বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস অসুস্থ, তিনি চিকিৎসার জন্য রয়েছেন বিদেশে। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর ছড়িয়েছে যে তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হয়েছে। তবে যাচাই করে এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।
গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মির্জা আব্বাস ঢাকা–৮ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রটানো হচ্ছে। দাবি করা হয়, মির্জা আব্বাস শপথ গ্রহণ না করায় সংবিধান অনুযায়ী তাঁর আসন বাতিল হয়ে গেছে। আবার ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কিছু পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ‘সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থিত না হলে আসন শূন্য হয়।’
১ লাখ ৩০ হাজার অনুসারী থাকা ‘সাইবার কমিউনিটি’ নামের একটি ফেসবুক পেজে এ–সংক্রান্ত একটি পোস্ট ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার প্রতিক্রিয়া পড়েছে।
এই বিষয় নিয়ে জানতে সাইবার কমিউনিটি পেজটির পরিচালক সাকিব আহমেদ তুহিন প্রথম আলোকে বলেন, আমরা সংবিধান থেকে এই তথ্য সংগ্রহ করে পোস্ট দিয়েছি। সংবিধানে উল্লেখ করা বিষয়টি পোস্টের মন্তব্যর ঘরে পিনআপ করে দিয়েছি।’
বক্তব্য নেওয়ার পর পেজটিতে গিয়ে দেখা যায়, পোস্টটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে এবং সেখানে ভিন্ন এক পোস্ট। তবে মন্তব্যর ঘরে সংবিধানের তথ্যসূত্র উল্লেখ রয়ে গেছে।
লিংক এখানে
আরেকটি পোস্টে দাবি করা হয়, অসুস্থতার কারণে মির্জা আব্বাস ৯৫ দিনেও শপথ নিতে পারেননি। একই ধরনের দাবি করে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী পরিচয় দেওয়া মশিউর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইলে লেখেন, ‘ঢাকা-৮ আসন এখন আনুষ্ঠানিকভাবেই শূন্য। সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ না করায় আসনটি খালি ঘোষণা করা হয়েছে।’
পোস্টে একটি ফটোকার্ড ব্যবহার করা হয়। যেখানে মির্জা আব্বাসের সঙ্গে নির্বাচনে ওই আসনে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ছবি ব্যবহার করে লেখা হয়, ‘ঢাকা-৮ আসন শূন্য হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে শপথ গ্রহণ না করলে আসন শূন্য হয়। পরবর্তীতে ঢাকা-৮ আসনে কাকে এমপি হিসেবে দেখতে চান?’
৭৫ হাজার অনুসারীর পেজ ‘মাইন্ডলেয়ারস’ এআই দিয়ে তৈরি ২০ সেকেন্ডর একটি ভিডিও পোস্ট করে। যেখানে একজন মানুষকে বলতে দেখা যায়, ‘কী খবর ঢাকা–৮ নিবাসী, সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে কোনো সংসদ সদস্য সংসদে উপস্থিত না হলে ওই আসনে উপনির্বাচন দেওয়ার কথা। মির্জা আব্বাসের তো নব্বই দিন পার হয়ে গেছে, সংসদে উপস্থিত হন নাই। এখন এই আসনে উপনির্বাচন দেওয়ার কথা। সংবিধান বিশেষজ্ঞ সালাউদ্দিন আহমেদ কী বলবেন এখন। নির্বাচন দিবেন কি না, আমরা সেদিকে তাকিয়ে আছে।’
ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা ‘ঢাকা-৮, আসন শূন্য হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদে উপস্থিত না হলে আসন শূন্য হয়।’
অনুসন্ধানে দেখা যায়, অন্তত ৫০টির বেশি ব্যক্তিগত প্রোফাইল ও ফেসবুক পেজ থেকে একই দাবি প্রচার করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র দিলে তাঁর আসন শূন্য হবে। নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদের প্রথম বৈঠকের তারিখ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে শপথ বা নিলেও আসন শূন্য হবে। তবে এই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে স্পিকার যথার্থ কারণ পেলে সময়সীমা বাড়াতে পারবেন।
দাবি করা হচ্ছে, মির্জা আব্বাস শপথ নেননি। কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি যখন শপথ নেন, তখন ঢাকা–৮ আসন থেকে নির্বাচিত মির্জা আব্বাসও শপথ নিয়েছিলেন। এ বিষয়ে একাধিক মূলধারার সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
লিংক: এখানে
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, শপথ গ্রহণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মির্জা আব্বাস। তিনি বলেন, ‘দেশবাসীর প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, তারা তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করে সংসদে পাঠাতে পেরেছে। আমি তাদের প্রতিনিধি হয়ে অত্যন্ত আনন্দ ও গর্বিত বোধ করছি।’
এ ছাড়া বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল ও সংবাদমাধ্যমে তাঁকে সংসদ ভবনে প্রবেশ করতে এবং শপথ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।
কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হলে সেই ঘোষণা আসে নির্বাচন কমিশন থেকে, তারপর উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ঢাকা–৮ আসন শূন্য হওয়া সংক্রান্ত কোনো খবর সংবাদমাধ্যমে আসেনি, নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত ১২ মার্চ সংসদ অধিবেশন শুরুর আগের দিন ১১ মার্চ ইফতারের সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মির্জা আব্বাস। পরে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়ায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
মির্জা আব্বাসের সংসদে অনুপস্থিতির ৯০ দিনও অতিক্রান্ত হয়নি। সুতরাং ঢাকা–৮ আসন শূন্য ঘোষণা হয়েছে দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত খবরটি মিথ্যা।