সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ধানমন্ডিতে গতকাল সোমবার মানববন্ধন করতে গিয়ে আটক হয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল। তাঁর মুক্তির পর গত সোমবার রাতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা-কর্মীরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয়।
এরপর যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার প্রতিবাদ করেন। দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয়। পরে হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে নানা স্লোগানও দেন তাঁরা। পরে পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে, বড় সংঘাতে রূপ নেয়নি।
এভাবে একের পর এক রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, নেতাদের বাসভবন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ‘মব’ করা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের যুক্ততা পাওয়া গেলে এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও পড়ে।
ঘটনার পর সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে বলেন, লাঠিসোঁটা নিয়ে একদল ব্যক্তি নিজেদের সরকারদলীয় কর্মী পরিচয় দিয়ে পুরানা পল্টনের মুক্তিভবনের সামনে জড়ো হন। তাঁরা সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যরা অবস্থান করছেন দাবি করে প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। সিপিবির নেতা-কর্মীরা বাধা দিলে হামলা চালানো হয়। এতে কয়েকজন আহত হন।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা কার্যালয়ে অবস্থানরত কথিত নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকেন। সিপিবির নেতারা এ ঘটনাকে অবাধ রাজনৈতিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবিও জানিয়েছেন তাঁরা।
এভাবে একের পর এক রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, নেতাদের বাসভবন, রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে ‘মব’ করা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের যুক্ততা পাওয়া গেলে এর প্রভাব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরও পড়ে।
সম্প্রতি প্রথমে যুবদলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদ কার্যালয় ঘিরে রেখে চাপ প্রয়োগ করে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিএনপির নেতা-কর্মীদের কিছু না করে উল্টো জাসদ নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জাতীয় পার্টির কার্যালয় কয়েক দফা হামলা, আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় মিছিল নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এরপর কয়েক দিন দেশে কার্যত কোনো কার্যকর সরকার ছিল না। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সেই শূন্যতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কোথাও আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কোথাও অন্য প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ, প্রতিশোধ এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের ভূমিকা হয়তো ছিল।
তখন অনেকেই এসব ঘটনাকে তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখেছিলেন। কেউ কেউ আশা করেছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এমন ঘটনা বন্ধ হবে। কিন্তু দুই বছর পরও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও নেতাদের বাসায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এখন আর এসব ঘটনাকে শুধু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির ফল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা, সরকারের দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ধরন এক নয়। তবে এগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল পাওয়া যায়। প্রায় প্রতিটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী সামনে থেকেছেন। আর পেছনে তাদের পক্ষ হয়ে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। দলটিকে মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দলটির নেতারাও তাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতে সহনশীল রাজনীতির কথা বলছেন। চরমপন্থা, বিরুদ্ধ মত দলনের বাইরে গিয়ে নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলছেন। এখন বিএনপি, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করছে তারা কোন পথ বেছে নেবে।
কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই আপত্তি থেকে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা কিংবা তাঁদের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আইন ভঙ্গ করেছে কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্বও কোনো দলের কর্মীদের নয়।
সিপিবি কেন লক্ষ্যবস্তু
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের দুটি নির্বাচনে বিরোধী দল ভোট বর্জন করেছিল। সিপিবিও এই দুটি ভোটে অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগের দমন-পীড়ন, জনবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে দলটি সোচ্চারই ছিল। এমনকি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সিপিবি ও দলটির সাবেক নেতারা ছাত্র-জনতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সিপিবিকে প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি মেনে নেবেন নাকি দলটির নেতা-কর্মীদের নিবৃত্ত করবেন এটা এখন দেখার বিষয়।
সিপিবি অভিযোগ করেছে গতকাল সোমবার রাতে হামলার পর পুলিশ তাঁদের দলের দুই সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে গভীর রাতে ওই দুই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সেই আপত্তি থেকে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা কিংবা তাঁদের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আইন ভঙ্গ করেছে কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্বও কোনো দলের কর্মীদের নয়।
এর আগে সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে সোমবার বিকেলে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনাবাজারের সামনে জড়ো হয়েছিলেন তাঁরা। তবে পুলিশের বাধায় প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে পারেননি সংস্কৃতিকর্মীরা। সেখান থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এমনকি সেখানেও পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগ আছে। এখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে।
গত এক বছরে মানিকগঞ্জে, শেরপুর, সিলেটেও বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এসব ঘটনার প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে, হামলা হয়েছে। ফলে সচেতন যেকোনো নাগরিকের প্রশ্ন জাগতে পারে, তাহলে কী দেশে প্রতিবাদ নিষিদ্ধ? জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তো দেশের ছাত্র-জনতার প্রতিবাদের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে আছে। তাহলে এখন কেন প্রতিবাদ করা যাবে না?
জাসদের কার্যালয় থেকে ২৭ জন গ্রেপ্তার
গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলাকালে ২৮৯ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে তাঁদের মধ্যে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
জাসদের বক্তব্য ছিল, ঢাকা মহানগর পুলিশের অনুমতি নিয়ে ওই সভার আয়োজন করা হয়েছিল। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা প্রায় চার শ নেতা-কর্মী সেখানে অংশ নিয়েছিলেন। সভা চলাকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ে হামলা চালান বলে দলটির পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। পরে পুলিশ এসে কার্যালয় ঘেরাও করে নেতা-কর্মীদের আটক করে নিয়ে যায়। এমনকি দলটির কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় পুলিশ। পরে অবশ্য তালা খোলার জন্য জাসদ নেতাদের চাবি দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তার হওয়া ২৭ জনের মধ্যে প্রায় সবাই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযানের সময় বলেছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছেন। কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি তারা। আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তি মনগড়া ছিল কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
জাসদ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী ছিল। কিন্তু দেশের আইনে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ নয়। রাজনৈতিক দলের সভা চলাকালে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে পুলিশ ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে নির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণের ভিত্তিতে। একটি কার্যালয়ে উপস্থিত থাকার কারণে সবাইকে আটক করা কিংবা পরে তাঁদের একটি অংশকে গ্রেপ্তার করা বাড়াবাড়ি হিসেবেই দেখতে হবে।
বারবার লক্ষ্য করা হচ্ছে জাতীয় পার্টিকে
জাতীয় পার্টি এবং দলটির প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে বলা হয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে সুযোগ সন্ধানী দল ও নেতা। ২০১৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ভোট বর্জন করলে এক তরফা ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি ও দলটির নেতারা ক্ষমতার ভাগ পুরোপুরি উপভোগ করে। তাঁরা একই সঙ্গে সরকারে ও বিরোধী দলে ছিল। ‘গৃহপালিত বিরোধী দল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে দেশে। এর ফলও তারা পেয়েছে। এরশাদ বেঁচে থাকা অবস্থায় দল ভেঙেছে বহুবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও দলটি ভেঙেছে। দলটির জনসমর্থন তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এই প্রথমবার গত নির্বাচনে দলটির কেউ জয়ী হতে পারেননি। এমনকি অধিকাংশ আসনে তারা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারেনি। অথচ এক সময় দলটিকে দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
অর্থাৎ জাতীয় পার্টির অতীত ভূমিকার বিচার দেশের জনগণ ইতিমধ্যে করেছে। এরপরও তাদের কার্যালয় ও দলটির নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে একাধিকবার হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বোঝা গেছে, রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থানের কারণে কোনো দলকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সম্প্রতি জি এম কাদেরের উত্তরার বাসায় হামলার ঘটনাও সেই উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এখন বিএনপি ক্ষমতায়। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং সব দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অন্য দলের কার্যালয়ে হামলা করলে সরকার তার দায় এড়াতে পারে না। যদি দলটির ভেতর থেকে কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এগুলো করে থাকে তাহলে নীতিনির্ধারকদের উচিত এর লাগাম টানা।
রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা শুধু আক্রান্ত দলের সমস্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে পুরো রাজনৈতিক পরিবেশে। একটি দল যদি মনে করে, ক্ষমতাসীন দলের বিরোধিতা করলে তাদের কার্যালয় আক্রান্ত হতে পারে, নেতা-কর্মীরা হেনস্তার শিকার হতে পারেন, তাহলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নিচ্ছে কারা
শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর দলটির নেতাদের প্রায় সবাই আত্মগোপনে চলে যান। অরক্ষিত হয়ে পড়ে তাদের কার্যালয়, বাসাবাড়ি এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তখন ব্যাপক হামলা, ভাঙচুর এবং আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িটিতেও হামলা হয়েছিল। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণ দেওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা বাড়িটিতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন। পরে ক্রেন ও খননযন্ত্র দিয়ে বাড়িটির বড় অংশ ভেঙে ফেলা হয়। ভাঙার কাজ পরদিনও চলে। একই বছর ১৭ নভেম্বর বাড়িটির অবশিষ্ট অংশ ভাঙতে গেলে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাধা দেয়।
দুটি ঘটনাই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঘটে। এসব ঘটনায় কিছু অনলাইন অ্যাকটিভিস্টের প্ররোচনা ছিল বলে সমালোচনা আছে। তবে কারও বিরুদ্ধেই তৎকালীন সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা ও বিরোধ থাকবে। কারও বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইনে তার বিচারও হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগ বা রাজনৈতিক মতভিন্নতাকে কেন্দ্র করে কোনো দলের কার্যালয়ে হামলা, সভা–সমাবেশে বাধা কিংবা নেতা–কর্মীদের হেনস্তা করার সুযোগ নেই।
গণ–অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম বিষয় ছিল ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতা কেবল ক্ষমতাসীন দল বা তার মিত্রদের জন্য নয়, সব বৈধ রাজনৈতিক দলের জন্যই নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি এখন সরকারে। ফলে দলটির নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।
সিপিবি, জাসদ ও জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয় বরং গণ–অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তারও পরীক্ষা।
