মহান মুক্তিযুদ্ধের ৪৩ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা নিয়ে ভাবছে। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল ও জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) এত দিন যাবৎ বিভিন্ন চিঠিপত্র, পরিপত্র ও গঠনতন্ত্র মারফত মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞা বিষয়ে নানা ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। যাঁরা সক্রিয় সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা—মোটামুটি এমন একটি ধারণা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
আসলে মুক্তিযুদ্ধ একটা বিশাল ব্যাপার। এখানে নানাজন নানা ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন, একাত্তরে এ দেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়, আর ২ শতাংশ বিপক্ষে।
এই ২ শতাংশ মানুষ রাজাকার, আলবদর, আল-শামস ও তথাকথিত শান্তি কমিটি গঠন করে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীকে সার্বিক সহযোগিতা করেছিল। আর বিশাল জনগোষ্ঠী বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে। কেউ আশ্রয় দিয়েছে, কেউ খাবার দিয়েছে, কেউ পথ দেখিয়েছে, কেউ শত্রুবাহিনীর সংবাদ সংগ্রহ করেছে, কেউ অস্ত্র পরিবহনে সাহায্য করেছে।
আবার কেউবা মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করেছে, কেউবা যুদ্ধের গান গেয়ে সাহস জুগিয়েছে। এ রকম নানাভাবে তারা সংশ্লিষ্ট ছিল। এক অর্থে তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের অংশীদার সংগঠক ও সাহায্যকারী। কিন্তু তাই বলে কি শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষকে মুক্তিযোদ্ধা বলা যাবে?
মুক্তিযুদ্ধের পর ভারত ও বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুসারে, মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল দেড় লক্ষাধিক। বিভিন্ন সরকারের আমলে ক্রমেই এ সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বোধগম্য নয়।
মুক্তিযোদ্ধার প্রসঙ্গটি এ রকম: প্রথমে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নাম তালিকাভুক্ত করার পর কমপক্ষে এক মাস মৌলিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। এরপর ঊর্ধ্বতন ক্যাম্পে অস্ত্রসহ গেরিলা প্রশিক্ষণ প্রায় এক মাস। অতঃপর কোম্পানি, প্লাটুন, সেকশন ইত্যাদি গঠন ও অস্ত্র বরাদ্দ। প্রত্যেকের বডি নম্বর বিতরণ। এরপর সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ। এভাবেই একাত্তরে প্রকৃত অর্থে মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছাড়া কি মুক্তিযোদ্ধা হওয়া যায়? এত দিন পরে সংজ্ঞা খোঁজার প্রয়োজন আছে কি?
মনোরঞ্জন রায়
উলিপুর, কুড়িগ্রাম।