রাড্ডার পর বিএনপির আসল পরীক্ষা

বিএনপির লোগো

গত সপ্তাহে ঢাকায় এক অদৃষ্টপূর্ব ঘটনা ঘটে। মধ্যরাতে প্রায় হঠাৎই মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে ২০০-২৫০ লোক হামলা চালায়। প্রায় ৫০ বছর ধরে সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বে দরিদ্র নারী ও শিশুদের বিনা মূল্যে সেবা দিয়ে আসা এই কেন্দ্র লুটপাটের পর ভারী যন্ত্র দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।

১ অক্টোবর প্রথম আলোর প্রকাশিত খবরে জানা যায়, আগের রাতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। সেদিনই তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। একই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি, মহানগর উত্তর যুবদল ও মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। বহিষ্কার করা হয় ১৪ নেতা-কর্মীকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন দলের নেতার বিরুদ্ধে এমন দ্রুত ও প্রকাশ্য পদক্ষেপ বিরল। যাঁরা এ দেশের ক্ষমতার ইতিহাস জানেন, তাঁরা বলতে পারবেন অভিযোগ ওঠার পর সাধারণত কী ঘটে। প্রথমে অস্বীকার, তারপর নীরবতা আর শেষে সবকিছু ধামাচাপা। মাঝে থাকে কিছু অকার্যকর ‘৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি’, ‘সাময়িক বহিষ্কার’ ইত্যাদি। কিন্তু এবার তা হয়নি।

আরও পড়ুন

দেশের রাজনীতিতে খুব সম্ভবত বড় একটা পরিবর্তন আমরা ঘটে যেতে দেখলাম। সত্যিই একজন সংসদ সদস্য পদত্যাগ করলেন; এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে বড় কোনো আন্দোলন বা পদত্যাগের দাবি ছাড়াই দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে তিনি তা করতে বাধ্য হলেন। তৃণমূলে বার্তাটা তাই শুধু একজন সংসদ সদস্যের জন্য আর রইল না। ঢাকার গলি থেকে উপজেলার ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের নেতা-কর্মীর জন্য এটি একটি সতর্কসংকেত হয়ে গেল। ধরাকে সরা জ্ঞান করলে খবর আছে।

তবে এ সিদ্ধান্তের পাশে একটা প্রশ্নও উঠেছে। বিএনপিকে নিয়ে এখন সবার পরামর্শের শেষ নেই। কেউ টক শোতে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কেউ কলামে বলছেন, দল কোথায় ভুল করছে আর কী করলে শুধরে যেত। গণতান্ত্রিক পরিবেশ শ্রদ্ধার, পরামর্শও একধরনের শুভকামনা জানানো। কিন্তু এর মাঝে ক্ষমতার অংশ হওয়ার ঘ্রাণ মিশে আছে কী?

নতুন ক্ষমতায় আসা যেকোনো দলের জন্যই শুভানুধ্যায়ীর ভিড় এক বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। তাঁদের অনেকেই ধরে নেন, সমাধান তাঁদের হাতেই আছে, দল তাঁদের কথা কেন যেন শুনছে না। অথচ বাস্তবতা হলো মাঠের সংকট কীভাবে কাটাতে হয়, তা মাঠে থাকা মানুষই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। চেয়ারে বসে খাতা–কলমে ছক কেটে আদতে মাঠের হিসাব মেলানো যায় না।

রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে লুটপাট করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পর সাইনবোর্ড টানানো হয়েছিল। মিরপুর, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফাইল ছবি: প্রথম আলো

গত নির্বাচনের মনোনয়ন পর্বে বিষয়টা স্পষ্ট হয়েছিল। ভাইরাল হওয়া অনেক মুখ বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। নাগরিক সমাজের একটি অংশও ক্ষমতার অংশীদার হতে চেয়েছিল। বিএনপি ঘরানার সংগীতশিল্পী ও অভিনেতাদের কেউ কেউ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু দল তাঁদের কাউকেই শেষমেশ টিকিট দেয়নি। ফলাফল রাজনীতি থেকেছে রাজনীতিবিদদের হাতে, কোনো হাইব্রিড নেতার হাতে তা তুলে দেওয়া হয়নি।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ও নাগরিক সমাজের কয়েকজনের নাম আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু দল বেছে নিয়েছে তার নিজের সংগঠনের সবচেয়ে পরীক্ষিত, অভিজ্ঞ ও নির্ভরযোগ্য রাজনীতিবিদকে। এই বাছাইকে সংকীর্ণতা বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু এর পেছনে একটা যুক্তি আছে, যা আমাদের মনোযোগ দাবি করে।

রাজনীতিবিদ অসত্য বললে মানুষ তা ধরে ফেলে। শক্তিশালী গণতন্ত্রে তাঁর প্রতিশ্রুতি আর কাজের ফারাক ভোটের হিসাবে ফিরে আসে। জনগণের হাতে সংশোধনের একটা নিয়মিত উপায় আছে, তা হলো ভোট। নাগরিক সমাজের ক্ষেত্রে হিসাবটা আলাদা। তাঁদের কথার পেছনে থাকে নৈতিক কর্তৃত্ব, বিশেষজ্ঞের ভাষা আর নিরপেক্ষতার দাবি। এই ভ্রম কাটাতে মানুষের সময় লাগে। বুঝে উঠতে উঠতে ক্ষতিটা অনেক সময় অপূরণীয় হয়ে যায়।

রাড্ডার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ একটা সুযোগ তৈরি করেছে। এই কঠোরতা যদি কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয়, তবে কয়েক মাসের মধ্যে তা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। আর যদি এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয়, তবে ইতিহাস একে মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত বলে মনে রাখবে।

আন্তোনিও গ্রামসি এ জায়গাটাই ধরেছিলেন। তাঁর বিশ্লেষণে আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবল দমনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ‘আধিপত্য’ বা হেজিমনি গড়ে ওঠে সম্মতির মাধ্যমে, আর সেই সম্মতি তৈরি হয় নাগরিক সমাজের নানা প্রতিষ্ঠানে, যেমন গণমাধ্যম, শিক্ষা ও বুদ্ধিজীবী মহলে।

গ্রামসি এগুলোকে রাষ্ট্রের চারপাশের পরিখা বলেছিলেন। ফুকো আরেক দিক থেকে দেখালেন, তিনি বললেন, কোন কথা সত্য বলে গণ্য হবে, তা ঠিক করে দেয় ‘সত্যের শাসন’। যিনি এই শাসনের ভাষায় কথা বলেন, তাঁকে প্রশ্ন করা কঠিন। এর মানে নাগরিক সমাজ অপ্রয়োজনীয়, তা নয়। তার কাজ পাহারা দেওয়া, প্রশ্ন তোলা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির মুখে রাখা। কিন্তু সেই কাজ আর ক্ষমতার আসনে বসে শাসন করার কাজ এক নয়। যাঁকে ভোটের জবাবদিহির মধ্য দিয়ে যেতে হয় না, তাঁর হাতে শাসনের ভার তুলে দেওয়া সব সময় ঝুঁকির।

রাড্ডার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে পদত্যাগ করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
ছবি: ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ফেসবুক পেজ থেকে

আবার ফিরি রাড্ডায়। এ ঘটনা বিএনপির তৃণমূলকে যে কঠোর বার্তা দিয়েছে, তা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। দেশের রাজনীতিতে এর একটা বড় প্রভাব পড়বে নিশ্চয়ই। তবে এ রকম কয়েকটি দৃষ্টান্ত অবশ্যই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়। শাস্তি দিয়ে অপরাধ থামানো যায়, কিন্তু অপরাধের কারণ তাতে ভ্যানিশ হয়ে যায় না। কারণটা খুঁজতে হলে কিছু কঠিন প্রশ্নের সৎ উত্তর দিতে হবে, যেমন এই দেশে একজন মানুষ রাজনীতিতে কেন আসেন, রাজনীতি থেকে তিনি কী কী পান, আর তাঁর বড় নেতা হতে বা নির্বাচনে জিততে গাঁটের পয়সা থেকে কত খরচ করতে হয়।

সামনে সিটি করপোরেশন, ওয়ার্ড, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বহু নির্বাচন অপেক্ষমাণ। এসব নির্বাচনে প্রার্থীকে যদি বড় অঙ্কের টাকা ঢালতে হয়, তিনি সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কথাই ভাববেন। এটি নব্য-উদারনৈতিক অর্থনীতির জমানায় স্বাভাবিক মানবস্বভাব। কোনো দল বা আদর্শের বিবেচনায় এই প্রবৃত্তি এড়ানো কঠিন।

আরও পড়ুন

জনপ্রতিনিধির দায়িত্বকে যদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, তবে দায়িত্ব পালনের পর লোকসান হলে সেটাকে ঋণাত্মক ফল মনে হবে। তখন জমি দখল, টেন্ডার, চাঁদা আর সমিতির নামে বরাদ্দ—সবই হয়ে ওঠে ‘খরচ তুলে আনার’ পথ। প্রথম আলোর অনুসন্ধানে রাড্ডার জায়গা নিয়ে যে সমবায় সমিতির নাম উঠে এসেছে এবং স্থানীয় রাজনীতির যে ঘনিষ্ঠ বৃত্তের কথা এসেছে, তা এই চেনা ছকেরই ইঙ্গিত দেয়।

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের চিরায়ত পৃষ্ঠপোষক ও অনুগত সম্পর্কের রাজনীতি, যাকে বলে ‘প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট’ সম্পর্ক। নেতা তাঁর ভোটার বা কর্মীকে প্রাত্যহিক বিভিন্ন প্রয়োজনে সাহায্য করেন, কর্মী বা ভোটার তাঁর বিনিময়ে নিজের আনুগত্য দেন। চিকিৎসার খরচ, মামলার তদবির, চাকরির সুপারিশ—এই ব্যক্তিগত দানের ওপরই সমাজে নেতার ভিত্তি দাঁড়ায়। দান বন্ধ হলে আনুগত্যও হারিয়ে যায়, তাই নেতাকে নিরন্তর টাকা জোগাড় করেই যেতে হয়।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই চক্র রাজনীতিকে ভেতর থেকে ক্ষয় করছে। নেতার কাজ হওয়া উচিত সামষ্টিক কাঠামো বদলানো: ভালো হাসপাতাল, ভালো রাস্তা, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য তিনি করবেন, কিন্তু কল্যাণ-রাজনীতি বা ‘ওয়েলফেয়ার পলিটিকস’ তাঁর মূল শক্তি হতে পারে না। বাংলাদেশে এই ওয়েলফেয়ার পলেটিকসের সংস্কৃতি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নানা আঙ্গিকে ক্ষতি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্স ২০১৬ সালের প্রাথমিক নির্বাচনী প্রচারে ২২৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি তহবিল তুলেছিলেন। গড় অনুদান ছিল মাত্র ২৭ ডলার, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর প্রচারের স্লোগানে পরিণত হয়। ২০১৯ সালে নতুন প্রচারণা শুরুর ২৪ ঘণ্টায় তিনি প্রায় ৫ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলার পান, যার দাতা ছিলেন ২ লাখ ২৩ হাজারের বেশি মানুষ। ডেমোক্র্যাটদের অনলাইন অনুদান প্ল্যাটফর্ম অ্যাক্টব্লু একই বছর ৩ কোটি ৫০ লাখের মতো অনুদান গ্রহণ করে, যার মোট অঙ্ক ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল।

২০০৮ সালে বারাক ওবামার প্রচারেরও বড় অংশ এসেছিল অনলাইনে ছোট অঙ্কের অনুদান থেকে। তবে পশ্চিমের এই মডেলকে আদর্শ বলে চালিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে সুপারপ্যাক আছে; আবার বড় বড় নির্দিষ্ট দাতাও আছে। এ কারণে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের প্রভাবের সমস্যা আছে। তবে এখানে একটি বার্তা পরিষ্কার। প্রার্থীর তহবিল যখন লাখ লাখ ছোট দাতার কাছ থেকে আসে, তখন তাঁর কাছে নাগরিক দায়বদ্ধতার হিসাব বদলে যায়। তিনি আর একজন বড় বিনিয়োগকারীর কাছে জবাবদিহি করেন না, বহু মানুষের কাছে করতে বাধ্য থাকেন। আমাদের দেশে উল্টোটা ঘটে। প্রার্থী নিজেই দাতা, নিজের প্রচারের ঋণদাতা, আর পরে নিজের ঋণ শোধকারীও!

সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বিএনপিকে নতুন করে একটি রাজনৈতিক মীমাংসায় পৌঁছাতে হবে, তা ঘটাতে হবে নিজের ভেতরে এবং ভোটারের সঙ্গে। দলীয় মনোনয়ন যেন অর্থের জোরে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় নির্বাচনে ব্যয়ের সীমা কেবল কাগজে না রেখে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। দলীয় তহবিল ও প্রার্থীর অনুদান স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করার সংস্কৃতি গড়তে হবে। আর কর্মীর মর্যাদা যেন নেতার ব্যক্তিগত দানের ওপর নির্ভর না করে, দলীয় কাঠামোর ভেতর থেকেই আসে, সেটাও দেখতে হবে।

রাড্ডার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পদক্ষেপ একটা সুযোগ তৈরি করেছে। এই কঠোরতা যদি কেবল একটি ঘটনার প্রতিক্রিয়া হয়, তবে কয়েক মাসের মধ্যে তা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। আর যদি এটি একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হয়, তবে ইতিহাস একে মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত বলে মনে রাখবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিচার কত দূর গড়ায়, ধ্বংস হওয়া কেন্দ্রটি কত দ্রুত আবার চালু হয়, আর পরের স্থানীয় নির্বাচনে দল কাদের প্রার্থী করে—এই তিনটি ঘটনাই বলে দেবে বার্তাটা কতটা গভীর ছিল।

রাড্ডার ভাঙা দেয়াল আবার তোলা যাবে। কঠিন কাজটা হলো সেই মানসিকতা ভাঙা, যার কাছে দরিদ্র মায়েদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চেয়ে একটুকরো জমি বেশি মূল্যবান ছিল।

  • মোস্তফা মুশফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী

মতামত লেখকের নিজস্ব