আগে রওশন এরশাদের বিবৃতি পাঠাতেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার একান্ত সচিব মো. মামুন হাসান। এখন সংসদ ও দল–সম্পর্কিত সব বিজ্ঞপ্তি-বিবৃতি আসছে রওশন এরশাদের রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহর নামে। এ কারণে রওশন এরশাদের নামে পাঠানো বিবৃতি বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিগুলো আদতে তাঁর কি না, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের অনেকের মধ্যে সংশয়-সন্দেহ আছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ব্যাংককে চিকিৎসাধীন রওশন এরশাদ ও তাঁর সঙ্গে থাকা ছেলে সাদ এরশাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে পাওয়া যায়নি।

আজ গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ ১২ জন নেতার নাম উল্লেখ করে তাঁদের দলে অন্তর্ভুক্ত করতে জি এম কাদেরকে ‘আদেশ’ দেন। এই নেতারা হলেন সদ্য অব্যাহতি পাওয়া প্রেসিডিয়াম সদস্য মসিউর রহমান (রাঙ্গা) ও সাবেক সংসদ সদস্য জিয়াউল হক মৃধা, এর আগে দল থেকে বাদ পড়া সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য আবদুল গাফফার বিশ্বাস, এম এ সাত্তার, দেলোয়ার হোসেন খান, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, কাজী মামুনুর রশিদ ও ইকবাল হোসেন, সাবেক উপদেষ্টা মাহবুবুল আলম, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ও নুরুল ইসলাম নুরু।

বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদ বলেন, ‘এঁদেরসহ দেশজুড়ে অব্যাহতিপ্রাপ্ত, বহিষ্কার ও নিষ্ক্রিয় করে রাখা সব নেতা-কর্মীকে এই আদেশ জারির পর হতে যার যার আগের পদ-পদবিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলো।’

জাপার চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়ে এসব নেতাকে দলে অন্তর্ভুক্ত করার ‘আদেশ’ দেওয়ার পর একই চিঠিতে সবাইকে যাঁর যাঁর আগের পদ-পদবিতে ‘অন্তর্ভুক্ত করা হলো’ বলে উল্লেখ করেন রওশন এরশাদ। ফলে রওশনের এ সাংঘর্ষিক বক্তব্য নিয়ে দলে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এ বিষয়ে জাপার চেয়ারম্যান জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘রওশন এরশাদ পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, তিনি উপদেশ দিতে পারেন। সেটা রাখা না রাখা আমাদের এখতিয়ার। তা ছাড়া তিনি গঠনতন্ত্রের যে ধারার কথা স্থগিতের কথা বলেছেন, সেটি প্রথমে দলের প্রেসিডিয়ামে, পরে সম্মেলনে পাস হয়েছে। জাতীয় পার্টি যেদিন গঠন হয়, সেদিন থেকেই এ ধারা আছে, ভবিষ্যতে থাকবে। কারণ, দল চালাতে হলে এর প্রয়োজন আছে।’

সাবেক সামরিক শাসক প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিন বছর আগে এরশাদের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারম্যান হয়েছেন তাঁর ছোট ভাই জি এম কাদের। অপর দিকে দলের প্রধান পৃষ্ঠপোষকের পদে থাকা রওশন এরশাদ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার ভূমিকায় রয়েছেন। এরশাদ থাকাকালেই দলে কর্তৃত্ব নিয়ে এ দুজনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। সম্প্রতি রওশন ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় দলের সম্মেলন আহ্বান করার পর তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।  

রওশন এরশাদ প্রায় এক বছর ধরে অসুস্থ। গত বছরের নভেম্বরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে ব্যাংককে নেওয়া হয়। মাঝে এক সপ্তাহের জন্য দেশে এলেও এখনো তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন। ব্যাংককে যাওয়ার আগে আড়াই মাসের বেশি সময় গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

এ অসুস্থতার মধ্যেই গত ৩০ আগস্ট রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টির দশম জাতীয় সম্মেলন আহ্বান করে বিজ্ঞপ্তি পাঠালে দলে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। তাতে রওশন নিজেকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক এবং তাঁর রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহকে সদস্যসচিব করে আট সদস্যের কমিটির ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু কমিটির সদস্যসচিব গোলাম মসীহের জাপায় প্রাথমিক সদস্য পদও নেই। আর সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটিতে যে ছয়জন যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয়, তাঁরা জানিয়েছেন এ বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না।

৩০ আগস্ট সম্মেলন আহ্বানের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই রওশন এরশাদের নামে গণমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিবৃতি পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে রওশন নিজেকে ‘পুরোপুরি সুস্থ’ দাবি করে বিবৃতি দেওয়াসহ খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণার বিজ্ঞপ্তিও রয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর রওশন এক বিজ্ঞপ্তিতে খুলনা এলাকার এক নেতা আবদুল গাফফার বিশ্বাসকে খুলনা  সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়কের পাশাপাশি খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেন। যদিও এখন পর্যন্ত খুলনা সিটি নির্বাচনের নামগন্ধও নেই।

এদিকে রওশন এরশাদের পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহর নামেও গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে গোলাম মসীহর হাতে ফুল দিয়ে জাপায় যোগদানের ঘটনাও ঘটেছে। ৪ সেপ্টেম্বর এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, তাঁর হাতে ফুল দিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সাবেক নেতা এম এ গোফরান জাপায় যোগ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে জি এম কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘গোলাম মসীহ জাতীয় পার্টি ছেড়ে কাজী জাফর আহমদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর সঙ্গে জাতীয় পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই, দলে তাঁর সদস্য পদও নেই। এখন তাঁর হাতে ফুল দিয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেওয়া জাতিকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু না।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন