১৫ অক্টোবর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত বিএনপির সমাবেশের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মঘট না ডাকলেও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন স্থানে বাধা দেন।

২২ অক্টোবর খুলনার সমাবেশ উপলক্ষে স্থানীয় পরিবহন সংগঠন সমাবেশের আগের দিন ও সমাবেশের দিন ধর্মঘট ডাকে। খুলনা জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস মালিক সমিতির দাবি ছিল, সড়ক ও মহাসড়কে অবৈধভাবে নছিমন, করিমন, মাহিন্দ্রা, ইজিবাইক ও বিআরটিসির বাস চলাচল বন্ধ করতে হবে। ২০ অক্টোবরের মধ্যে প্রশাসন যদি সড়কে ওই অবৈধ যান চলাচল ও কাউন্টার বন্ধ না করে, তাহলে ২১ ও ২২ অক্টোবর ধর্মঘটের ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই ঘোষণার পর প্রশাসন পরিবহন মালিক সমিতিকে ডাকেনি। যথারীতি ধর্মঘট পালিত হয়েছে। একপর্যায়ে খুলনার পথে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়। ট্রেন চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এরপরও বিএনপি বড় জমায়েত করে।

বিএনপির সমাবেশে লোক সমাগম কমাতে তৎপর আওয়ামী লীগ—এই অভিযোগ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ কোথাও বাধা দেয়নি, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। বিএনপি আলোচনায় থাকার জন্য অভিযোগ করে থাকে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ না চাইলে বিএনপি সমাবেশ করতে পারে কীভাবে?

পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক ক্ষমতাসীনেরা

পরিবহন খাত ও আওয়ামী লীগের সূত্র বলছে, রংপুরে ধর্মঘট কিংবা বাধা দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা নেই। বরাবরই রংপুরে বিএনপি কিছুটা দুর্বল। এ জন্য হয়তো বড় কোনো বাধা না–ও আসতে পারে। তবে সারা দেশের পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কৃত মসিউর রহমান ওরফে রাঙ্গার বাড়ি রংপুরে।

তিনি সরকারঘেঁষা বলে পরিচিত। তিনি শেষ মুহূর্তে ধর্মঘটের ডাক দিতেও পারেন। এই সংগঠনের মহাসচিব ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। অন্য নেতাদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিতে যুক্ত।

শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান। আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা আছে, ২০১৪ সালে শাজাহান খানকে নৌপরিবহনমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া এবং পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য করার পেছনে তাঁর শ্রমিক রাজনীতি ভূমিকা রেখেছে।

খুলনায় ধর্মঘট ডাকা জেলা বাস, মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস মালিক সমিতির সভাপতি মো. মিজানুর রহমান। তিনি খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের খুলনা মহানগর শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক।

আওয়ামী লীগ ও পরিবহন খাতের সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় ও জেলা পর্যায়ে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের হাতে। কোথাও কোথাও প্রকাশ্যে নেতৃত্ব অন্যের হাতে থাকলেও পেছনে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারাই।

সড়ক পরিবহন আইন অনুসারে, সরকার কোনো ক্ষতির আশঙ্কা করলে নির্দিষ্ট কোনো স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখতে পারে। এ জন্য যথাযথ কারণ উল্লেখ করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। তবে পরিবহনমালিকদের ধর্মঘটের কোনো আইন নেই। বরং তাঁরা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে পারেন। এর জন্য শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। শ্রম আইন অনুসারে, শ্রমিকের ধর্মঘট ডাকার অন্তত ১৫ দিন আগে দাবি পেশ করতে হবে। খুলনা ও বরিশালে এর কোনোটাই মানেননি তাঁরা।

খন্দকার এনায়েত উল্যাহ প্রথম আলোকে বলেন, তিনি দেশের বাইরে আছেন। তবে স্থানীয় পরিবহননেতারা নিজে থেকেই ধর্মঘট ডাকেন। তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করেননি। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশনা নেই।

সব স্থানে ধর্মঘট ডাকা হচ্ছে একই কায়দায়

গতকাল বুধবার ধর্মঘট ডেকেছে বরিশাল বাস মালিক সমিতি। মহাসড়কে তিন চাকার অবৈধ যান ও ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল বন্ধের দাবিতে আগামী ৪-৫ নভেম্বর বরিশাল থেকে অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপ। বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশ ৫ নভেম্বর।

গত মঙ্গলবার বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের সভাপতি গোলাম মাসরেক ও সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ওই চিঠিতে বাস মালিক সমিতির নেতারা তাঁদের দাবি আদায়ে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। অন্যথায় ৪-৫ নভেম্বর বরিশালের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদ ও অভ্যন্তরীণ বাস টার্মিনাল রূপাতলী থেকে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ সব রুটের বাস চলাচল বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সড়ক পরিবহন আইনের প্রয়োগ বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাড়াবাড়ি, পরিবহনশ্রমিকদের মারধর—এসব কারণে পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলো ধর্মঘটের ডাক দেয়। তাদের সঙ্গে প্রশাসন আলোচনায় বসে সমাধানও করে। কিন্তু খুলনায় পরিবহননেতাদের সঙ্গে আলোচনার কোনো তাগিদ সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় কিংবা স্থানীয় প্রশাসন দেখায়নি। বরিশালে ধর্মঘট প্রত্যাহারে বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা কম।

অবশ্য বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মো. আমিন উল আহসান গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এ ধরনের একটি চিঠি পেয়েছি। এ বিষয়ে হাইকোর্ট ও সরকারের একটি নির্দেশনা রয়েছে। সে অনুযায়ী আমরা ব্যবস্থা নেব এবং এসব যান বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আশ্বস্ত করেছি।’

বরিশালে বিএনপির গণসমাবেশ আয়োজনের জন্য নগরের বঙ্গবন্ধু উদ্যানের বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছে মহানগর বিএনপি। তবে গতকাল দুপুর পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে বাস ধর্মঘটের বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে নেতা-কর্মীরা বলছেন, সমাবেশ সফল করার জন্য তাঁরা প্রস্তুতিমূলক সভা করছেন।

কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা আশঙ্কা করছেন, সমাবেশের আগের দিন থেকে বরিশালের পথে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। কারণ, লঞ্চ মালিক সমিতির শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতা।

জানতে চাইলে বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাস চলাচল বন্ধের আবেদন করা হয়েছে বলে আমরা শুনেছি। এটা করা হবে, সেটাও আমরা নিশ্চিত ছিলাম। কারণ, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ এবং সর্বশেষ খুলনায় এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়ে সরকার গণসমাবেশ বানচাল করতে চেয়েছিল।

এমনকি লঞ্চ, ট্রেন, ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, রিকশা, ব্যাটারিচালিত যান এবং খেয়া পর্যন্ত বন্ধ করার মতো বিরল নজির এই সরকার স্থাপন করেছে। কিন্তু জনগণকে ঠেকানো যায়নি। ৫ নভেম্বর বরিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হবে।’

গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় পর্যায়ে গণসমাবেশের ঘোষণা দেয় বিএনপি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ ও খুলনায় সমাবেশ হয়েছে। রংপুর ও বরিশালে আসন্ন। এর বাইরে ১২ নভেম্বর ফরিদপুর, ১৯ নভেম্বর সিলেট, ২৬ নভেম্বর কুমিল্লা, ৩ ডিসেম্বর রাজশাহী এবং ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় গণসমাবেশের কর্মসূচি নির্ধারিত আছে।

বিএনপির সমাবেশ ঘিরে ধর্মঘট ডাকা হলেও এর মূল শিকার হন সাধারণমানুষ, রোগী, অফিসগামী ব্যক্তি।