সংরক্ষিত নারী এমপিদের পছন্দের আসন দিতে আইন করছে সরকার

জাতীয় সংসদ ভবনফাইল ছবি: জাহিদুল করিম

জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা নেই। তবে এবার তাঁদের এক বা একাধিক সাধারণ সংসদীয় আসনে ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা’ রাখার আইনি পথ তৈরি করতে যাচ্ছে সরকার। এমন উদ্যোগকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য বলছেন বিশেষজ্ঞ।

আইনি পথ তৈরির লক্ষ্যে ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশোধনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ শিরোনামের এই খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দিলে তা দ্রুত সংসদে উত্থাপন করা হবে।

লোকপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার কথা বলে এমন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। এটি সংসদ সদস্যদের কাজই নয়। তা ছাড়া সংরক্ষিত নারী সদস্যরা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার মানুষের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। তাঁদের নির্বাচনী এলাকা নেই—এটি জেনেই দলগুলো তাঁদের মনোনয়ন দিয়েছে। এখন আইন করে তাঁদের জন্য এক বা একাধিক সাধারণ আসনে দায়িত্ব দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটি বিদ্যমান প্রতিনিধিত্ব–ব্যবস্থাকে আরও দুর্বল করবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হয়ে উঠবে।

খসড়ায় বিদ্যমান আইনের ২৬–এর পর নতুন ধারা ২৬ক সংযোজনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যের ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে দায়িত্ব–কার্যাবলি বণ্টন করা যাবে। এক বা একাধিক সাধারণ আসন (কার্যক্ষেত্র) নির্ধারণ করবে তাঁর দল বা জোট। আর দায়িত্ব–কার্যাবলি ঠিক করবেন তাঁর দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, উদ্যোগটির পটভূমিতে রয়েছে বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের আসনে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্ক।

এ বিতর্কের জেরে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনী এলাকা না থাকায় সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের কাজের ক্ষেত্র ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতারা বলেন, এতে সরাসরি নির্বাচিত বিরোধী সংসদ সদস্যদের কাজে হস্তক্ষেপের পাশাপাশি সমন্বয়হীনতা ও রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হতে পারে।

উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা রাখার কথা বলে এমন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য। এটি সংসদ সদস্যদের কাজই নয়।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ, লোকপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ

আসন ঠিক করে স্পিকারকে জানাবে দল–জোট

খসড়া অনুযায়ী, সংরক্ষিত নারী আসনে নির্বাচিত কোনো সদস্যের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশের পর যেকোনো সময় তাঁর এই দায়িত্ব বণ্টন করা যাবে। যে দল বা জোটের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল বা জোট তাঁর কার্যক্ষেত্র হিসেবে এক বা একাধিক সাধারণ আসন নির্ধারণ করবে। এরপর তা লিখিতভাবে স্পিকারকে জানাবে।

এ ক্ষেত্রে স্পিকারের অনুমোদন নেওয়ার কথা নেই খসড়ায়। তাঁকে কেবল ‘অবহিত’ করার বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য সাধারণ আসন নির্ধারণের সিদ্ধান্ত তাঁর দল বা জোটের নেতৃত্বের হাতেই থাকবে।

খসড়া অনুযায়ী, সাধারণ আসনে ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে ভূমিকা’ রাখার ক্ষেত্রে সংরক্ষিত নারী সদস্যের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কার্যাবলি ঠিক করবেন তাঁর দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।

স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী সদস্যের ক্ষেত্রে সাধারণ আসন নির্ধারণসহ দায়িত্ব কীভাবে ঠিক হবে, তা উল্লেখ আছে খসড়ায়।

জাতীয় সংসদ অধিবেশন কক্ষ
ফাইল ছবি

প্রস্তাবে বলা হয়েছে, নির্দলীয় জোটভুক্ত স্বতন্ত্র সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠের লিখিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংরক্ষিত নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র হিসেবে এক বা একাধিক সাধারণ আসন নির্ধারণ করবেন স্পিকার। স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য না থাকলে সংরক্ষিত নারী সদস্য নিজেই তাঁর পছন্দের আসন উল্লেখ করে স্পিকারের কাছে আবেদন করবেন। আবেদনসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনা করে স্পিকার যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ আসনে নির্বাচিত সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সংসদীয় এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রমে সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যের ভূমিকা রাখার লক্ষ্যে দায়িত্ব–কার্যাবলি বণ্টন করা যাবে। এক বা একাধিক সাধারণ আসন (কার্যক্ষেত্র) নির্ধারণ করবে তাঁর দল বা জোট। আর দায়িত্ব–কার্যাবলি ঠিক করবেন তাঁর দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান।

খসড়ায় বলা হয়েছে, সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য এমন কার্যক্ষেত্র নির্ধারণের কারণে সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের দায়িত্ব ও অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন হবে না।

কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নেই

একজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে সর্বোচ্চ কতটি সাধারণ আসনের দায়িত্ব দেওয়া যাবে, তা খসড়ায় নির্দিষ্ট করা হয়নি।

কোনো দল বা জোট কেবল নিজেদের জেতা সাধারণ আসন থেকে সংরক্ষিত নারী সদস্যের কার্যক্ষেত্র বেছে নেবে কি না, তার উল্লেখও খসড়ায় নেই।

ফলে ক্ষমতাসীন দল বিরোধী দলের জেতা আসন, আর বিরোধী দল ক্ষমতাসীন দলের জেতা আসন নিজেদের সংরক্ষিত নারী সদস্যের জন্য বেছে নিতে পারবে কি না, খসড়ায় তা বলা হয়নি।

আরও পড়ুন

আবার একাধিক দল বা জোট নিজেদের সংরক্ষিত নারী সদস্যকে একটি (একই) সাধারণ আসনের দায়িত্ব দিলে কী হবে কিংবা কীভাবে বিরোধ মিটবে, সে বিষয়ে খসড়ায় কোনো বিধান নেই।

আইন সংশোধনের লক্ষ্য হিসেবে সাধারণ সংসদীয় আসনে ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে’ সংরক্ষিত নারী সদস্যদের ‘ভূমিকার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে খসড়ায়। কিন্তু এই ‘ভূমিকার’ মধ্যে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে, তা স্পষ্ট নয়।

সংশ্লিষ্ট দল বা জোটের সংসদীয় দলের প্রধান সংরক্ষিত নারী সদস্যের দায়িত্ব–কার্যাবলি ঠিক করবেন বলা হলেও এই ক্ষমতার সীমা খসড়ায় নির্ধারণ করা হয়নি।

একই সংসদীয় এলাকায় দুজন সদস্যের (সরাসরি নির্বাচিত ও সংরক্ষিত) ‘উন্নয়ন কার্যক্রম’–সংক্রান্ত ভূমিকা কীভাবে আলাদা হবে, তার কোনো কার্যপদ্ধতি খসড়ায় নেই। ফলে মাঠপর্যায়ে ক্ষমতার বিরোধ ও সমন্বয়ের জটিলতার আশঙ্কা থাকছে।

ক্ষমতাসীন বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদের সম্প্রতি বিভিন্ন সংসদীয় আসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়
ফাইল ছবি

এখনকার ব্যবস্থায় যা আছে

সংবিধানের ৬৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, একক আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকাগুলো থেকে জনগণের সরাসরি ভোটে ৩০০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে নারীদের জন্য ৫০ আসন সংরক্ষিত রয়েছে। তাঁরা নির্বাচিত হন সাধারণ আসনের সদস্যদের ভোটে।

‘জাতীয় সংসদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন) নির্বাচন আইন, ২০০৪’–এ সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের পদ্ধতি বলা আছে। সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে দল ও জোটের মধ্যে এই ৫০ আসন বণ্টন করা হয়। প্রতি ছয়জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হয়।

সে অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি ও স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত নারী আসন পেয়েছে।

এই সদস্যরা আইন প্রণয়ন, সংসদীয় বিতর্ক, সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে কাজ করাসহ সাধারণ সদস্যদের মতো দায়িত্ব দায়িত্ব পালন করেন। তাঁদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ–সুবিধাও সাধারণ সদস্যদের সমান।

আরও পড়ুন

সরকার–বিরোধীপক্ষের মতভেদ কোথায়

গত মাসের শুরুতে বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে বিরোধী দলের সদস্যদের ৭৯টি আসনে উন্নয়ন তদারকি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের জন্য দলটির সংরক্ষিত নারী সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। কোনো নারী সদস্যকে একটি বা দুটি, কাউকে আবার সর্বোচ্চ চারটি আসন এবং কয়েকজনকে পুরো জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়। জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), খেলাফত মজলিস, ইসলামী আন্দোলন ও বিএনপির সঙ্গে না থাকা স্বতন্ত্র সদস্যের আসনও এই বণ্টনের মধ্যে আছে।

এ সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, সরাসরি নির্বাচিত সদস্যের যেমন এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার অধিকার আছে, সংরক্ষিত নারী সদস্যদেরও তেমন অধিকার আছে।

অন্যদিকে এ সিদ্ধান্তের পর জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়, এটি নির্বাচনী এলাকায় অনর্থক সংঘাত তৈরি করবে। এই সিদ্ধান্তকে ‘অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ’ হিসেবে অভিহিত করে তারা।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, প্রস্তাবিত সংশোধনী পাস হলে শুধু বিএনপি নয়, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটও নিজেদের সংরক্ষিত নারী সদস্যদের এক বা একাধিক সাধারণ আসনে দায়িত্ব দিতে পারবে। তবে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যের কাজ কী হবে, একজন কতটি আসনে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে না দিলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

অতীতে একই আসনে সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্যদের মধ্যে বিরোধ দেখা গেছে। এমনকি এই বিরোধ সংঘাত–সংঘর্ষেও রূপ নিয়েছিল।

সরাসরি নির্বাচিত একজন সদস্যের এলাকায় আরেকজন সংরক্ষিত নারী সদস্যকে ‘উন্নয়নকাজের’ দায়িত্ব দিয়ে বসিয়ে দিলে দ্বন্দ্ব অনিবার্য বলে মন্তব্য করেন লোকপ্রশাসন–বিশেষজ্ঞ ও সংসদবিষয়ক গবেষক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ।তিনি বলেন, সে ক্ষেত্রে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, বরাদ্দ, সুপারিশের মতো বিষয়গুলো নিয়ে টানাটানি হবে। ক্ষমতাসীন দলের সংরক্ষিত নারী সদস্যকে বিরোধী দলের জেতা আসনে দায়িত্ব দেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হবে। এটি সরকার ও বিরোধী দলের সহযোগিতার জায়গা নষ্ট করবে। এ আইন করা হলে বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়বে।

আরও পড়ুন