পলাতকা শীতে মাঘ মাসের শুক্লাপক্ষে পঞ্চমী তিথির দিন সকাল সকাল স্নান সেরে নতুন হলুদ বা বাসন্তী রঙের পোশাকে সজ্জিত সনাতন ধর্মাবলম্বী সববয়সী নারী-পুরুষ দুই হাত জোড় করে শুরু করে এক অমোঘ মন্ত্রোচ্চারণ— ‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে। বীণা-পুস্তক রঞ্জিত হস্তে, ভগবতী ভারতী দেবী নমহস্তুতে।'
কিংবা ‘সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে। বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমহস্তুতে।’
এই উপমহাদেশের আদি ভাষা সংস্কৃতে লেখা এমত মন্ত্রের বাংলা অনুবাদ যথাক্রমে ‘সর্বব্যাপী পরমাত্মারূপী দেবীর জয়, যাঁর অঙ্গুলীর অগ্রাংশ দীপ্তিময় মুক্তমালা দ্বারা শোভিত, যিনি এক হস্তে বীণা ও অন্য হস্তে পুস্তক(বেদ) ধারণকারী, সেই পরমাত্মারূপী বাণীদেবীকে করজোড়ে প্রণাম।’
স্বভাবতই অঞ্জলির এই মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে রয়েছে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর অমূল্য সর্বোচ্চ অবস্থান। সরস্বতী পুজোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় বসন্তের আবাহন।
এবং ‘হে দেবী সরস্বতী, আপনি মহান ও বিদ্যাস্বরূপা। হে পদ্মলোচনা, হে বিশ্বের রূপ ধারণকারিণী, হে বিশাল দৃষ্টিসম্পন্না, আমাকে বিদ্যা দান করুন, আপনাকে প্রণাম জানাই।’
সেই পূজার্চনার সময়েই পুরোহিত মশাইয়ের মন্ত্রোচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ভক্তরাও এক সময় বলে ওঠেন ‘নমঃ ভদ্রকালৈ নমঃ নিত্যং সরস্বত্যৈ নমঃ নমঃ। বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত-বিদ্যা-স্থানেভ্য এব চ স্বাহা’ অর্থাৎ ‘ভদ্রকালীকে প্রণাম, সরস্বতীকে নিত্য প্রণাম। বেদ, বেদাঙ্গ, বেদান্ত, বিদ্যাস্থানসমূহের স্বাহা।’
স্বভাবতই অঞ্জলির এই মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে রয়েছে বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর অমূল্য সর্বোচ্চ অবস্থান। সরস্বতী পুজোর মধ্য দিয়েই শুরু হয় বসন্তের আবাহন।
বৈদিক যুগে সরস্বতী দেবীর ভূমিকার কথা প্রথম জানা যায়। সেই যুগ থেকে বিদ্যা, জ্ঞান, সংগীত এবং প্রজ্ঞার আরাধনায় তিনিই পূজিত হন। মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে তাঁকে পূজা করা হয়। এই কারণে সেই দিনটিকে বসন্তপঞ্চমী বা শ্রীপঞ্চমী তিথিও বলা হয়ে থাকে।
কীভাবে দেবী সরস্বতী আবির্ভূত হয়েছিলেন তা নিয়ে পৌরাণিক নানা কাহিনি রয়েছে। কোনো কোনো পুরাণের মতে, দেবী সরস্বতী ব্রহ্মার থেকে সৃষ্টি। ভিন্ন মতে, তিনি দক্ষের কন্যা।
আরেক মতে, বিষ্ণুর জিভের অগ্রভাগ থেকে সরস্বতীর সৃষ্টি। পুরাণ মতে দেবী সরস্বতী চতুর্ভুজা হলেও বঙ্গদেশে তিনি পূজিত হন মূলতঃ দ্বিভুজা রূপেই। তাঁর চার হাতে থাকে অক্ষমালা, পুঁথি, বীণা এবং পদ্মফুল সহকারে বরাভয়ের মুদ্রা।
প্রতিটির ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী ব্যাখ্যা আছে। অক্ষমালা হল সারস্বত সাধনায় ত্যাগ, নিষ্ঠা, সংযম ও একাগ্রতার প্রতীক। বিদ্যার প্রতীক পুঁথি বা বই, বীণা সংগীতের সুরমূর্ছনায় আনন্দের প্রতীক। অপর হাতের বরাভয় মুদ্রার মধ্যে পদ্মফুল হল শুদ্ধ জ্ঞানার্জনের জন্য নিবিষ্ট ভক্তকে দেবীর অভয় দান। দেবীর বাহনের ভিন্নতাও লক্ষ্য করা যায়।
কোথাও তিনি সিংহবাহিনী, কোথাও আবার ময়ূরবাহনা রূপে আবির্ভূত হয়েছেন। তবে বঙ্গভূমিতে তাঁকে হংস সঙ্গেই দেখা যায়। হাঁস শুধু গতির প্রতীকই নয়, জলে-স্থলে-নভোচরে তার অবাধ বিচরণ। এ যেন জ্ঞানের মতোই ভূলোক-দ্যুলোক জুড়ে বিরাজমান!
প্রখ্যাত কাশ্মীরি পণ্ডিত কলহন জানিয়েছেন ব্রহ্মা শক্তিরূপে হাঁসকে সরস্বতীর বাহন হিসেবে দান করেন। বেদে এবং উপনিষদে হংস অর্থ সূর্য। ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর এই তিন শক্তির বাহন হল হংস বা সূর্য।
এই প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে। বিদ্যা এবং জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি সরস্বতীকে জলদেবতা রূপেও পুজো করার রীতি কৃষিপ্রধান ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত। সরস শব্দের অর্থ জল।
ভারতবিশেষজ্ঞ ও ঐতিহাসিক এইচ.ডি. গ্রিসওয়াল্ড ১৮৯৭ সালে লেখা তাঁর রিলিজিয়ন অফ দ্যা ঋগ্বেদ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, সরস্বতী নদীর উপকূলে বেড়ে ওঠা আর্যরা বৈদিক সভ্যতায় এখানেই ঋগ্বেদের আদি মন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল।
সরস্বতী নদীকে আজ আর দেখা যায় না, মানুষের বিশ্বাস এই নদী এখন অন্তঃসলিলা। তাই উত্তর ভারতের এলাহাবাদের প্রয়াগে গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী নদীর সঙ্গমস্থলে আজও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেখা যায় পুণ্যস্নানের জন্য। কুম্ভমেলা সনাতন তীর্থযাত্রীদের তেমনই একটি মহাসমাগম।
বৈদিক যুগে মূর্তি পূজার চল ছিল না বলে নদীকেই দেবীর বিগ্রহ রূপে সরস্বতী নদীর তীরে মুনিঋষিরা জ্ঞানের সাধনায় বসতেন, যজ্ঞ করতেন, বেদের চর্চা করতেন। ধীরে ধীরে নদীরূপা দেবী বিদ্যার দেবীতে রূপান্তরিত হন। অনেকটা মিশরের নীলনদ এবং প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উপকূলে গড়ে ওঠা সভ্যতার মতো।
হিন্দু পণ্ডিত মদনমোহন মালব্য কাশী বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ থেকে একশো বছর আগে সরস্বতী পুজোর প্রচলন শুরু করেন। আজ সেই ট্র্যাডিশন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সনাতন ধর্মের প্রতিটি বাড়িতে শ্রীপঞ্চমী তিথিতে দেবী সরস্বতীর আরাধনা হয়ে থাকে।
তবে বিদ্যাদেবীর পুজো শুধু ভারতীয় উপমহাদেশেই হয়ে থাকে ভাবলে ভুল হবে। পঞ্চম শতকের পর বেদ-পুরাণের দেবদেবীদের ভারতের বাইরেও পূজিত হবার ইতিহাস জানা যায়। তিব্বতে বৌদ্ধরা সরস্বতী দেবীর আরাধনা করে ব্রজ নামের দেবীরূপে।
ইন্দোনেশিয়ার বালিতে জলের দেবতা হিসেবে সরস্বতী পূজিত হন। সেখানকার স্কুল-কলেজেও সরস্বতী পুজোর চল আছে বলে জানান সমাজ-বিশ্লেষক প্রাজ্ঞজন জহর সরকার।
মায়ানামারে তিনি পূজিত হন থুরাথারি রূপে, যিনি বৌদ্ধ পুঁথির রক্ষা করেন বলে তাদের বিশ্বাস। থাইল্যান্ডে সুরতস্বরী নামে তাঁকে পূজা করা হয় বিদ্যার দেবী হিসেবে। কম্বোডিয়ায় খেমের অধিবাসীদের সপ্তম শতকে পুরোনো পুঁথিতে বাগেশ্বরী দেবী রূপে সরস্বতীর আরাধনার কথা জানা যায়।
জাপানেও সরস্বতী দেবীর প্রাচীন মূর্তি পাওয়া গেছে বলে ঐতিহাসিকরা জানিয়েছেন। ইন্দোনেশিয়ার বালিতে জলের দেবতা হিসেবে সরস্বতী পূজিত হন। সেখানকার স্কুল-কলেজেও সরস্বতী পুজোর চল আছে বলে জানান সমাজ-বিশ্লেষক প্রাজ্ঞজন জহর সরকার।
পরিশেষে সরস্বতী পুজো উপলক্ষে লেখা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি গানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে এই অবসরে। ১৯০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য গিরিডিতে গিয়েছিলেন। সেখানে লেখালেখি প্রায় বন্ধই রেখেছিলেন।
একদিন কাশী সাহিত্য পরিষদের স্থানীয় গিরিডি শাখার উদ্বোধনের জন্য চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় কবিকে একটি গান লিখে দেবার অনুরোধ জানান।
কবি তাঁকে লিখেছিলেন, ‘বাণীর ওয়াড় পরাইয়া দেয়ালে লটকাইয়া রাখিয়াছি এখন গানের প্রস্তাব করিবেন না — দোহাই আপনার। একটি সরস্বতীর বন্দনা গান আমার গীত সংগ্রহে দেখিতে পাইবেন — ‘মধুর মধুর ধ্বনি বাজে / হৃদয়কমল মনোমাঝে।’ সেটাতেই যদি কাজ চালাইতে পারেন তবে উত্তম হয়।’
দীপান্বিতা দে : শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা ও প্রাবন্ধিক