বিএনপির সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহি

বিএনপির ইশতেহার
১. গণতান্ত্রিক সংস্কার:
১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপন।
২. অর্থনৈতিক লক্ষ্য:
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর।
৩. সামাজিক নিরাপত্তা:
দরিদ্র পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু।
৪. নারীর ক্ষমতায়ন:
স্নাতকোত্তর পর্যন্ত নারীদের বিনা মূল্যে শিক্ষা।
৫. পররাষ্ট্র:
প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
৬. জাতীয় ঐক্য:
রাজনৈতিক বিভাজন দূর করতে একটি বিশেষ ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করা।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি। ইশতেহারে রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার, বৈষম্যহীন আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও টেকসই রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা অর্জন, ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন এবং ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতিসংক্রান্ত মোট ৫১টি বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির উল্লেখ করেছে দলটি।

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দুই ঘণ্টা সময় নিয়ে ইশতেহারের বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শেষে তিনি বলেন, তিনি যত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন, তার কিছুই বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না, যদি তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দেওয়া যায়। এগুলো হলো দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন ও জবাবদিহি।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে শুক্রবার বিকেলে ইশতেহার ঘোষণা করছে বিএনপি
ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ

বিএনপি গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০০১-০৬ সময়ে স্বাধীনভাবে গণমাধ্যমে তৎকালীন সরকারকে বিভিন্ন সমালোচনা করা হয়েছে। কিন্তু এর জন্য কোনো সংস্থা থেকে পত্রিকায় ফোন করা হয়নি, যা গত ১৬-১৭ বছর দেখা গেছে। সে সময় তিনি ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করা হয়েছিল অভিযোগ করে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে যেকোনো মূল্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।’

বিএনপির নেতা-কর্মীদের গুম-খুনের শিকার হওয়া প্রসঙ্গে দলের চেয়ারম্যান বলেন, ‘যে বিভীষিকার মধ্য দিয়ে বিএনপি গেছে, বাংলাদেশে আর তার পুনরাবৃত্তি হোক, সেটা আমরা চাই না। সেটির পুনরাবৃত্তি হলে কোনোভাবেই দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। প্রতিশোধ কখনো শান্তি বা ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। সর্বস্তরে দ্রুততার সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে পারে।’

বেলা সাড়ে তিনটায় পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে বিএনপির ইশতেহার প্রকাশের অনুষ্ঠানটি শুরু হয়। এরপর বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করা হয়। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়।

প্রতিশোধ কখনো শান্তি বা ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। সর্বস্তরে দ্রুততার সঙ্গে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে পারে।
তারেক রহমান, চেয়ারম্যান, বিএনপি

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যসচিব রুহুল কবির রিজভী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে ছিলেন আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও সেলিমা রহমান।

অনুষ্ঠানে চীন, পাকিস্তান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত; যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, ইংল্যান্ডসহ ৩৮টি দেশের কূটনীতিকেরা উপস্থিত ছিলেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, শিক্ষক, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান ৯ প্রতিশ্রুতি, আছে ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড

বিএনপির ইশতেহারে নয়টি বিষয়কে ‘প্রধান প্রতিশ্রুতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম তিন প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা; কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ এবং দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ।

প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে আরও আছে প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা ও ‘মিড-ডে মিল’ চালু; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ ও মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা।

দলটির অন্য তিন প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু; ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতাদের জন্য সম্মানী চালু এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন ও ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রপ্তানি সম্প্রসারণ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিএনপির ইশতেহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের একাংশ। শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে
ছবি: প্রথম আলো

রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে প্রতিশ্রুতি

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ ও তারেক রহমানের রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা বাস্তবায়নের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদে যেসব বিষয়ে যে আঙ্গিকে ঐকমত্য ও স্বাক্ষরিত হয়েছে, সেগুলো সেভাবে বাস্তবায়ন করা হবে বলে নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করেছে বিএনপি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, স্মৃতি সংরক্ষণ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা বাড়ানো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের পরিবারকে স্বীকৃতি ও সহায়তা, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানে সহায়তা এবং জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের কল্যাণে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে বিএনপি।

সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃস্থাপন, একজন উপরাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টি, ন্যায়পাল নিয়োগসহ আরও বিভিন্ন সংস্কারের কথা ইশতেহারে বলেছে বিএনপি। এ ছাড়া ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন না বলেও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

পররাষ্ট্র-প্রতিরক্ষায় কী নীতি

বিএনপি বলেছে, পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করে এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে যাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসা হবে, অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, সেটাই করবে দলটি। ইশতেহারে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গা সংকট দ্রুত সমাধান করা বিএনপির অগ্রাধিকার। পদ্মা, তিস্তাসহ বিভিন্ন অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে বিএনপি।

ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বরদাশত করা হবে না। কোনো সন্ত্রাসবাদীকেও আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
ইশতেহারে বলা হয়, প্রতিবেশীদের সঙ্গে সমতা, সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্তে চোরাচালান, মানব পাচার ও মাদক পাচার কঠোরভাবে দমন করা হবে। দীর্ঘ মেয়াদে দেশের উন্নয়ন এবং ‘পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট’ বাড়ানোর জন্য সফট পাওয়ার কূটনীতি ও ক্রীড়া কূটনীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

ইশতেহারে বলা হয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা, সশস্ত্র বাহিনীর বিরাজনীতিকরণ ও পেশাদারত্ব জোরদার করার জন্য বিভিন্ন কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিএনপি একটি জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়ন করবে। জিয়াউর রহমানের ‘পিপলস ওয়ারফেয়ার ডকট্রিনের’ আলোকে একটি আধুনিক প্রতিরক্ষা নীতি ও ডকট্রিন প্রণয়ন করা হবে। গণতান্ত্রিক সমাজের উপযোগী সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের সুদৃঢ় কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।

ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় একটি ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠন করা হবে উল্লেখ করে দলটির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী সময়ে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সত্য উদ্‌ঘাটন করা হবে, নির্যাতন ও ক্ষতির শিকার ব্যক্তিদের অর্থবহ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা হবে এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের জবাবদিহি ও শাস্তির আওতায় আনা হবে।

জুলাই অভ্যুত্থানের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ শাসনামলে সংঘটিত গুম-খুন, মিথ্যা মামলা, নির্যাতনসহ বিভিন্ন অপরাধের দ্রুত বিচার নিশ্চিতের কথাও ইশতেহারে বলেছে বিএনপি।

দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে অগ্রাধিকার

ইশতেহারে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে প্রথম অগ্রাধিকার। বিএনপি বলেছে, আওয়ামী লীগের আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে তারা। পাশাপাশি পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’

বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হবে বলে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিএনপি ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ করবে। এর বাইরে ‘যথাসময়ে’ নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন গঠন, শক্তিশালী পিএসসি গঠন এবং বেসরকারি সার্ভিস রুল প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে দলটি।

কওমি সনদের স্বীকৃতির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সরকারি মসজিদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও ইশতেহারে বলেছে বিএনপি।

নারীদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষা

ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে পড়ালেখার সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। নারীদের কর্মস্থলে ডে-কেয়ার সেন্টার ও ‘ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার’ স্থাপন করার কথা বলেছে তারা। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নারীদের সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে বিএনপি। এ ছাড়া সব নারী শ্রমিক-কর্মচারীর সবেতন মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস নির্ধারণ করারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি।

বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, তারা ক্ষমতায় গেলে রাজনীতি, প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় নীতি প্রণয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষায়িত ‘নারী সাপোর্ট সেল’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। নারী উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও দক্ষতা সহায়তা দেওয়া হবে। মাধ্যমিক, মাদ্রাসাসহ সব সমমানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটারি ন্যাপকিনের ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ

ক্ষমতায় গেলে শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ সুদসহ মওকুফ করার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এ ছাড়া নিবন্ধিত বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) কাছ থেকে নেওয়া ক্ষুদ্রঋণের এক বছরের কিস্তি ঋণ গ্রহণকারীদের পক্ষে সরকার এনজিওগুলোকে দেবে।

বরেন্দ্র অঞ্চলের উন্নয়নে বরেন্দ্র প্রকল্প আবার চালু, আম সংরক্ষণে বিশেষ হিমাগার স্থাপন ও উত্তরাঞ্চলে কৃষি পণ্য রপ্তানি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

বিদেশে বছরে ২০ লাখ কর্মসংস্থান
ক্ষমতায় গেলে দেশব্যাপী বিদেশি ভাষাশিক্ষা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা বাড়াতে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ চালু করবে বিএনপি। দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বছরে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা এবং বিদেশে যেতে বিনা সুদে সহজ শর্তে ঋণসহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি দেশে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করা, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও সহায়তা দেবে বিএনপি।

ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব

বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে শিক্ষা খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দ করা হবে। প্রাথমিক শিক্ষায় জোর দেওয়া হবে বেশি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সমমানের শিক্ষকদের আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ, দক্ষতা অর্জনসহ সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ট্যাবলেট কম্পিউটার দেওয়া হবে। একে বিএনপি বলছে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’।

দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরিতে বাংলা-ইংরেজির পাশাপাশি আরবি, জাপানিজ, কোরিয়ান, ইতালিয়ান, মান্দারিন ইত্যাদি তৃতীয় ভাষা মাধ্যমিক পর্যায় থেকে চালু করার কথা বলেছে বিএনপি। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থী ঋণ ও ব্যাংকঋণের জটিলতা দূর করবে তারা। ক্ষমতায় গেলে শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের অঙ্গীকারও করেছে দলটি।

বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা

স্বাস্থ্য খাতে পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা ইশতেহারে বলেছে বিএনপি।  ই-হেলথ কার্ড ও বিনা মূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলেছে তারা। নাগরিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিএনপি যে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেবে, তার ৮০ শতাংশ হবেন নারী।

প্রবাসী কার্ড

এত দিন ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের কথা বললেও নির্বাচনী ইশতেহারে এগুলোর পাশাপাশি ‘প্রবাসী কার্ড’ দেওয়ার কথা বলেছে বিএনপি। এই কার্ডে প্রবাসীদের বিভিন্ন তথ্য থাকবে। এর ভিত্তিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে বাড়তি প্রণোদনা এবং দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের সামাজিক সুরক্ষা দেবে বিএনপি।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা

অর্থনীতির ক্ষেত্রে আকস্মিক বা হুটহাট করে কোনো নীতি পরিবর্তন করবে না বিএনপি। তারা ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার কথা বলেছে বিএনপি। এর মধ্যে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ হবে ২০ শতাংশ। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে কোনো গোপন চুক্তি করা হবে না বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কার্যকারিতা পুনঃপরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি তদন্ত করা হবে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যোগাযোগকারী হিসেবে কাজ করতে ‘এফডিআই ক্যাপ্টেন’ নিয়োগ দেবে বিএনপি। বেসরকারি খাতের উন্নয়নে লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করাসহ আরও নানা উদ্যোগের কথা ইশতেহারে বলেছে তারা।

ইশতেহারে বিএনপি বলেছে, চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। ঢাকার ওপর চাপ কমাতে ‘সেকেন্ডারি সিটি’ কার্যকর করা হবে।