ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রায় দুই হাজার প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী আছেন ২৮৫টিতে। আর জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আছেন ২৪৩টি আসনে।
সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রথম আলো প্রতিনিধিদের সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে দলীয় প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার এ চিত্র পাওয়া গেছে।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ছিল প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। রাত ১০টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারসংক্রান্ত তথ্য জানাতে পারেনি। মোট কতজন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন, কতজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, কোন দলের কত প্রার্থী আছেন—এসব তথ্য পাওয়া যায়নি। দলীয় সূত্রে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর সংখ্যা জানা গেছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ৩০০ সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ করা হবে। একই দিনে হবে গণভোট। পাবনা ১ ও ২ আসনের নতুন তফসিল অনুযায়ী, আসন দুটিতে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় আছে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত।
বিভিন্ন জনমত জরিপের পূর্বাভাস বলছে, এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে নির্বাচনে আসন সমঝোতা করেছে বিএনপি। যে আসনগুলোতে ধানের শীষের প্রার্থী নেই সেগুলোতে সমঝোতার ভিত্তিতে শরিকদের প্রার্থী রাখা হয়েছে। আবার অনেক আসনে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ ১০টি দল নির্বাচনী ঐক্য গড়েছে। যেসব আসনে জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রার্থী নেই সেখানে নির্বাচনী ঐক্যে থাকা শরিক দলের প্রার্থী আছে।
এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ২ হাজার ৫৬৯ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার বাছাইয়ে বাদ পড়েন ৭২৩ জন। এর মধ্যে নির্বাচন কমিশনে ৪১৭ জন প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন। সব মিলিয়ে দেড় হাজারের বেশি প্রার্থী নির্বাচনে থাকছেন বলে জানা গেছে। তবে প্রত্যাহার শেষে মোট প্রার্থীর সংখ্যা এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি। প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী, ২৭৩ আসনে চূড়ান্ত প্রার্থী আছেন ১ হাজার ৬৬৭টি।
ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আজ বুধবার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করবেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। আগামীকাল থেকে শুরু হবে নির্বাচনী প্রচার।
আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ তিনটি নির্বাচনই ছিল বিতর্কিত। গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন হয়। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছরের মাথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
কোনো রাজনৈতিক দলকে দলীয় প্রতীকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে হলে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হতে হয়। বর্তমানে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৬০টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত আছে। দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
এর বাইরে নিবন্ধিত আটটি দল নির্বাচনে কোনো প্রার্থী দেয়নি। দলগুলো হলো বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি ও বাংলাদেশ জাতীয়বাদী আন্দোলন (বিএনএম)।
যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের সঙ্গে নির্বাচনে আসন সমঝোতা করেছে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, গণঅধিকার পরিষদকে দুটি, জমিয়তে ওলামা ইসলামের দুই অংশকে ৫টি ও বাকি আটটি দলকে একটি করে আসনে ছাড় দিয়েছে বিএনপি। এর মধ্যে কেউ কেউ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে জামায়াতে ইসলামীর ২৭৬ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। জামায়াতে ইসলামীসহ ১০টি দল নির্বাচনী ঐক্য গড়েছে। বেশ কিছু আসনে তাদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে দাঁড়ি পাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আছে ২১৫ টি আসনে। এই ঐক্যে থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৪৪ জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত দলটির ৩০ জন প্রার্থী নির্বাচনে লড়ছেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৯টি, খেলাফত মজলিস ১৯টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ৭টি, এবি পার্টি ৫টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৩টি এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ২টি আসনে এককভাবে নির্বাচন করবে।
আগের কোন নির্বাচনে কত প্রার্থী
বিরোধী দলের বর্জনে সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ছিল বিতর্কিত। ‘আমি-ডামির’ নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া ওই নির্বাচনে ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল। তখন ইসিতে নিবন্ধিত দল ছিল ৪৪টি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৬৯ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৫৩৩ জন, স্বতন্ত্র ছিলেন ৪৩৬ জন।
এর আগে ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৯টি দলের সব কটি অংশ নিয়েছিল। তবে সে নির্বাচনও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ভোটের আগের রাতে সারা দেশে বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার অভিযোগ ছিল। ওই নির্বাচন রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘রাতের ভোট’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ওই নির্বাচনে ২৯৯টি আসনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৬১ জন।
তার আগে ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল একতরফা। সেবার ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পেয়েছিলেন। সে সংসদের সদস্যরা ‘বিনা ভোটের এমপি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। যে ১৪৭টি আসনে ভোট হয়েছিল সেখানে প্রার্থী ছিলেন ৩৯০ জন।
এর আগে ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে নিবন্ধিত ৩৮টি দলের সবগুলো অংশ নিয়েছিল। সেবার মোট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৫৬৭ জন।
নবম সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রথা ছিল না। এর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্যে ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৭৫টি দল অংশ নিয়েছিল। ৪২৪ জন স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ৭৮৭ জন। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ছিল ৮১টি দল। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী ছিলেন ২ হাজার ৫৭৪ জন। আর ২০০১ সালের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ছিল ৫৪টি দল। স্বতন্ত্রসহ মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৯৩৯ জন।