বিশেষ সাক্ষাৎকার: মো. নাহিদ ইসলাম

ছাত্র প্রতিনিধিরা না গেলে অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা কষ্ট হতো

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান মুখ নাহিদ ইসলাম। অভ্যুত্থানের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন। বর্তমানে এনসিপির আহ্বায়কের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্ব পালন করছেন। ৫ আগস্ট সরকার পতন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ সে সময়ের নানা বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আসিফ হাওলাদার

প্রথম আলো:

কোটা সংস্কারের দাবি থেকে সরকার পতনের এক দফা। কখন প্রথম মনে হলো, এটা আর কোটা সংস্কারের আন্দোলন নেই?

নাহিদ ইসলাম: যেদিন রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হলেন, সেদিন (১৬ জুলাই, ২০২৪) আমাদের কাছে মনে হয়েছিল এই আন্দোলন আর কোটা সংস্কারের আন্দোলন নেই। সেদিনই আন্দোলনের মোড় বদলে গিয়েছিল।

প্রথম আলো:

আন্দোলনের এক পর্যায়ে আপনাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি পাঠ করানো হয়। সেই অভিজ্ঞতা আপনার ভাষ্যে শুনতে চাই।

নাহিদ ইসলাম: ডিবি কার্যালয়ে থাকা অবস্থায় একটা পর্যায়ে আমরা পরিকল্পনা করেছিলাম, সেখান থেকে যেকোনো মূল্যে বের হতে হবে। সব নেতাকে একে একে গ্রেপ্তার করা হলে আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়বে। একটা পর্যায়ে আমরা আন্দোলন স্টপ (বন্ধ) করতে রাজি হই। আমাদের চিন্তা ছিল আমরা যদি বের হতে পারি, তখন নিজেদের মতো করে স্টেটমেন্ট (বক্তব্য) দেব। কাজটা আমরা এর আগেও কয়েকবার করেছি।

তারা (ডিবি কর্মকর্তা) তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে (আসাদুজ্জামান খান) দেখানোর কথা বলে আমাদের কাছ থেকে একটা ভিডিও স্টেটমেন্ট নেয়। এটা যে গণমাধ্যম বা সারা দেশে যাবে, এ বিষয়ে আমাদের আইডিয়া (ধারণা) ছিল না। এভাবে একটা ফাঁদ তৈরি করে তারা আমাদের কাছ থেকে ওই স্টেটমেন্ট নিয়েছিল।

শেখ হাসিনার পদত্যাগ তো অনেকেই দাবি করছিল। কিন্তু শুধু শেখ হাসিনা চলে গেলেই এই রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে, তা আমরা মনে করিনি। আমরা পরিবর্তনের পক্ষে ছিলাম, শুধু ক্ষমতার রদবদল নয়।
প্রথম আলো:

ডিবি কার্যালয় থেকে বের হওয়ার পর আপনাদের ছয় সমন্বয়কের যৌথ বিবৃতিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলো। এই সিদ্ধান্তটা কীভাবে এসেছিল?

নাহিদ ইসলাম: আসলে আন্দোলন প্রত্যাহার করার কোনো ধরনের চিন্তা আমাদের মধ্যে ছিল না। ডিবি কার্যালয়ের ভেতরের বিষয়টা ছিল কৌশলগত—এটা বলে আমরা ডিবি কার্যালয় থেকে বের হব, বের হতে পারলে তখন আমরা আমাদের মতো করে আন্দোলন করব। কিন্তু তারা (ডিবি) একটা ফাঁদে ফেলে আমাদের কাছ থেকে স্টেটমেন্টটা নিয়েছে। আমরা যখন বের হয়েছি, তখন আমরা সঙ্গে সঙ্গে এটা পরিষ্কার করেছি। ভেতরেও আমরা শেষ দুই দিন অনশন করেছি। তাদের পরিকল্পনা ছিল শেখ হাসিনার কাছে আমাদের নিয়ে গিয়ে এটা দেখানো যে একটা সমঝোতা হয়েছে। তারা সেই ১৭-১৮ জুলাই থেকেই এই চেষ্টা করছিল, যাতে আমরা সরকারের সঙ্গে বসি, আলোচনা করি, আন্দোলন স্থগিত করি।

ডিবি হেফাজতে থাকাকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছয়জন সমন্বয়ক
ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া
প্রথম আলো:

৩ আগস্ট শহীদ মিনারে এক দফা ঘোষণা করলেন আপনি। সেখানে ‘শেখ হাসিনা সরকারের পতনের’ পাশাপাশি ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের’ কথাও ছিল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল, শিক্ষক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কি আপনাদের আলোচনা হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: শেখ হাসিনার পদত্যাগ তো অনেকেই দাবি করছিল। কিন্তু শুধু শেখ হাসিনা চলে গেলেই এই রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন হয়ে যাবে, তা আমরা মনে করিনি। আমরা পরিবর্তনের পক্ষে ছিলাম, শুধু ক্ষমতার রদবদল নয়। আমাদের মনে হয়েছে, যে কারণে বাংলাদেশ এই পর্যায়ে এসে পৌঁছাল, তার সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকেই একটা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের ১৬ বছরে এটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। সে কারণে আমরা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং একটা নতুন বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠা করার কথা বলেছিলাম।

সেই সময় অনেকেই বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়েছে। সেগুলো আমরা পর্যালোচনা করেছি। সবার কমন (সাধারণ) জায়গাটা ছিল শেখ হাসিনার পতন। পদত্যাগ না পতন—এ রকম একটা বিতর্কও তখন ছিল। বিএনপিসহ যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীরা ৩১ দফা কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যে মাঠে ছিল। ফলে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিটা মূল আকাঙ্ক্ষার জায়গায় চলে এসেছিল। আমরা আমাদের ভাষায় সেটাকে বলেছি ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ’।

পরে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে কারফিউ জারির ঘোষণা এল এবং আমরা খবর পেলাম মোবাইল ইন্টারনেটসহ সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হবে, ২০-২১ জুলাই যে রকম ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল। তখন মনে হলো এবার যদি ব্ল্যাকআউট করে ফেলে, আমরা তো আর ঘোষণা দেওয়ারও সুযোগ পাব না। ফলে এটিকে এগিয়ে এনে সিদ্ধান্ত হলো আমাদের ফাইনাল কল ৫ আগস্টেই হওয়া উচিত; ওই দিনই যা হওয়ার হবে।
প্রথম আলো:

আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে ৪ আগস্ট দুপুরে আপনি ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। বিকেল নাগাদ সেটি এগিয়ে ৫ আগস্টে আনার কথা জানালেন আসিফ মাহমুদ। এই সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো কারণ ছিল? এ বিষয়ে কোনো দল বা নাগরিক সমাজের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: ওই সময় আসলে অত আলোচনার সুযোগ ছিল না। বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কখনো আলোচনা হয়েছে, কখনো হয়নি; কখনো আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সবাই সেটাকে সমর্থন করেছে। ৬ আগস্ট কর্মসূচি দেওয়ার পেছনে আমাদের চিন্তাটা ছিল মানুষকে প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য একটু সময় দেওয়া। ৫ আগস্ট আমরা শ্রমিক ও নারী সমাবেশ ঘোষণা করেছিলাম। পরে ৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে কারফিউ জারির ঘোষণা এল এবং আমরা খবর পেলাম মোবাইল ইন্টারনেটসহ সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হবে, ২০-২১ জুলাই যে রকম ব্ল্যাকআউট করা হয়েছিল। তখন মনে হলো এবার যদি ব্ল্যাকআউট করে ফেলে, আমরা তো আর ঘোষণা দেওয়ারও সুযোগ পাব না। ফলে এটিকে এগিয়ে এনে সিদ্ধান্ত হলো আমাদের ফাইনাল কল ৫ আগস্টেই হওয়া উচিত; ওই দিনই যা হওয়ার হবে। ৬ আগস্ট দিলে সরকারও হয়তো প্রস্তুতি নেওয়ার সময় পেয়ে যাবে। এসব বিবেচনাতেই ‘মার্চ টু ঢাকা’ একদিন এগিয়ে আনা হয়।

যেহেতু ওই সময়টাতে আমি শাহবাগে ছিলাম, সে সময় আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া, আবু বাকের মজুমদার, মাহফুজ আলম হয়তো বিভিন্নজনের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কেরা। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে
ছবি: সংগৃহীত
প্রথম আলো:

কর্মসূচি এগিয়ে আনার ক্ষেত্রে আর কোনো চিন্তা ছিল?

নাহিদ ইসলাম: মূল বিষয় হচ্ছে, যদি আমরা আরও লেট (দেরি) করি, তাহলে হয়তো আমরা মোমেন্টামটা (গতিবেগ) মিস করব, আমরা হয়তো অর্গানাইজড (সংগঠিত) থাকতে পারব না। ৩-৪ আগস্টে আমরা আবার অর্গানাইজড হতে পেরেছিলাম। এটাকে ধরে রেখে আমাদের চূড়ান্ত কর্মসূচি দিতে হবে। এক দিন লেট হয়ে গেলে সেটা আমরা মিস করে ফেলতে পারি। এ কারণে এটা এগিয়ে ৫ আগস্টে নিয়ে আসা হয়।

প্রথম আলো:

আপনার সহকর্মী আসিফ মাহমুদ অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন, সেখানে বলেছেন আন্দোলন সশস্ত্র রূপ নিতে পারে—এই চিন্তা আপনার ও তাঁর মধ্যে ছিল; আপনি একটা ভিডিও বার্তাও প্রস্তুত করে রেখেছিলেন। সেই বার্তায় আপনি ঠিক কী বলেছিলেন? কোন পরিস্থিতি হলে সেটা প্রকাশের পরিকল্পনা ছিল?

নাহিদ ইসলাম: ৪ আগস্ট শাহবাগে আমি বলেছিলাম, যদি অস্ত্র তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হয়, সেটাও আমরা নেব। সেনাবাহিনীর ভূমিকাটা শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। সেনাবাহিনী যদি জনগণের বিপক্ষে দাঁড়ায়, তাহলে আন্দোলনটা সশস্ত্র দিকে যাবে। আমরা আন্দোলনে অহিংস অসহযোগ কর্মসূচি রেখেছিলাম। কিন্তু যদি চূড়ান্ত পর্যায়ে মনে হয়, আমরা সহিংস বা সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দেব—এই পরিকল্পনা আমাদের ছিল।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

সেই বার্তাটা কী ছিল? সেই ভিডিও বার্তা আপনার সংগ্রহে এখনো আছে?

নাহিদ ইসলাম: ৫ আগস্ট রাস্তায় বের হওয়ার আগে আমরা জানতাম না সেদিন সেনাবাহিনী কী ভূমিকা নেবে। বার্তা এটাই ছিল—আমরা অহিংস অসহযোগ আন্দোলন করছি। যদি আজ (৫ আগস্ট, ২০২৪) আমাদের ওপর গুলি চালানো হয়, যদি গণহত্যা করা হয়, তাহলে আপনারা আপনাদের জায়গা থেকে যদি অস্ত্র তুলে নেওয়ারও প্রয়োজন হয়, আমরা সশস্ত্র আন্দোলনের ডাক দিচ্ছি, আপনারা প্রতিহত করবেন। তবে সেই ভিডিও বার্তাটা এই মুহূর্তে কোথায় আছে, জানি না।

৫ আগস্ট ২০২৪
প্রথম আলো:

সরকার পতনের দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট আপনার দিনটা শুরু হলো কীভাবে? শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার খবরটা আপনি নিজে প্রথম কীভাবে, কখন নিশ্চিত হলেন? খবর পাওয়ার পর আপনার প্রথম প্রতিক্রিয়াটা কেমন ছিল?

নাহিদ ইসলাম: ৪ আগস্ট রাতে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বাসায় ছিলাম। ৫ আগস্ট সকাল থেকে আমরা খোঁজ নিচ্ছিলাম দেশের কী পরিস্থিতি, বিশেষত ঢাকার কী পরিস্থিতি। আমাদের পরিকল্পনা ছিল আমরা শাহবাগে অবস্থান করব, শাহবাগ থেকে আমরা পরবর্তী করণীয় বিষয়ে নির্দেশনা দেব। শুনতে পেলাম যে শাহবাগ, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ ওই পুরো এলাকায় সেনাবাহিনী আছে এবং মানুষজনকে আসতে দিচ্ছে না।

ধানমন্ডি এলাকার ওই বাসা থেকে আমি কয়েকবার বের হতে চাইলেও আমাদের সহযোদ্ধারা আমাকে বের হতে দেয়নি। যখন শাহবাগ ক্লিয়ার (পরিষ্কার) হয়েছে, সেনাবাহিনী সরে গেছে, মানুষজন অবস্থান নিয়েছে, তখন আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে। বাসা থেকে শাহবাগে আসি দুপুর ১২টার দিকে। আমি যাঁর বাসায় ছিলাম, তিনি গাড়িতে করে আমাকে যতটুকু সম্ভব পৌঁছে দিয়েছিলেন।

শাহবাগ থেকে আমরা যখন ফার্মগেট অভিমুখে মিছিল শুরু করে বাংলামোটর পার হই, তখন বেলা দেড়টা বা দুইটা নাগাদ শেখ হাসিনার পলায়নের খবর পাই। কয়েকজন সাংবাদিকের মাধ্যমে খবরটা পাই। অনেক নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে খবর আসার পরও গণভবন বা সংসদ ভবন পর্যন্ত গিয়ে নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত আমার কাছে মনে হয়েছে এটা একটা ফাঁদও হতে পারে। শেখ হাসিনার দ্বারা এটা করা সম্ভব। এ জন্য এখনই মাঠ ছেড়ে দেওয়া বা আনন্দ উদ্‌যাপন করা যাবে না। আবার সরকার চলে গেলে কী হবে, সেটাও আমাদের মাথায় ছিল।

শেখ হাসিনা সরকারপ্রধানের পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে যান। ৫ আগস্ট, ২০২৪
ছবি: সংগৃহীত
প্রথম আলো:

জানা যায়, ৫ আগস্ট দুপুরের পর থেকে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ফোন করে জানাচ্ছিল, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বসতে চায়, আপনাদেরও খোঁজা হচ্ছে। এ বিষয়ে কিছু বলবেন?

নাহিদ ইসলাম: আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। অন্তত আমার সঙ্গে হয়নি। ক্যান্টনমেন্টে কেন যাব—এটা আমাদের মাথায় আসেনি। ক্যান্টনমেন্টে যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠক হচ্ছে, এটা আমি জানতে পারি একদম রাতের বেলা। সেনাপ্রধান বক্তব্য দিচ্ছেন, এটা শুনেছি। কিন্তু আমরা চ্যানেল টুয়েন্টিফোরের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে একটা বিভাগে গিয়ে বসি।

প্রথম আলো:

কিন্তু সেনাসদরে তো সেদিন দেশের প্রধান প্রধান দলের নেতারা গিয়েছিলেন।

নাহিদ ইসলাম: তাঁরা গিয়ে তো ভুল করেছেন। আমাদের কাছে ক্ষমতা বা পুরো আন্দোলনের কেন্দ্রটা আসলে জনগণের ম্যান্ডেট। রাজনৈতিক দলের নেতারা মনে করেছেন ক্ষমতার কেন্দ্র ক্যান্টনমেন্ট। এ জন্য তাঁরা গিয়েছেন। অবশ্য আমাদের ডাকলেও আমরা যেতাম না। পরের দিন ক্যান্টনমেন্টে ডাকা হলেও আমরা যাইনি। সে কারণেই পরে বঙ্গভবনে গেলাম। বঙ্গভবনেও আমরা যেতে চাইনি। কিন্তু সরকার গঠনের আলোচনার জন্য শেষ পর্যন্ত সেখানে যাই।

সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে মো. নাহিদ ইসলাম। গতকাল ঢাকার সার্কিট হাউস রোডে তাঁর বাসায়
ছবি : তানভীর আহাম্মেদ
প্রথম আলো:

৫ আগস্ট রাতে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আপনাদের ভার্চ্যুয়াল বৈঠকের কথা জানা যায়। আপনারা তাঁকে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। তারেক রহমান কী বলেছিলেন?

নাহিদ ইসলাম: আমরা জাতীয় সরকার, সংবিধান সংস্কার, বিচার, দেশের পরিবর্তন—এ বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলেছি। তারা (বিএনপি) তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা অন্তর্বর্তী সরকারের কথা বলেছিল, যে সরকার তিন মাস বা ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দেবে। নির্বাচিত সরকার এসে পরিবর্তন (সংস্কার) করবে।

প্রথম আলো:

ওই আলোচনায় আর কোনো বিষয় আসেনি?

নাহিদ ইসলাম: সেই সময় আসলে এটা একটা বিজয় উদ্‌যাপনের মুহূর্ত। ওই সময় এত সিরিয়াস আলোচনা হয়নি। তিনি (তারেক রহমান) আমাদের কংগ্র্যাচুলেট (ধন্যবাদ) করেছেন, আমরাও তাঁকে বলেছি—আপনি দেশে আসুন, সবাই মিলে দেশটা গড়ি। আর ইমিডিয়েট (তাৎক্ষণিক) হিসেবে আমরা বলেছি, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে আমরা সরকারপ্রধান হিসেবে চাইছি। সরকারটা হবে জাতীয় সরকার। তাঁরা (বিএনপি) বলেছিলেন, জাতীয় সরকারে আসবেন না।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের বিজয়ের উল্লাস। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ছিল জনতার নিয়ন্ত্রণে
ফাইল ছবি: দীপু মালাকার
প্রথম আলো:

৫ আগস্ট রাতে কার্জন হলে আপনাদের বৈঠকের কথা জানা যায়।

নাহিদ ইসলাম: সেখানে অধ্যাপক আসিফ নজরুল এসেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বা বিভিন্ন বিষয়ে কিছু বার্তা দিলেন। আসলে ওই সময়ের অনেক কিছুই মনে নেই।

প্রথম আলো:

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে সরকারপ্রধান করার চিন্তাটা প্রথম আপনাদের কার মাথায় এসেছিল?

নাহিদ ইসলাম: কার মাথায় প্রথম এসেছিল, এটা এখন সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। অনেকেই দাবি করেন। তবে ৩ আগস্টের পরই অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এই যোগাযোগগুলো করতেন আসিফ মাহমুদ ও মাহফুজ আলম। ৫ আগস্টের পর যেহেতু মাহফুজ আলম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির প্রধান হয়েছেন, সরকার গঠনের পুরো সমন্বয়টা তিনিই করেছেন। আসিফ মাহমুদও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে আসিফ কথাও বলেছেন। আমি প্রথম কথা বলেছি ৫ আগস্ট সন্ধ্যায়।

প্রথম আলো:

অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে তখন আপনার কী কথা হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: আমার সঙ্গে কথা হয়েছে কয়েক মিনিট। আমি তাঁকে অনুরোধ করেছি, দেশের এই পরিস্থিতি, আমরা চাইছি আপনি দেশের হাল ধরুন, এই মুহূর্তে দেশে আপনাকে প্রয়োজন। বিস্তারিত কথা আসিফের সঙ্গে হয়।

প্রথম আলো:

অধ্যাপক ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার ক্ষেত্রে আপনাদের বিবেচনাগুলো কী ছিল?

নাহিদ ইসলাম: আমাদের কাছে অধ্যাপক ইউনূসকেই তখন সার্বিকভাবে সেরা মনে হয়েছে এবং সব পক্ষ সে সময় তাঁকে সমর্থন করেছে। ভিন্ন কোনো নামও কেউ দিতে পারেনি। অধ্যাপক ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, তিনি যেহেতু ফ্যাসিবাদের ভুক্তভোগীও ছিলেন—সেই জায়গা থেকে তাঁর নামটাই এসেছে এবং সবাই তাঁকে সমর্থন করেছে।

প্রথম আলো:

৫ আগস্ট রাত তিনটায় আপনি, আসিফ ও বাকের ফেসবুক লাইভে এসে ঘোষণা দেন—অধ্যাপক ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হতে সম্মত।

নাহিদ ইসলাম: ৫ আগস্ট যখন দেশে সরকার নেই, তখন প্রচুর প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হচ্ছিল। একধরনের এনার্কিক সিচুয়েশন (নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি)। প্রোপাগান্ডার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে একটা প্যানিক (ভীতি) ছড়িয়ে গিয়েছিল। আমাদের কাছে মনে হচ্ছিল, বিভিন্ন গোষ্ঠী তৎপরতা শুরু করেছে। তাদের নানা স্বার্থ বা উদ্দেশ্য ছিল। ওই সময় এই বার্তাটা যাওয়া খুব জরুরি ছিল যে সরকারটা কার হাতে যাচ্ছে বা কীভাবে আমরা ভাবছি। এ কারণেই আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সবাইকে জানিয়ে দিই।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শপথ গ্রহণ। ৮ আগস্ট ২০২৪
ফাইল ছবি
প্রথম আলো:

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের আপনারা তিনজন ছাত্রপ্রতিনিধি ছিলেন। আপনাদের সরকারে যাওয়ার প্রক্রিয়াটা কেমন ছিল?

নাহিদ ইসলাম: যেহেতু জাতীয় সরকার হলো না, তখন আমাদের মনে হলো অন্তর্বর্তী সরকারকে একটা রাজনৈতিক লেজিটিমেসি (বৈধতা) দেওয়ার জন্য আমাদের পক্ষ থেকে যাওয়া প্রয়োজন, ছাত্রনেতাদের সরকারে থাকা প্রয়োজন। অধ্যাপক ইউনূসের দিক থেকেও এ রকম ছিল যে ছাত্ররা থাকতে পারে। তখন আমরা সমন্বয়কেরা কয়েকজন মিলে এটা আলোচনা করি, লিয়াজোঁ কমিটির সঙ্গে কথা হয়। পরে আমরা প্রাথমিকভাবে পাঁচজনের কথা ভেবেছিলাম। আলোচনার পর সেটা দুজনে আসে। ৮ আগস্ট সকালে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে একটা বৈঠক করি। যতজন সমন্বয়ককে পাওয়া গেছে, তাঁদের সঙ্গে সেখানে কথা বলি। দুজনের বিষয়টি তাঁদের জানাই। তারপর সেদিন রাতে শপথ হলো। এর ১৫-২০ দিন পরে মাহফুজ আলম সরকারে যুক্ত হলেন।

প্রথম আলো:

৬ আগস্ট বঙ্গভবনে তিন বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে আপনাদের একটা বৈঠক হয়েছিল। সেটি সম্পর্কে বলবেন?

নাহিদ ইসলাম: সেনাপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আগেই বসেছেন। সেখানে আমরা না থাকায় কার্যকর কিছু হয়নি। আমরা তাঁদের সঙ্গে বৈঠকটা করি মূলত সরকারের রূপরেখা নিয়ে। অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে হবে, কী হবে না হবে ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে মূল আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়—সরকারপ্রধান কে হবেন? অধ্যাপক ইউনূসের নাম আসার পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বিকল্প কাউকে চাওয়া হচ্ছিল। সেটা নিয়ে অনেক আলোচনা-নেগোসিয়েশন হয়। তারপর তাঁরা অধ্যাপক ইউনূসের ব্যাপারে রাজি হন।

তাঁরা (সেনাবাহিনী) চাইছিলেন ট্র্যাডিশনাল (প্রথাগত) তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অধ্যাপক ইউনূসের যেহেতু একেবারে আওয়ামীবিরোধী একটা অবস্থান আছে, সে কারণে তাঁকে দেওয়া ঠিক হবে কি না, এ রকম কিছু আপত্তি তাঁদের ছিল। এ কারণে তাঁরা আমাদের বিকল্প ভাবতে অনুরোধ করেছিলেন।
প্রথম আলো:

অধ্যাপক ইউনূসের ব্যাপারে আপত্তির জায়গাগুলো কী ছিল?

নাহিদ ইসলাম: তাঁরা (সেনাবাহিনী) চাইছিলেন ট্র্যাডিশনাল (প্রথাগত) তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অধ্যাপক ইউনূসের যেহেতু একেবারে আওয়ামীবিরোধী একটা অবস্থান আছে, সে কারণে তাঁকে দেওয়া ঠিক হবে কি না, এ রকম কিছু আপত্তি তাঁদের ছিল। এ কারণে তাঁরা আমাদের বিকল্প ভাবতে অনুরোধ করেছিলেন।

প্রথম আলো:

বিকল্পের বিষয়ে তাঁদের দিক থেকে কোনো প্রস্তাব ছিল?

নাহিদ ইসলাম: তাঁরা সেভাবে সাজেশন দিতে পারেননি। আমরা পরে তাঁদের কনভিন্স করি। অধ্যাপক ইউনূস এলে দেশের পরিস্থিতি কীভাবে ভালো হবে, দেশে প্রয়োজনীয় সংস্কার—এসব ব্যাপারে আমরা যুক্তি তুলে ধরি।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের তালিকাটা কীভাবে তৈরি হয়েছিল? রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা বা বৈঠক হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটিতে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। সবার কাছ থেকে সাজেশন নিয়েছেন। পরে অধ্যাপক ইউনূস ঢাকার বিমানবন্দরে নামার পর তাঁর সঙ্গে কথা বলি চূড়ান্তভাবে।

প্রথম আলো:

উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে আর কার কার সঙ্গে আপনাদের আলোচনা হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: উপদেষ্টা পরিষদের পুরো দায়িত্বটা ছিল লিয়াজোঁ কমিটির। অনেক কিছুই আমার মনে নেই। কিন্তু এটা মনে আছে যে বিমানবন্দরে অধ্যাপক ইউনূস আসার পর ওখানে বসেই মোটামুটি এটা ফাইনাল হয়। তিনি ফোনে কিছু সাজেশন দিয়েছিলেন। সেগুলো নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করা হয়, ছাত্রশিবিরের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আলোচনা করা হয়। অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খানদের সঙ্গেও আলোচনা করা হয়।

প্রথম আলো:

বিমানবন্দরে বৈঠকে কী হয়েছিল?

নাহিদ ইসলাম: উপদেষ্টার যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, সেটা নিয়ে আলোচনা হয়। ওখানেই উপদেষ্টার তালিকাটা চূড়ান্ত হয়। সেই আলোচনায় কয়েকজনের নাম বাদ পড়ে। তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব সেখানে ছিলেন। তাঁকে আমরা সবার ফোন নম্বর, যাঁর যতটুকু ছিল, দিলাম। বাংলাদেশের ইতিহাসে, পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকমভাবে সরকার গঠন হয়েছে কি না...(হাসি)।

৫ আগস্ট (২০২৪) পর্যন্ত আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনো আলোচনা করিনি, অন্তত আমি করিনি। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, যেমন বিএনপির ছাত্রদল, জামায়াতের ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা তাদের দলের সঙ্গে আলোচনা করে থাকতে পারে। ৫ আগস্টের পরই প্রথম রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়।
প্রথম আলো:

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ৫ আগস্টের আগে থেকেই আপনাদের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। এ বিষয়ে আপনার ভাষ্য জানতে চাই।

নাহিদ ইসলাম: ৫ আগস্ট (২০২৪) পর্যন্ত আমরা কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কখনো আলোচনা করিনি, অন্তত আমি করিনি। ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, যেমন বিএনপির ছাত্রদল, জামায়াতের ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা তাদের দলের সঙ্গে আলোচনা করে থাকতে পারে। ৫ আগস্টের পরই প্রথম রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা হয়।

আর অভ্যুত্থানের পরে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। যেকোনো জাতীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমরা বিএনপিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই রেসপন্স (সাড়া) আমরা কখনো পাইনি। আমরা কখনো নিজেদের জন্য যাইনি। সংস্কার বা পরিবর্তনের যে বিষয়গুলো, সেগুলো বেশির ভাগ সময় তারা রিজেক্ট (বাতিল) করে দিয়েছে। ঘোষণাপত্রের (জুলাই ঘোষণাপত্র) তারা বিরোধিতা করেছে। এটা নিয়ে নাটক করেছে কয়েক মাস। সংস্কার নিয়ে একটা নাটক করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পরিবর্তন করতে দেয়নি। শেষমেশ গণভোট নিয়েও তারা প্রতারণা করেছে।

আরও পড়ুন
প্রথম আলো:

বিএনপির দিক থেকে প্রায়ই বলা হয়, তাঁরা আপনাদের শ্রদ্ধা-সম্মানের দৃষ্টিতে দেখেন...

নাহিদ ইসলাম: ব্যক্তিগতভাবে সেটা আছেই। কিন্তু ক্ষমতার যে পুনর্বিন্যাসটা আমরা করতে চাইছি, সেখানে তাদের স্বার্থে আঘাত লাগলে একবিন্দুও ছাড় দেয়নি। রাষ্ট্রকাঠামোর প্রশ্নে আমরা যেসব প্রস্তাব দিয়েছি, তার কোনোটাই মানা হয়নি। সেটার ফল বিএনপি একসময় ভুগবে।

প্রথমত, আমরা সংবিধান পুনর্লিখন করতে চেয়েছিলাম। কারণ, নতুন সংবিধানের মাধ্যমেই আসলে একটা নতুন ব্যবস্থার সূত্রপাত করা সম্ভব হতো। পরে প্রত্যেক সেক্টরের জন্য সংস্কার কমিশন করে দেওয়া হলো। এটা করা হয় আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই। এখন এসে মনে হয় সংস্কার কমিশন করাটা আসলে রং আইডিয়া (ভুল ধারণা) ছিল।
প্রথম আলো:

অন্তর্বর্তী সরকারে আপনি প্রায় সাত মাস উপদেষ্টা ছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম থেকে আরও দুজন ছাত্র প্রতিনিধি অন্তর্বর্তী সরকারে যুক্ত হয়েছিলেন। অভ্যুত্থানের সময় আপনারা যে নতুন বন্দোবস্তের কথা বলেছিলেন, সরকারে গিয়ে সেটির জন্য আপনাদের পক্ষ থেকে কী কী উদ্যোগ ছিল? ভেতর থেকে দেখা—এই সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী, সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কী?

নাহিদ ইসলাম: প্রথমত, আমরা সংবিধান পুনর্লিখন করতে চেয়েছিলাম। কারণ, নতুন সংবিধানের মাধ্যমেই আসলে একটা নতুন ব্যবস্থার সূত্রপাত করা সম্ভব হতো। পরে প্রত্যেক সেক্টরের জন্য সংস্কার কমিশন করে দেওয়া হলো। এটা করা হয় আমাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই। এখন এসে মনে হয় সংস্কার কমিশন করাটা আসলে রং আইডিয়া (ভুল ধারণা) ছিল।

যতটুকুই পরিবর্তনের কথা বলা যাচ্ছে, বর্তমান সরকারকে অ্যাকাউন্টেবল (জবাবদিহি) করা যাচ্ছে, সেটা সম্ভব হয়েছিল ৩ আগস্ট ওই কথাটা (ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও নতুন বন্দোবস্ত) বলার কারণে। অন্তর্বর্তী সরকার কিছু প্রস্তাব তৈরি করে গেছে, গণভোট করেছে। তারা রাজনৈতিক দলের ওপর প্রচুর নির্ভরতা দেখিয়েছে। এটা ভুল ছিল, নিজেদের কাজগুলো করে ফেলা উচিত ছিল। তারপর পরবর্তী সরকার এসে নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সফলতা হচ্ছে, একটা নির্বাচন হয়েছে, সংসদ আছে, একটা ট্রানজিশন (উত্তরণ) হয়েছে। বিচারকাজের শুরুটা হয়েছে। ট্রানজিশন করে যেতে পারাটা অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন। মৌলিক পরিবর্তনটা অন্তর্বর্তী সরকার করতে পারেনি।

প্রথম আলো:

আপনি বললেন সংস্কার কমিশন করাটা ‘রং আইডিয়া’ ছিল। এটা কেন বলছেন?

নাহিদ ইসলাম: নিউ সেটেলমেন্টের (নতুন বন্দোবস্ত) জন্য আমরা চেয়েছিলাম কনস্টিটিউশনাল চেঞ্জ (সাংবিধানিক পরিবর্তন) অথবা পুনর্লিখন। সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে রাজনৈতিক কাঠামোটা পরিবর্তন করে অর্থনৈতিক সংস্কারের জায়গায় যাওয়া যেত।

এনসিপির আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম
ফাইল ছবি
প্রথম আলো:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আপনার দল এনসিপি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটে গেল। জোটে নির্বাচন করে আপনারা ছয়জন সংসদে গেলেন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এই জোট সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

নাহিদ ইসলাম: এই জোট হওয়ার কারণে একটা রাজনৈতিক মেরুকরণ হয়েছে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এই যে গণভোটের পক্ষে এত ভোট পড়েছে, সেখানে এই জোটের একটা ভূমিকা আছে। বিএনপির মতো দল, তার দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা—তাকে চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স, অ্যাকাউন্টেবল (জবাবদিহি) করার জন্য আমি মনে করি এই জোটটা প্রয়োজনীয় ছিল।

প্রথম আলো:

এই জোটের সিদ্ধান্ত যখন আপনারা নেন, তখন নানা দিক থেকে সমালোচনা এসেছে, আপনাদের দল থেকে অনেকের পদত্যাগের ঘটনাও ঘটেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে আপনাদের বিবেচনাটা কী ছিল—আদর্শিক আপস, না কৌশলগত বাস্তবতা?

নাহিদ ইসলাম: এখানে আদর্শিক কোনো জায়গা নেই। এখানে সংস্কার প্রশ্নে একটা কৌশলগত ঐক্যের জায়গা তৈরি হয়েছে।

দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান সরকার দ্রুতই আগের ফ্যাসিবাদী সময়কে প্রতিস্থাপিত করেছে এবং তাদের মতোই তারা আচরণ করবে বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে সে ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
প্রথম আলো:

আপনাদের সরকারে যোগদানের সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল—সম্প্রতি আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ এমন কথা বলেছেন। আপনি কীভাবে দেখেন?

নাহিদ ইসলাম: সেটা একদিক থেকে মনে হলে তো বলা যায়, কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের টিকে থাকা তখন কষ্ট হতো।

প্রথম আলো:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ কতটা বদলাল, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনগুলো কতটা বাস্তব রূপ পেল?

নাহিদ ইসলাম: দেশের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বর্তমান সরকার দ্রুতই আগের ফ্যাসিবাদী সময়কে প্রতিস্থাপিত করেছে এবং তাদের মতোই তারা আচরণ করবে বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে সে ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আমরা চাইলাম জবাবদিহি ও ক্ষমতার ভারসাম্য, পেলাম দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা, স্থানীয় সরকারসহ সব ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হলো প্রধানমন্ত্রীর কাছে। রাষ্ট্রপতিও এখন নিয়োগ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। অনেক ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, ক্ষমতা আরও বেশি কেন্দ্রীভূত হয়েছে। এখনো বিপ্লব বা অভ্যুত্থানের একটা রেশ থেকে যাওয়ায় আমরা কিছুটা গণতন্ত্র দেখতে পাচ্ছি; কিন্তু এটা সাসটেইনেবল (টেকসই) নয়।

ক্ষমতার কাঠামোটা পরিবর্তন হয়নি, হয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। সেই নেতৃত্বের জায়গায় এখন বিএনপি এসে বসেছে। অনেক কিছুই হয়নি। তবে অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই।
প্রথম আলো:

কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া কেউ কেউ হতাশা থেকে বলছেন এই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ব্যর্থ হয়েছে।

নাহিদ ইসলাম: এর জন্য রাজনৈতিকভাবে বিএনপিকে দায়ী মনে করি। যেহেতু তারা বড় দল, তারা ক্ষমতায় এসেছে। তারা অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নেই। শেখ হাসিনার পতন পর্যন্ত তারা একমত ছিল, পরবর্তী কোনো দাবির সঙ্গে একমত ছিল না। দ্বিতীয়ত, সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী শ্রেণি, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ—তারাও পরিবর্তন চায়নি।

ক্ষমতার কাঠামোটা পরিবর্তন হয়নি, হয়তো রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে। সেই নেতৃত্বের জায়গায় এখন বিএনপি এসে বসেছে। অনেক কিছুই হয়নি। তবে অভ্যুত্থানকে ব্যর্থ বলার কোনো সুযোগ নেই। অভ্যুত্থানে নানা পক্ষ নেমেছিল, একেকজন অভ্যুত্থানকে একেকভাবে দেখে। এখন জুলাইকে নিয়ে যে যত ব্যাখ্যা দেয়, এটা তার রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ব্যাখ্যা দেওয়া। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সুবিধাভোগী আমি মনে করি রাজনৈতিকভাবে সবাই হয়েছে। বিএনপি, জামায়াত, হেফাজত, বামপন্থীদের বিভিন্ন অংশ, শিক্ষার্থী—সবাই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের কোনো না কোনোভাবে সুবিধা নিয়েছে। কেউ হয়তো স্বীকার করে না, আবার কেউ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; কিন্তু জনগণ সেই পরিবর্তনের সুফলটা পায়নি। এ জন্য মানুষের ভেতরে হতাশা আছে। আমি মনে করি, এই জায়গা থেকে নতুন কিছু আবার হবে।

প্রথম আলো:

শেষ প্রশ্ন। ৫ থেকে ৮ আগস্টের সেই চার দিনে ফিরে গিয়ে যদি একটিমাত্র সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগ পেতেন—কোনটা বদলাতেন, আর কেন?

নাহিদ ইসলাম: আমার কাছে মনে হয় না যে খুব বড় কোনো ভুল ছিল। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর বিশ্বাস না করে আমাদের নিজেদের দ্রুতই সংগঠিত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল রাজনৈতিক দল হিসেবে।

প্রথম আলো:

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নাহিদ ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।