গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাটি আইনসম্মত

প্রথম আলোতে প্রকাশিত ‘গণভোটের প্রচার: নির্বাচন কমিশনের মস্ত বড় ভুল নির্দেশনা’ শীর্ষক কলামে ড. বদিউল আলম মজুমদার সম্প্রতি দাবি করেন, নির্বাচনের সাথে সম্পৃক্ত থাকা সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রেরিত ২৯ জানুয়ারির নির্দেশনাটি ‘সংশ্লিষ্ট আইনের ভুল পাঠের ভিত্তিতে জারি করা হয়েছে’। উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন ২৯ জানুয়ারি যে নির্দেশনাটি প্রকাশ ও প্রচার করেছে, সেখানে বলা আছে যে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠেয় গণভোট আয়োজনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, রিটার্নিং কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গণভোটে কোনো পক্ষে (‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’)-এর বিষয়ে প্রচারণায় অংশ নিতে পারবে না।

নির্দেশনাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬-এর বিধানাবলির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণপূর্বক জানানো যাচ্ছে যে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে অবহিত ও সচেতন করতে পারবেন; তবে তিনি গণভোটে “হ্যাঁ”-এর পক্ষে বা “না”-এর পক্ষে ভোট প্রদানের জন্য জনগণকে কোনোভাবে আহ্বান জানাতে পারবেন না। কেননা, এ ধরনের কার্যক্রম গণভোটের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে, যা গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।’

নির্দেশনায় উল্লিখিত আইনগুলোর ব্যাখ্যা দিয়ে ড. মজুমদার লিখেছেন, ‘নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিধান গণভোটের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেছে। এটি একটি মস্ত বড় ভুল।’ তিনি লেখাটি শেষ করেন এই বলে যে, ‘সরকারি কর্মকর্তাদের ‘‘হ্যাঁ’’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানো অবৈধ নয়। আশা করি, নির্বাচন কমিশন তার ভুল বুঝতে পারবে এবং তাদের নির্দেশনাটি অবিলম্বে প্রত্যাহার করবে।’

ড. মজুমদারের আইনসংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি একপেশে এবং নির্বাচনী আচরণসংবলিত বিধি-বিধানের ব্যাখ্যায় পুরো চিত্র পরিপূর্ণভাবে তুলে ধরে না। অন্য অর্থে, নির্বাচন কমিশন প্রদত্ত নির্দেশনাটি আইনের দৃষ্টিতে যথাযথ।

এটা সত্য যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দুটো এক বিষয় নয়। সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে তাদের প্রতিনিধি বা সংসদ সদস্য নির্বাচনের সুযোগ পায়। আর গণভোটে জনগণ মূলত সাংবিধানিক প্রশ্নের সমাধানের জন্য দুটো বিকল্প থেকে যেকোনো একটি বিকল্প ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে সরাসরি বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।

আরও পড়ুন

নির্বাচনের ধারণাগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও একইরকমের নির্বাচনী আচরণবিধি ও আইন-কানুন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোটে প্রযোজ্য হতে পারে। এতে কোনো আইনগত বাধা থাকার কথা না। বিশেষত যখন একই ধরনের নির্বাচনী কর্মকর্তাদের দিয়ে একইদিনে একইসাথে একইকেন্দ্রগুলোতে দুটো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

ড. মজুমদার মনে করেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট আচরণবিধি গণভোটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এর মানে তাহলে দাঁড়ায়, দুটো নির্বাচনের জন্য ভিন্ন দুটি আচরণবিধি থাকার কথা। অথচ ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় দুটো নির্বাচনের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার নিমিত্তে কেন পৃথক দুটি আচরণবিধি সরকার কর্তৃক প্রণয়ন করা উচিত ছিল বা কেন সেটা করা হয়নি- সেই বিষয়ে তিনি তাঁর লেখায় কোনো আলোকপাত করেননি।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় ‘নিরপেক্ষতা’র নীতি আমাদের শেখায় যে যারা নির্বাচন আয়োজন করে থাকে তারা কখনো সেই নির্বাচনে কোনো পক্ষ অবলম্বন করে না। যেখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকারি কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ থাকতে বাধ্য, সেখানে ‘নিরপেক্ষতা’র মতো এতো সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ধারণাকে অবজ্ঞা করে সেই একই সরকারি কর্মকর্তারা কোন যুক্তিতে গণভোটে কোনো একটা পক্ষ অবলম্বন করবে- এটা বোধগম্য নয়। এটা অনুমেয় যে নিরপেক্ষতার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নির্বাচন কমিশন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে।

যে দুটি বিধানের (অনুচ্ছেদ ৮৬ ও ধারা ২১) প্রসঙ্গ টেনে নির্বাচন কমিশন সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিয়েছে, সে বিধান দুটি একে অন্যের পরিপূরক। বিধানদুটিকে পৃথকভাবে পড়ার বা ব্যাখ্যা করার অবকাশ নাই। ‘রিডিং টুগেদার’ বা সামগ্রিকভাবে পড়লে বোঝা যাবে যে বিধান দুটির অর্থগত দিক থেকে ঐক্যতান রয়েছে।

ড. মজুমদার যথার্থই গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২ (আরপিও)-এর ২(৭) অনুচ্ছেদ তাঁর লেখায় উদ্ধৃত করেছেন। অনুচ্ছেদ ২(৭)-এ সুনির্দিষ্ঠভাবে বলা আছে, ‘“নির্বাচন” অ‍‍র্থ এই আদেশের অধীন কোনো সদস্যের আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন।’ কেবল এতটুকু পড়লে যে কেউ ড. মজুমদারের মতো এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে, আরপিওর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী ‘যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, তা সংসদ সদস্যদের নির্বাচন, গণভোট নয়।’ আরপিওর অনুচ্ছেদ ৮৬-এ সরকারি কর্মকর্তাদের জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকে একটা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট শাস্তির কথা বলা আছে।

আরও পড়ুন

তবে গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ২১ ধারার দিকে নজর দিলে এই বিষয়টা পরিস্কার হয়, বস্তুত আরপিওর বিধানাবলি দিয়েই সংসদ নির্বাচন ও গণভোট - উভয় নির্বাচনে নিয়োজিত সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। অপরাধ, দণ্ড ও বিচারপদ্ধতি সম্পর্কে ২১ ধারায় বলা আছে যে, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যত দূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলিয়া গণ্য হইবে, এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।’

এখানে নির্বাচনের প্রকারভেদ বা ভিন্নতা মূল বিবেচ্য বিষয় নয়; বরঞ্চ দুটি নির্বাচনে দায়িত্বরত সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণ করাই ২১ ধারার একমাত্র লক্ষ্য। ভুলে গেলে চলবে না যে, যেসব সরকারি কর্মকর্তা নির্বাচনী কর্মকর্তা হিসেবে ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন আয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত রয়েছেন এবং কাজ করে যাচ্ছেন, তারাই কিন্তু ওই একইদিনে অনুষ্ঠিতব্য গণভোটের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। সুতরাং, নির্বাচন কমিশনের ২৯ জানুয়ারির নির্দেশনায় গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২১ ধারার উল্লেখ কোনোভাবেই ‘বিভ্রান্তিমূলক’ নয়।

২১ ধারায় ‘যতদূর প্রযোজ্য’ শব্দ দুটি ব্যবহার করায়, ড. মজুমদারের যুক্তি হচ্ছে ‘নির্বাচনী অপরাধ, দণ্ড ও বিচারপদ্ধতি-সংক্রান্ত আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ গণভোটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, কারণ আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রণীত। একইভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনসংক্রান্ত আচরণবিধি শুধু সংসদ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, গণভোটের ক্ষেত্রে নয়।’ এটা আইনের এক ধরনের ব্যাখ্যা বটে, যেটাকে আমরা বলি ‘টেকনিক্যাল/টেক্সচুয়াল ইন্টারপ্রিটেশন অব ল’।

‘যতদূর প্রযোজ্য’ শব্দদ্বয় ব্যবহার করে আইন-প্রণেতারা যদি গণভোট সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আচরণগুলোকে আরপিওর বাইরে ভিন্ন কোনো আইনি বিধান দিয়ে মোকাবেলা করতে চাইত, তাহলে সেটা গণভোট অধ্যাদেশে বা এর অধীনে প্রণীত বিধিতে পরিস্কারভাবে বলা থাকত। বরং গণভোট অধ্যাদেশের বেশিরভাগ ধারায় (বিশেষত ধারা ৪ থেকে শুরু করে ১৩ পর্যন্ত) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে যতটা সম্ভব সমান্তরাল দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। যেমন: ধারা ৫-এ বলা হচ্ছে, এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তারাই গণভোটের জন্য নিয়োজিত থাকবে। আবার ১৩ ধারায় বলা হচ্ছে, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ ও কেন্দ্রের শৃঙ্খলা রক্ষাসহ অন্যান্য বিষয়ে এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য বিধি-বিধান গণভোটের ক্ষেত্রে যতদূর প্রয়োজনীয় সেইভাবে প্রযোজ্য হবে।

গণভোটের ক্ষেত্রে ‘যতদূর প্রযোজ্য’ বাক্যাংশটির অর্থ হচ্ছে আরপিও পুরো আইনটি হুবহু নয়, বরং এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী আচরণ যতটুকু সম্ভব যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, ঠিক সেভাবে গণভোটে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের নির্বাচনী আচরণ সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।

এটাও মনে রাখা দরকার যে, আরপিও বা প্রচলিত অন্যান্য কোনো আইনে গণভোটের কোনো বিধান নাই। সেজন্য আলাদা করে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। আর গণভোটে কর্তব্যরত সরকারি কর্মকর্তারা যেহেতু জাতীয় সংসদ নির্বাচনেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দ, তাই তাদের নির্বাচনী আচরণ নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে বিদ্যমান আরপিওর সংশ্লিষ্ট বিধানের অর্থ্যাৎ ৮৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ/রেফারেন্স অধ্যাদেশের ২১ ধারায় টেনে দুটো আইনি কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্যতা বা একধরনের সংগতি বজায় রাখা হয়েছে।

একটা গুরুতপূর্ণ বিষয় হচ্ছে যে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনাটি নিছক একটি নির্দেশনা বা ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য নয়; বরং সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘আইনে’র সংজ্ঞা অনুযায়ী এটি একটি আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন দলিল তথা নিজেই একটা আইন। তাই আইনের সংকীর্ণ ব্যাখ্যা দিয়ে এই আইনি দলিলটিকে খারিজ করে দেওয়ার প্রচেষ্টার কারণে গণভোটের প্রতি মানুষের আস্থা ফিকে হয়ে আসার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

উপরের আলোচনার আলোকে তাই বলা যায়, গণভোট প্রচারণায় সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে নির্বাচন কমিশনের জারি করা নির্দেশনাটি ‘মস্ত বড় ভুল’ তো দূরে থাক, কোনো ভুলই নয়; বরং আইনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার ঊর্দ্ধে উঠে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের বর্তমান পরিস্থিতির সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে এই নির্দেশনা জারি করেছে।

  • ইমরান আজাদ লেখক ও আইনের গবেষক

*মতামত লেখকের নিজস্ব