সৎ ব্যবসায়ীদের ৬ পুরস্কার

ছবি: পেক্সেলস

ব্যবসা নবী–রাসুলদের পছন্দনীয় কাজ। তাঁরা ব্যবসা করেছেন। আমাদের নবীজিও জীবনের একটি সময় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মানুষের জীবিকা উপার্জনের বৈধ মাধ্যমগুলোর মধ্যে ব্যবসা অন্যতম।

ব্যবসায়ে প্রতারণা, মিথ্যা, ধোঁকা, পণ্যের দোষ গোপন করা, মিথ্যা শপথ করা কিংবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানো ইসলামের আদর্শ নয়। যে ব্যবসায়ী লেনদেনে সত্য ও ন্যায়ের পথ অবলম্বন করে, তাঁর জন্য রয়েছে ইহকাল ও পরকালের সম্মানজনক প্রতিদান।

পবিত্র কোরআন ও হাদিসে সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য যেসব পুরস্কারের কথা এসেছে, তার কয়েকটি হলো—

১. নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গ লাভ

ব্যবসায়ে লাভের আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই লাভের পথে যদি সত্য বিসর্জন দিতে হয়, তবে তা আর কল্যাণের পথ থাকে না। সততা ও বিশ্বস্ততা একজন ব্যবসায়ীকে পরকালের মর্যাদার উচ্চ আসনে পৌঁছে দিতে পারে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী (পরকালে) নবী, সিদ্দিক ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)

ক্রেতাকে ঠকিয়ে অর্জিত অধিক অর্থের চেয়ে হালাল পন্থায় অল্প উপার্জন অনেক বেশি মূল্যবান। তাই ব্যবসার হিসাব শুধু লাভ–ক্ষতির খাতায় সীমাবদ্ধ না রেখে পরকালের পাল্লাকেও সামনে রাখা উচিত।

যে ব্যবসায়ী ক্রেতার অজ্ঞতার সুযোগ নেন না এবং মুনাফার জন্য বিবেককে বিকিয়ে দেন না, তাঁর ব্যবসা পরকালীন সফলতারও একটি বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন

২. আরশের ছায়ায় আশ্রয়

কেয়ামতের কঠিন ময়দানেও সৎ ব্যবসায়ীর জন্য বিশেষ মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। নবীজি (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ব্যবসায়ী কিয়ামত দিবসে আরশের ছায়ায় থাকবে।’ (আত–তারগিব ওয়াত–তারহিব, হাদিস: ৭৯৪)

কেয়ামতের দিন মানুষ যখন নিজের নেক আমলের সামান্যতম আশ্রয়ও খুঁজে বেড়াবে, তখন আল্লাহর আরশের ছায়া হবে পরম নিরাপত্তার স্থান। সেই মর্যাদার অধিকারী হতে ব্যবসায়ীকে সততা ও বিশ্বস্ততার গুণ ধারণ করতে হবে।

৩. বেহেশতের পথ হবে প্রতিবন্ধকতাহীন

সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা একজন ব্যবসায়ীর জন্য বেহেশতের পথে এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম মাধ্যম হতে পারে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘সত্যবাদী ব্যবসায়ীর জন্য জান্নাতের দরজায় কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।’ (কানজুল উম্মাল, হাদিস: ৯২১৯)

যে ব্যবসায়ী ক্রেতার অজ্ঞতার সুযোগ নেন না এবং মুনাফার জন্য বিবেককে বিকিয়ে দেন না, তাঁর ব্যবসা পরকালীন সফলতারও একটি বড় মাধ্যম হয়ে ওঠে।

৪. প্রথম বেহেশতে প্রবেশের সৌভাগ্য

সৎ ব্যবসায়ীর জন্য আরও বিস্ময়কর পুরস্কারের কথাও বর্ণিত হয়েছে। নবীজি (সা.) ঘোষণা করেন, ‘সৎ ব্যবসায়ী প্রথম বেহেশতে প্রবেশ করবে।’ (আল–মুসান্নাফ লি ইবনি আবি শায়বা, হাদিস: ৫৩৬৫)

প্রতিবন্ধকতাহীন প্রবেশ আর প্রথম প্রবেশ—এ দুটি আলাদা মর্যাদা। এখানে শুধু বাধা মুক্তির কথা নয়; বরং অন্য সবার আগে, কাতারের অগ্রভাগে থাকার বিশেষ সম্মানের কথা বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন
এক ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে লেনদেন করত। সে যখন কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সংকটে দেখত, তখন তার কর্মচারীদের বলত, তাকে ছেড়ে দাও, হয়তো আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।
সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৮

বাজারে দাঁড়িয়েও একজন মানুষ জান্নাতের পথিক হতে পারেন, যদি তাঁর দাঁড়িপাল্লা, বাক্য, প্রতিশ্রুতি ও লেনদেন আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

৫. আল্লাহর রহমত লাভ

প্রথম চারটি পুরস্কার মূলত আখেরাতমুখী ও সততাকেন্দ্রিক। কিন্তু সৎ ব্যবসায়ীর বৈশিষ্ট্য শুধু সত্য কথা বলায় সীমাবদ্ধ নয়; কথাবার্তায় নম্রতা, লেনদেনে উদারতা ও আচার–ব্যবহারে কোমলতাও তাঁর চরিত্রের সৌন্দর্য।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ ওই ব্যক্তির প্রতি রহম করুন, যে বিক্রয়ের সময়, ক্রয়ের সময় এবং নিজের পাওনা চাওয়ার সময় উদার ও নম্র থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৬)

অর্থাৎ এখানে পুরস্কারের ভিত্তি শুধু সত্যবাদিতা নয়; বরং লেনদেনের প্রতিটি ধাপে আচরণগত নমনীয়তা।

ক্রেতার সঙ্গে অযথা কঠোরতা না করা, পণ্যের ন্যায্য মূল্য গ্রহণ করা এবং নিজের পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রেও ভদ্রতা বজায় রাখা একজন ব্যবসায়ীর উত্তম চরিত্রের পরিচয়।

৬. পাপ মাফের সৌভাগ্য

ব্যবসায়ে মানুষের সঙ্গে উদার ও সহানুভূতিশীল আচরণ শুধু আল্লাহর রহমত লাভের কারণ নয়, এটি ক্ষমা লাভেরও মাধ্যম হতে পারে। পঞ্চম পুরস্কারটি যেখানে সাধারণভাবে নম্র আচরণের কথা বলে, এই হাদিস একেবারে নির্দিষ্ট একটি দৃষ্টান্ত ঋণগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি নিয়ে তুলে ধরে।

নবীজি (সা.) বলেন, ‘এক ব্যক্তি মানুষের সঙ্গে লেনদেন করত। সে যখন কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে সংকটে দেখত, তখন তার কর্মচারীদের বলত, তাকে ছেড়ে দাও, হয়তো আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করবেন। ফলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৮)

এখানে একজন ব্যবসায়ীর জন্য গভীর শিক্ষা রয়েছে। ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু মানুষের কাছ থেকে পাওনা আদায় করা নয়; বরং সংকটে থাকা মানুষের প্রতি মানবিকতা প্রদর্শন করাও মহৎ চরিত্রের অংশ।

ব্যবসা মানুষের হাতে সম্পদ পৌঁছে দেয়, সততা সেই সম্পদে বরকত নিয়ে আসে। অতএব ব্যবসার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাত অর্জিত হওয়াই একজন মুমিন ব্যবসায়ীর আসল সাফল্য।

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

আরও পড়ুন