয়ে যাচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চলগুলো। এ বিষয়ে ২০০৭ সালের জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত প্যানেলে বলা হয়েছিল, ২০৫০ সালের মধ্যে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা এক মিটার পর্যন্ত বাড়বে। এ কারণে মালদ্বীপ নামক দেশটি পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে। এমনকি বাংলাদেশের উপকূলের ১৭ শতাংশ ভূমি চলে যাবে সমুদ্রে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে বাড়ছে লবণাক্ততা, বাড়ছে বন্যা। মাটির গভীরে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির সংকট। ঋতুবৈচিত্র্যের ওপর পরিবেশ বিপর্যয়ের ফলে মারাত্মক প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কালে। পরিশেষে বলতে চাই, পরিবেশের সংরক্ষণের ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করার জন্য বছরব্যাপী বিভিন্ন দিনে ও নামে দিবস পালন করা হয়ে থাকে। স্মরণ রাখতে হবে, শুধু দিবস পালনের মাধ্যমে যেন দায়িত্ববোধ শেষ না হয়ে যায়। দিবস পালনের সঙ্গে সঙ্গে সরকারি-বেসরকারিভাবে ব্যাপক গবেষণা ও অনুসন্ধান চালাতে হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ অমূল্য বৃক্ষ ছাড়া কল্পনা করা অবান্তর। আবার গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে গাছ নির্বাচন একটি বিষয়। যেমন আমাদের দেশে অর্থনৈতিক লাভের জন্য প্রচুর পরিমাণে ইউক্যালিপটাসগাছ লাগানো হয়। কিন্তু ইউক্যালিপটাসগাছ প্রকৃতির জন্য এতটা ক্ষতিকর যে পানির স্তর নিচে নামিয়ে দেয় এবং এর দহনও বায়ুকে দূষিত করে; সে সম্বন্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকেরই অজানা। সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করতে হবে এবং প্রত্যেক মানুষ যেন এই একটি দিনে হলেও মেহগনি, অশ্বত্থ, বট, নিমজাতীয় বহুবর্ষজীবী ও পরিবেশের উপকারী গাছ লাগায়। হোক সেটা পৈতৃক জমি বা সরকারি জমিতে, তাহলে আমার ধারণামতে এটা একটা মাইলফলক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারবে।

প্রকৃতি সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল সরকার বা কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো সংস্থানের নয়; এ দায়িত্ব প্রত্যেক ব্যক্তির বা প্রত্যেক নাগরিকের। কেননা, প্রকৃতি আমাদের আশ্রয়দাতা, আমাদের অক্সিজেনের উৎস। তাই সময় থাকতেই আসুন সবাই নিজে সচেতন হই, অপরকে সচেতন করি, প্রকৃতিকে রক্ষা করি। বিশ্ব প্রকৃতি সংরক্ষণ দিবসে এটাই হোক সবার প্রত্যয়।

ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রতিষ্ঠাতা, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, সবুজ আন্দোলন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ

চিঠি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন