রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: কারা হতে পারেন প্রার্থী, কীভাবে হয় ভোট

জাতীয় সংসদ ভবনফাইল ছবি

চলতি মাসেই ২৩তম রাষ্ট্রপতি পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পদত্যাগ করা মো. সাহাবুদ্দিনের জায়গায় কে হচ্ছেন নতুন রাষ্ট্রপতি, তা জানতে আরও সপ্তাহ দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। সংসদীয় রীতি অনুযায়ী ইচ্ছা করলেই যে কেউ রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন না। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী কে হবেন, তা ঠিক করেন সংসদ সদস্য তথা রাজনৈতিক দল।

রাজনৈতিক দল ও সংসদ সদস্যদের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেওয়ার আগে প্রার্থীর কিছু যোগ্যতা–অযোগ্যতা মাথায় রাখতে হয়। যেমন: রাষ্ট্রপতি পদের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তির বয়স হতে কমপক্ষে ৩৫ বছর। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীকে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। সব যোগ্যতা থাকার পর সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। অর্থাৎ সব সাংবিধানিক ও আইনি শর্ত পূরণ করেই যেকোনো ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের যোগ্যতা অর্জন করতে হয়। আর জয়–পরাজয় নির্ভর করে সংসদে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর।

আরও পড়ুন
নির্বাচন কমিশন (ইসি)
ফাইল ছবি: বাসস

গতকাল বৃহস্পতিবার নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তফসিল অনুসারে, ২০ আগস্ট হবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট। অবশ্য একাধিক প্রার্থী না থাকলে ভোটাভুটির প্রয়োজন হবে না। তখন ১৬ আগস্ট বাছাই শেষে একক প্রার্থী নির্বাচিত হয়ে যাবেন। তবে ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিনই পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে, কে হচ্ছেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন মো. সাহাবুদ্দিন। এরপরই বিএনপির কয়েকজন নেতাসহ বিভিন্ন ব্যক্তির নাম আলোচনায় আসছে।

সাধারণত সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সমর্থিত ব্যক্তিরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ফলে মূল আলোচনার কেন্দ্রে এবং রাজনৈতিক মহলের আগ্রহের জায়গা হচ্ছে পদে কোন নেতা বা ব্যক্তি আসছেন। বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। ফলে বিএনপি যাঁকে প্রার্থী করবে, তিনিই হবেন পরবর্তী রাষ্ট্রপতি, তা বলাই যায়। তফসিল ঘোষণার পর এখন সামনে আসছে রাষ্ট্রপতি পদের নির্বাচন কীভাবে হয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এ পদে প্রার্থী হতে কী কী যোগ্যতা লাগে এবং কারা ভোট দেবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট গ্রহণ হয় সংসদকক্ষে। অর্থাৎ যেখানে সংসদ অধিবেশন চলে, সেখানেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ নির্বাচনে ‘নির্বাচনী কর্তা’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতি হওয়ার যোগ্যতা–অযোগ্যতা

সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কারা অংশ নিতে পারবেন না, এর উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে—কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি ৩৫ বছরের কম বয়স্ক হন; অথবা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য না হন; অথবা কখনো সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হয়ে থাকেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে হলে কোনো ব্যক্তিকে অন্তত ৩৫ বছর বয়সী হতে হবে, থাকতে হবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া বা সদস্য পদে থাকার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন না, যদি তিনি আদালত কর্তৃক অপ্রকৃতিস্থ ঘোষিত হন, দেউলিয়া হয়ে দায়মুক্ত না হন, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ বা আনুগত্য স্বীকার করেন, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে অন্তত দুই বছরের কারাদণ্ড পেয়ে মুক্তির পাঁচ বছর না পেরোয়, ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশে দণ্ডিত হন, লাভজনক সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকেন বা আইন অনুযায়ী নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হন।

আরও পড়ুন
বঙ্গভবন
ফাইল ছবি

এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচন–সংক্রান্ত আইন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্যতার বিষয়ে আরও কিছু বিষয় বিস্তারিত বলা আছে। এসব অযোগ্যতা থাকলেও কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না।

সংবিধান ও আইন অনুযায়ী যোগ্য বিবেচিত হওয়ার পরও যে কেউ চাইলেই রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে পারেন না। ১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তির মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন সংসদ সদস্য। মনোনয়নপত্রে প্রস্তাবক হিসেবে ওই সংসদ সদস্যের সই থাকতে হবে। সমর্থক হিসেবে অন্য আরেকজন সংসদ সদস্যের সই থাকতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য মনোনীত ব্যক্তির সম্মতি আছে, এমন সই করা (প্রার্থীর সই) বিবৃতিতে থাকতে হবে।

আরও পড়ুন

রাষ্ট্রপতির ভোট করতে কি সংসদ অধিবেশন দরকার

মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর আলোচনায় আসে যে সংসদের আগামী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন হবে। তখনই প্রশ্ন আসে সংসদ অধিবেশন ছাড়া কি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা যায় না?

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন চলমান থাকার বাধ্যবাধকতা নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা আছে, সংসদ অধিবেশনের বাইরে অন্য কোনো সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে ভোটের দিন ঠিক করবে নির্বাচন কমিশন। ভোট গ্রহণের দিনে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করা হবে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন সিইসি। এই ব্যবস্থা শুধু এক দিনের জন্য। অন্য সময় অধিবেশনকক্ষে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার।

জাতীয় সংসদ ভবন
ফাইল ছবি

যেভাবে ভোট গ্রহণ

আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। একজন সংসদ সদস্য একটি ভোট দিতে পারবেন। ভোট গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশন আগেই প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করবে। প্রতিটি ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। কাউন্টার ফয়েল বা চেকমুড়িতে প্রত্যেক ভোটারের নাম ও স্বাক্ষরের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকবে।

প্রতিটি ব্যালট পেপারের আউটার ফয়েলে (যেখানে ভোট দেন ভোটার) রাষ্ট্রপতি পদের প্রার্থীদের নাম আদ্যক্ষর অনুযায়ী ক্রমানুসারে মুদ্রিত থাকবে। এর পাশে সংসদ সদস্য অর্থাৎ ভোটার তাঁর পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট সম্পন্ন করবেন।

আরও পড়ুন

অতীতে দেখা গেছে, সংসদে ক্ষমতাসীন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে বিরোধী দল রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়ন দেয় না। কারণ, ভোট হলেও বিরোধী দলের প্রার্থীর জেতার সম্ভাবনা নেই। এবার সংসদে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। আরও আছে জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) আরও কয়েকটি দল। বিরোধী দল প্রার্থী মনোনয়ন না দিলে নতুন রাষ্ট্রপতি পেতে ২০ আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইনে বলা আছে, মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাই শেষে মাত্র একজনের মনোনয়ন বৈধ থাকলে নির্বাচন কমিশনার ওই ব্যক্তিকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করবেন।

সে হিসাবে যদি একক প্রার্থী থাকেন, তাহলে ১৬ আগস্টই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে যাবেন। একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে যদি পরবর্তী সময়ে একজন বাদে বাকিরা প্রত্যাহার করে নেন, তাহলেও একক প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা করা হবে।

আরও পড়ুন