সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ নিয়ে বিরোধ, অতীতে কে কতটি পেয়েছে
অতীতে বিরোধী দলে থাকতে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছিল বিএনপি। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগও যখন বিরোধী দলে ছিল, একই দাবি করেছিল। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেই দাবি পূরণে উদ্যোগী হয়নি কোনো দলই। সপ্তম সংসদে বিএনপি চেয়েছিল আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটির সদস্যপদ। অষ্টম সংসদে আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল ১০টি কমিটির সভাপতি পদ। প্রায় তিন দশক পরও সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি রাজনৈতিক সমঝোতা ও ক্ষমতাসীন দলের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।
সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সরকারি ও বিরোধী দলের টানাপোড়েনের একটা বড় কারণ ছিল সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ বণ্টন। জুলাই জাতীয় সনদের প্রস্তাব অনুসারে বিরোধী দল ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ দাবি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তারা পেয়েছে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ।
অতীতের বিভিন্ন সংসদেও এ নিয়ে বিরোধ হয়েছে। কখনো বিরোধী দল কমিটিতে প্রতিনিধি দেওয়া থেকে বিরত থেকেছে, কখনো সংসদ বর্জন করেছে। আবার রাজনৈতিক সমঝোতার পর কমিটিতে যোগ দিয়েছে। তবে বিরোধী দলকে আনুপাতিক হারে সদস্য ও সভাপতি পদ দেওয়ার কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এবারের বিরোধ যেখানে
চলতি সংসদে ৫০টি স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বিষয়ভিত্তিক কমিটি ১১টি ও মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি ৩৯টি। সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে।
বিরোধী দলের দাবি ছিল, জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুসারে তাদের ১০টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটিসহ মোট ১৪টি কমিটির সভাপতি পদ পাওয়ার। তবে সরকারি দলের পক্ষ থেকে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধি না দেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়। সরকারি দলের বক্তব্য, এবার অতীতের রীতি অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন হলে জুলাই সনদের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হবে। যদিও সব কমিটিতেই বিরোধী দলের একাধিক সদস্য রাখা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিগুলো ১০ সদস্যের। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এসব কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। সভাপতি হন বেসরকারি সদস্যরা, অর্থাৎ মন্ত্রী নন এমন সংসদ সদস্যরা। বিষয়ভিত্তিক কয়েকটি কমিটির সভাপতি পদাধিকারবলে নির্ধারিত।
অন্য কমিটিগুলোর সভাপতি কোন দল থেকে হবেন কিংবা সদস্য কোন দলের কতজন থাকবেন, তা সংবিধান বা সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। সংসদে কণ্ঠভোটে কমিটি গঠিত হয়। ফলে এ ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারি দলের সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পায়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ সভাপতি পদ
আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জাতীয় সংসদের প্রধান কাজ। দুই ক্ষেত্রেই সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজ পর্যালোচনা এবং অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করতে পারে। বিল পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সুপারিশ করাও সংসদীয় কমিটির কাজ।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন দেশে সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে পদ দেওয়া প্রচলিত রীতি। সভাপতি কমিটির সব সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, এমন নয়। তবে সাধারণত সরকারি দলের সংসদ সদস্য সভাপতি হলে মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অনেক বিষয় আলোচনায় আনতে চান না। সরকারি দলের সদস্যদেরও কমিটিতে খুব একটা উদ্যোগী হতে দেখা যায় না। বিরোধী দল থেকে সভাপতি করা হলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসার সুযোগ বাড়ে।
সপ্তম সংসদে পরিবর্তন ও বিরোধ
১৯৯১ সালে গঠিত পঞ্চম সংসদে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি হতেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, মন্ত্রী নিজেই সভাপতি হলে কমিটি নির্বাহী বিভাগের ওপর কতটা নজরদারি করতে পারবে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
১৯৯৬ সালে গঠিত সপ্তম সংসদে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধন করে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রীদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ বন্ধ করা হয়। তবে ওই সংসদেই কমিটিতে বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
কার্যপ্রণালি বিধি সংশোধনের বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে গঠিত ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটিতে বিএনপির ৩ জন সদস্য ছিলেন। তখন বিএনপির মূল দাবি ছিল দুটি—সংসদীয় কমিটি ১২ সদস্যের করা এবং সংসদে আসনসংখ্যার অনুপাতে কমিটিতে সদস্য রাখার বিধান করা। ১৯৯৭ সালের ১৪ মে বিশেষ কমিটি যে প্রতিবেদন জমা দেয়, তাতে এই দুটি দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
ওই বছরের ১০ জুন সংসদে প্রতিবেদনটি পাস হয়। দাবি না মানার প্রতিবাদে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সেদিন সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। এরপর কয়েকটি কারণে দীর্ঘদিন সংসদ বর্জন করে দলটি। এর একটি ছিল সংসদীয় কমিটিতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি।
১৯৯৭ সালের নভেম্বরে সংসদীয় কমিটি গঠন শুরু করে আওয়ামী লীগ। তখন স্থায়ী কমিটি ছিল ৩৫টি। শুরুতে বিএনপি কমিটির সদস্য হিসেবে কারও নাম দেয়নি। পরে ১৯৯৮ সালের মার্চে দুই দলের দীর্ঘ বৈঠকে কয়েকটি বিষয়ে সমঝোতা হলে সংসদে ফেরার ঘোষণা দেয় বিএনপি।
ওই বছরের ১২ মে ৩৫টি সংসদীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হয়। কমিটিগুলোতে বিএনপিকে মোট ১১১টি সদস্যপদ দেওয়া হয়। তবে কোনো কমিটির সভাপতি পদ পায়নি দলটি।
অষ্টম সংসদে ভূমিকা বদল, বিরোধ একই
২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। বিরোধী দলে যায় আওয়ামী লীগ। এবারও সংসদীয় কমিটি নিয়ে দুই দলের তীব্র মতবিরোধ হয়। কমিটিগুলো পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতেও দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
ওই সংসদে আওয়ামী লীগ আসনসংখ্যার অনুপাতে ১০টি সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দাবি করে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি যুক্তি দেয়, আগের সংসদে তাদের ১১৬ জন সদস্য থাকলেও আওয়ামী লীগ কোনো কমিটির সভাপতি পদ দেয়নি।
অষ্টম সংসদে কমিটি গঠনের সময় আওয়ামী লীগের জন্য কিছু সদস্যপদ খালি রাখা হয়েছিল। তবে দলটি দীর্ঘদিন কমিটি বর্জন করে। ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগ সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধি দেয়। কিন্তু ওই সংসদেও বিরোধী দল কোনো কমিটির সভাপতি পদ পায়নি।
পরের সংসদগুলোতে কী হয়েছিল
পরবর্তী সময়ে বিরোধী দলকে একাধিক সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার নজির আছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ২০১৮ সালের ১৭ মে প্রকাশিত ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবম সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি থেকে দুটি এবং অন্য বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছিল। দশম সংসদে বিরোধী দল থেকে একটি কমিটির সভাপতি করা হয়।
একাদশ সংসদে সরকারি হিসাব কমিটির পাশাপাশি আরও তিনটি কমিটির সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছিল বিরোধী দলকে। সেগুলো হলো প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ মনে করেন, বিরোধী দল থেকে আনুপাতিক হারে সংসদীয় কমিটির সভাপতি করা উচিত। তিনি বলেন, বিএনপি এবার আনুপাতিক হারে বিরোধী দলকে সভাপতি পদ দিলে নিজেদের ভবিষ্যতের পথও খুলে যেত। একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে এখন যে দূরত্ব, তা-ও অনেকটা কমে আসত।
