কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে ফেসবুকের একটি পোস্ট

ফেসবুকে কোনো পোস্ট বা স্ট্যাটাসের জের ধরে হত্যা, ধর্ষণ, ভাঙচুর, মারামারি, গ্রেপ্তার, বিভিন্ন পদ কিংবা শিক্ষার্থীদের বহিষ্কারের ঘটনা অহরহ। পত্রিকা খুললেই প্রায়ই এমন সংবাদ চোখে পড়ে। সত্য-মিথ্যা যাচাই না করেই স্ট্যাটাসের কারণে এসব ঘটনা ঘটছে। করোনাকালে গুজবের প্রবণতা আরও বেড়েছে। এর কারণ হিসেবে প্রযুক্তির উৎকর্ষ, ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা ও প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে সব ঘটনা, ভাইরাল ইস্যু নিয়ে স্ট্যাটাস না দিলে বন্ধুমহলে সম্মান থাকবে না, আধুনিক যুগে এসে বন্ধুরা ব্যাকডেটেট ভাবতে পারে। বর্তমান প্রজন্মের এমন কিছু প্রবণতাও এর পেছনে দায়ী।

সস্তা জনপ্রিয়তা লাভের জন্য অনেকে ভুল তথ্য ছড়ায়। তথ্য শেয়ার করার আগে যাচাই করার সদিচ্ছা প্রায় শূন্যের কোটায়। গুটিকয়েক ব্যক্তি তথ্য যাচাই করলেও অধিকাংশই করে না। অনলাইন অ্যাকটিভিস্টরা মনে করেন, ফেসবুকে গুজবের মূল কনটেন্ট ১ শতাংশ। বাকি ৯৯ শতাংশ ছড়ানো বা ভাইরাল করা হয়। ভোলা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রংপুর, রামুসহ দেশের বেশ কিছু জায়গায় ফেসবুকে গুজব ছড়িয়েই কিন্তু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে।

দেশে ছেলেধরার গুজবও এই ফেসবুকের মাধ্যমেই ছড়িয়েছিল। পদ্মা সেতুতে শিশুর রক্ত আর মাথা লাগার ওই গুজব শুধু ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মানুষের মুখে মুখেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ছেলেধরা সন্দেহে অনেককেই জীবন দিতে হয় গণপিটুনিতে। ঢাকায় এক মা ও তাঁর সন্তানকে স্কুলে ভর্তির খোঁজখবর নিতে গিয়ে গণপিটুনির শিকার হয়ে জীবন হারান। ভুল তথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি ফেসবুকে ধর্মীয় উগ্রতা, সাইবার বুলিং, ট্রলিং, ব্লাকমেলিংসহ নানা অপরাধ ক্রমেই বাড়ছে। আবার এটাও সত্য, ফেসবুকে যেমন গুজব ছড়ায়, আবার সেই গুজবের বিরুদ্ধেও কথা হয়।

পৃথিবীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে ফেসবুক। পোল্যান্ডভিত্তিক প্রতিষ্ঠান নেপোলিয়নক্যাটের তথ্যমতে, সারা বিশ্বে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২৫০ কোটি ছাড়িয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারী দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৮২ লাখ ৩০ হাজার। এই সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ। ব্যবহারকারীর মধ্যে ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ নারী এবং পুরুষ ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ। ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১৮ থেকে ২৪ বয়সীরাই সবচেয়ে বেশি। তাঁদের সংখ্যা ২ কোটি ১২ লাখ। বর্তমানে মুচি থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত সবাই ফেসবুক ব্যবহার করছেন (পেশাকে ছোট করার উদ্দেশ্যে নয়, উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করেছি)।

প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি অভিশাপও। বিজ্ঞানী নিউটনের গতির তৃতীয় সূত্রমতে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। ফেসবুকে তারই ফল দেখা যাচ্ছে। অনেকটা ফুটবলকে দেয়ালে ছুড়ে মারার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। যত জোরে ছুড়বেন, ততটাই ফেরত পাবেন। আপনার একটি স্ট্যাটাসে বা একটি ভিডিও শেয়ারে দেশ ও জাতির বড় কোনো উপকারে আসবে না। কিন্তু আপনার ও আপনার আশপাশের মানুষের জীবন বিষিয়ে তুলতে পারে। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে অনেকের ক্যারিয়ারও। অনেকে হারাতে পারে জীবনও কিংবা পঙ্গুত্বের বোঝা বইতে হতে পারে সারা জীবন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সতর্কতা খুবই জরুরি। আগে ভাবুন, সত্যতা যাচাই করুন, তারপর তথ্য শেয়ার করুন।

আজাহার ইসলাম
শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া