অভিমত: সরকারের ১ মাস
সরকারকে দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে এগোতে হবে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। সরকারের এক মাস হতে চলেছে। এ সময়ে সরকারের কার্যক্রম কেমন ছিল, তা নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের অভিমত।
বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব ও পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছিল। সেখানে জিডিপি (মোট দেশজ উৎপাদন) প্রবৃদ্ধি, কর-জিডিপি অনুপাত ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের ঋণ মওকুফ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগসহ নানা বিষয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বিএনপি সরকার এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেয় এবং দ্রুত কাজ শুরু করে। বিশেষ করে তাদের অন্যতম প্রতিশ্রুত কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দ্রুত দেওয়া শুরু হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকার এ বিষয়ে আগেই প্রস্তুতি নিয়েছিল।
মনে রাখতে হবে, ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচিতে উপকারভোগী বাছাইয়ে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি করা যাবে না। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটা কোথা থেকে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকারের ব্যয় মেটানো এবং এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং ব্যক্তি খাতে অর্থায়নের ওপর প্রভাব পড়বে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সংস্কারের জোরালো পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে দেরি করা যাবে না। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংস্কার বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত জরুরি।
নতুন করে বৈশ্বিক পরিস্থিতি সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক
বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশকে উচ্চমূল্যে জ্বালানি তেল আমদানি করতে হচ্ছে, যা অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকার একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে সরকারের ব্যয় বাড়ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে। বাংলাদেশের রিজার্ভ এমন পর্যায়ে নেই যে তা দিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় নির্বিঘ্নে বহন করা সম্ভব। তাই জ্বালানি সাশ্রয়, সীমিত ব্যবহার এবং ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি খরচ কমানো গেলে আমদানি ব্যয়ও কমবে এবং সরকারের আর্থিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে।
সরকার দ্রুত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটি হলো বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়া। এ বিষয়ে তারা জাতিসংঘে আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে এলডিসি উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না। বর্তমান সরকার তুলনামূলক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে এ প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিচ্ছে, যা একটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি আগেই চাপে ছিল। তার ওপর বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ অবস্থায় সরকারকে একদিকে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে নতুন সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
আমার মতে, আগামী দিনে সরকারকে দ্বিমুখী কৌশল নিয়ে এগোতে হবে—একদিকে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় ‘ফায়ার ফাইটিং’ ব্যবস্থা চালু রাখতে হবে, অন্যদিকে মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংস্কার, নীতিগত পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফাহমিদা খাতুন: নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)
*মতামত লেখকের নিজস্ব