যুদ্ধাপরাধীদের নামে জাতীয় সংসদে শোকপ্রস্তাবের নিন্দা ও প্রতিবাদ

জাতীয় সংসদ অধিবেশনফাইল ছবি

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া যুদ্ধাপরাধীদের নামে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শোকপ্রস্তাব গ্রহণ করার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এটিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও বর্বর নির্যাতনের শিকার কয়েক লাখ নারীর আত্মত্যাগের সঙ্গে চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে উল্লেখ করেছে দলটি।

আজ শুক্রবার সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ‘একাত্তরে গণহত্যা, গণধর্ষণ ও যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়িত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, তাদের মতাদর্শ ও উত্তরাধিকার বহন করা ব্যক্তিবর্গ এবং বিভিন্ন দলে থাকা তাদের তল্পিবাহক গোষ্ঠীর লোকেরা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে আসন গ্রহণ করে দণ্ডিত ঘাতক-যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে, তা ক্ষমার অযোগ্য। দেশের মানুষ এটা কখনোই ভুলবে না।’

শোকপ্রস্তাব থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নাম প্রত্যাহারের দাবি বাসদের

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। একই সঙ্গে শোকপ্রস্তাব থেকে যুদ্ধাপরাধীদের নাম এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করার দাবি জানিয়েছে দলটি। বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এক বিবৃতিতে এ দাবি জানিয়েছেন।

বিবৃতিতে ফিরোজ রশীদ বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শোকপ্রস্তাব গ্রহণকালে সরকারদলীয় চিফ হুইপ গণহত্যার সহযোগী স্বীকৃত রাজাকার-যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোকপ্রস্তাব গ্রহণের কথা বলেন। পরবর্তী সময়ে আমরা হতবাক হয়ে দেখলাম, সংসদের স্পিকার কর্তৃক তা গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত গণচেতনাকে পদদলিত করার এক কলঙ্কময় নজির স্থাপিত হলো। দেশের আপামর জনগণ এ ঘটনাকে মুক্তিযুদ্ধ ও ৩০ লক্ষ শহীদদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা বলে মনে করে এবং ধিক্কার জানায়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘এ ঘটনায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ গত ৫৪ বছরে এই ভূখণ্ডে সংঘটিত গণ–আন্দোলনের চেতনাসমূহকে পদদলিত করা হয়েছে। ৫ আগস্ট–পরবর্তী বাংলাদেশে প্রত্যাশা ছিল এই নাটকের অবসান ঘটবে।’

উদীচীর নিন্দা

শোকপ্রস্তাবের নিন্দা জানিয়ে ক্ষোভের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একই সঙ্গে জাতীয় সংগীতের সময় উঠে না দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংগীতের অবমাননা করেছেন অভিযোগ করে তাঁদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

এক বিবৃতিতে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষে যাঁদের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে এবং যাঁরা দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন সেই সব কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, রাজাকারদের নাম জাতীয় সংসদের শোকপ্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা শুধু ইতিহাস কলঙ্কিত করা নয়, বরং মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতিও চরম অবমাননা। জাতীয় সংসদ দেশের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। সেখানে এমন একটি কাজ দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেয়।’

উদীচী নেতারা আরও বলেন, জাতীয় সংগীতের প্রতি অবমাননাকর আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জাতীয় সংগীত শুধু একটি গান নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আত্মত্যাগ ও জাতিসত্তার প্রতীক। এ ধরনের আচরণ দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং জাতির মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে। জাতীয় সংগীতের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে সাংবিধানিকভাবেও বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

৪১ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতি

মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত রাজাকারদের প্রতি শোকপ্রস্তাব উত্থাপনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ৪১ জন কবি, লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, উন্নয়নকর্মীসহ বিভিন্ন পেশার ব্যক্তি। আজ এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘অবিলম্বে জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণী থেকে এই শোকপ্রস্তাবের অংশটুকু প্রত্যাহার করার জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে সংসদ বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিতর্কিত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

আরও পড়ুন