দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। ছোট ছোট মিছিল এসে মিশছে পল্লবী ঈদগাহ মাঠের ভিড়ে। বাতাসে ধুলো উড়ছে, মাথায় রোদের আঁচ। হাতে হাতে উড়ছে পতাকা। কারও মাথায় বাঁধা দেশের পতাকা, কারও মাথায় লেখা যুবদল, ছাত্রদল কিংবা জাতীয়তাবাদী দল। হঠাৎ মাইকে ভেসে আসে নেতার নাম। তখন উপস্থিত নেতা–কর্মীদের স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে আশপাশ।
বিকেল সোয়া চারটায় মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। উঠেই ঘুরে বেড়ান মঞ্চের কোনায় কোনায়। হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। দলের প্রধানের শুভেচ্ছার জবাবে হাত নাড়তে থাকেন সমবেত নেতা–কর্মীরা। আশপাশের বাসার ছাদে, জানালার গ্রিলের ফাঁক দিয়েও হাত নাড়েন কেউ কেউ।
কথা হয় মিরপুরের রূপনগর এলাকা থেকে সমাবেশে আসা কয়েকজনের সঙ্গে। তাঁদের সবার বয়স ২৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। তারেক রহমানকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ হয়নি কখনো। তাঁদের একজন নাজমুল আহসান। তিনি বলেন, তারেক রহমানকে দেখতে পল্লবীর জনসভায় আগে এসে মঞ্চের কাছাকাছি জায়গা নিয়েছেন। এবার দেখার সাধ পূরণ হয়েছে।
বিকেল সাড়ে চারটায় ভাষণ শুরু করেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তবে মঞ্চের সামনে রাখা পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে নয়। হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মঞ্চজুড়ে। বারবার যেন সমাবেশে উপস্থিত নেতা–কর্মী ও সমর্থকদের কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন। যেন কনসার্টের মঞ্চে হেঁটে বেড়াচ্ছেন শিল্পী। মাঝেমধ্যেই তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন নেতা–কর্মীরা, দিচ্ছেন স্লোগান। প্রশ্ন করছেন তারেক রহমান, উত্তর দিচ্ছেন নেতা–কর্মীরা। ভাষণ নয়, যেন কথোপকথন চলছে নেতার সঙ্গে কর্মীদের। আলাপ আর সংলাপে এভাবেই জমে ওঠে জনসভা।
নির্বাচন নিয়ে দলীয় ইশতেহার থেকে পরিকল্পনা তুলে ধরেন তারেক রহমান। মিরপুর নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানান। এরপর মিরপুর–১৬ আসনে দলীয় প্রার্থী আমিনুল হকের জন্য ভোট চান। সমাবেশে উপস্থিত নেতা–কর্মী, সমর্থকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারি আপনাদের পরিকল্পনা কী?’ সমবেত সুরে উত্তর আসে, ‘ধানের শীষ, ধানের শীষ।’ প্রশ্নটি তিনি করেন কয়েকবার, প্রতিবার উত্তরের তেজ বাড়ে।
রোববার ঢাকার ৬টি আসনে নির্বাচনী প্রচার চালান তারেক রহমান। নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা–১৭ দিয়ে শুরু হয়। ইসিবি চত্বরের পর ঢাকা-১৬ আসনে পল্লবী ২ নম্বর ওয়ার্ডের মাঠ, ঢাকা-১৫ আসনে মিরপুর-১০ গোলচত্বর-সংলগ্ন সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা-১৪ আসনে ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয় ফটক, ঢাকা-১৩ আসনে শ্যামলী ক্লাব মাঠ এবং ঢাকা-১১ আসনে বাড্ডার সাঁতারকুলের সানভ্যালি মাঠে জনসভায় বক্তব্য দেন তিনি।
বেলা একটার দিকে পৌঁছাই পল্লবী মেট্রো স্টেশনের পাশের মাঠে। বিকেল ৫টায় জনসভা শেষ করে যাই সেনপাড়া আদর্শ সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। এরপর সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে যাই ন্যাশনাল বাংলা উচ্চবিদ্যালয় ফটকের সামনের জনসভায়। ঢাকা–১৬, ঢাকা–১৫ ও ঢাকা–১৪ আসনের এ তিনটি জনসভা ঘুরে প্রায় একই রকম চিত্র দেখা যায়। প্রতিটি জনসভায় মঞ্চে হেঁটে হেঁটে আলাপের সুরে কথা বলেন তারেক রহমান। সামনে হাজারো বিএনপি সমর্থকের ভিড়। তিনি হারানো দিনের কথা বলেন।
১৭ বছরের বঞ্চনার কথা বলেন, নির্যাতনের কথা বলেন। মাঠে উপস্থিত নেতা–কর্মীরা তখন চুপচাপ। সবাই যেন নিজের জীবনের, রাজনৈতিক লড়াইয়ের মিল খুঁজে পান। এরপর আবার তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা বলেন, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের কথা বলেন। তারেক রহমান থামলে স্লোগান ওঠে। তিনি কথা শুরু করলেই থামে স্লোগান। ট্রাকে গান বাজিয়ে জনসভা এলাকায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী বাউল দল। গানের সঙ্গে সঙ্গে প্রচারপত্র বিলি করেন তাঁরা।
সেনপাড়া এলাকার জনসভার সামনে কথা হয় মোস্তাক মোহাম্মদ শাওনের সঙ্গে। খুলনার পাইকগাছার এ তরুণ ২০১২ সাল থেকে লন্ডনে থাকেন। ২ ফেব্রুয়ারি দেশে এসেছেন। গত কয়েক দিন কয়েকটি জনসভায় অংশ নিয়েছেন। উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁও গেছেন তারেক রহমানের জনসভায়। তিনি বলেন, দেশের রাজনীতিতে এমন ভাষণ দেখা যায় না। নেতারা সাধারণত পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। আর তারেক রহমান যেন মঞ্চে থেকেও সবার সঙ্গে আলাপ করছেন।
উৎসবের আমেজ, বিক্রি হচ্ছে পতাকা
পল্লবীর জনসভার পাশের সড়কে পতাকা বিক্রি করছিলেন আবুল হাশেম। পুরান ঢাকার কদমতলী এলাকা থেকে এসেছেন তিনি। আলাপ হয় তাঁর সঙ্গে। গত শনিবার হবিগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর জনসভায় পতাকা বিক্রি করে রোববার ভোরে ঢাকায় ফিরেছেন। এর আগেও বিভিন্ন জেলায় দুই দলের সমাবেশে পতাকা, মাথার ফিতা বিক্রি করেছেন তিনি। হবিগঞ্জে জামায়াতের সমাবেশে ১০ হাজার টাকার পতাকা বিক্রি করেছেন। কক্সবাজারে জামায়াতের সমাবেশে বিক্রি করেছেন ১৩ হাজার টাকার। বরিশালে বিএনপির সমাবেশে বিক্রি করেছেন ৮ হাজার টাকার। ফেনীতে বিএনপির সমাবেশে বিক্রি করেছেন ৩০ হাজার টাকার।
আবুল হাশেম বলেন, সারা বছর রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসের দিনে পতাকা বিক্রি করেন। আর প্রতি নির্বাচনে বিভিন্ন জনসভায় ঘুরে ঘুরে পতাকা বিক্রি করেন। ১৭ বছর পর আবার ভোট উৎসব ফিরে এসেছে। এবার বিএনপির পতাকা বেশি বিক্রি হচ্ছে।
জনসভা এলাকার চারপাশে আরও বেশ কয়েকজনকে পতাকা বিক্রি করতে দেখা যায়। কেউ কেউ দলীয় প্রতীকের কোর্ট পিন বিক্রি করছেন, কেউ বিক্রি করছেন দলীয় পতাকার নকশায় বানানো মাফলার।
ঢাকায় একটি বেসরকারি ইন্টারনেট সেবাদানকারী কোম্পানিতে কাজ করেন আল আমিন। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহ জেলায়। মেট্রোতে করে কাজে যাচ্ছিলেন। জনসভা দেখে পল্লবী স্টেশনে নেমে পড়েন তারেক রহমানকে দেখতে। পতাকা কেনার সময় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪ বছরের বাচ্চার জন্য ছোট একটি পতাকা নিয়েছেন ৪০ টাকা দিয়ে।
ফেরার পথেও সমবেত কণ্ঠে স্লোগান
মিরপুরে জনসভার পাশেই উর্দু লেখা ব্যানার নিয়ে একটি মিছিল আসে। ‘উর্দু ভাষীর মার্কা, ধানের শীষ মার্কা’ স্লোগান দিতে থাকেন তাঁরা। এ মিছিলের একজন আবদুর রহমান। তিনি বলেন, মিরপুর কয়েকটি ক্যাম্পে উর্দুভাষীরা থাকেন। এ জনগোষ্ঠী নানা সুবিধাবঞ্চিত। বিএনপি ক্ষমতায় এলে কিছু সুবিধা পেতে পারেন বলে আশা করছেন তাঁরা।
তিনটি জনসভায় মিরপুর বিএনপির বিভিন্ন ওয়ার্ডের বেশ কয়েকজন নেতা–কর্মীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, মিরপুরের তিনটি আসনে এবার জামায়াতে ইসলামী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এর মধ্যে ঢাকা–১৫ আসনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান প্রার্থী হয়েছেন। এই আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আছে। এখন তারেক রহমান আসার কারণে আত্মবিশ্বাস বেড়ে গেছে। এতে জয়ের সম্ভাবনা আরও বেড়ে গেছে।
প্রতিটি জনসভায় উপস্থিত সবার প্রতিশ্রুতি নেন তারেক রহমান। সবাইকে চাঙা করে তোলেন। নিজেই স্লোগান তুলে বলেন, ‘করব কাজ, গড়ব দেশ’। সমবেত সুরে সবাই বলে ওঠে, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।