দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়া বললেই আমাদের চোখে ভাসে আংকর ভাটের প্রাচীন মন্দির। কিন্তু এই দেশের গভীরে লুকিয়ে আছে এক লড়াকু মুসলিম জনগোষ্ঠী—‘চাম’ মুসলিম।
এক সময় খেমার রুজ শাসনামলে (১৯৭৫-১৯৭৯) যারা চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, আজ তারা দেশটির অন্যতম অংশীদার। কম্বোডিয়ার রমজান এখন জাতীয় সংহতির এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় ইফতার: সম্প্রীতির অনন্য নজির
কম্বোডিয়ার মুসলিমরা আজ কতটা সম্মানীয়, তা বোঝা যায় দেশটির সরকারি ইফতার মাহফিল দেখলে। প্রতি বছর রমজানে সরকার প্রধানের উপস্থিতিতে বিশাল ইফতারের আয়োজন করা হয়।
এ বছর (২০২৬) রাজধানী পনম পেনে আয়োজিত সরকারি ইফতারে কয়েক হাজার মুসলিম যোগ দেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঘোষণা করেন যে, দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে মুসলিমদের জন্য আলাদা নামাজের কক্ষ তৈরি করা হবে।
মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে কম্বোডিয়া এখন ওআইসি-তে স্থায়ী প্রতিনিধি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
‘চাম’ মুসলিমদের রমজান ঐতিহ্য
কম্বোডিয়ার মুসলিমরা প্রধানত চাম নৃগোষ্ঠীর। তাদের রমজান পালনের ধরনে রয়েছে নিজস্ব সাংস্কৃতিক ছোঁয়া। শাবান মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই গ্রামগুলোতে ভোজের আয়োজন করা হয় রমজানকে স্বাগত জানাতে।
ইফতারের সময় হলে গ্রামের মানুষ রাস্তার ওপর পাটি (ম্যাট) বিছিয়ে বসে পড়েন। প্রতিটি ঘর থেকে যে যা রান্না করেছেন তা নিয়ে আসেন এবং সবাই মিলে ভাগ করে খান। একে বলা হয় সম্প্রীতির দস্তরখান।
তারাবির নামাজে মসজিদগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থাকে। এমনকি কারাগারের ভেতরে থাকা মুসলিম বন্দিদের জন্যও বিশেষ ইফতার ও নামাজের ব্যবস্থা করা হয়।
‘রমজান বাজার’: পর্যটনের নতুন আকর্ষণ
এ–বছর কম্বোডিয়া সরকার ‘কম্বোডিয়া রমজান বাজার'-কে বিশ্ব পর্যটন মানচিত্রে তুলে ধরেছে। মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার মতো এখানেও এখন বিশাল ইফতার বাজার বসে।
এখানে হালাল পানীয়, কম্বোডীয় ঐতিহ্যবাহী পিঠা এবং চাম মুসলিমদের বিশেষ খাবার পাওয়া যায়। এটি কেবল মুসলিমদের জন্য নয়, বরং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী পর্যটকদের কাছেও এক জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে।
বেদনাদায়ক অতীত
কম্বোডিয়ার মুসলিমদের আজকের এই স্বাধীনতা সহজে আসেনি। খেমার রুজ আমলে প্রায় ৩ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছিল, ধ্বংস করা হয়েছিল অসংখ্য মসজিদ। আজ সেই ধ্বংসস্তূপ থেকেই পুনর্জন্ম হয়েছে এক নতুন কম্বোডিয়ার।
তুরস্কের আইএইচএইচ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো প্রতি বছর কম্বোডিয়ার দুর্গম এলাকায় খাদ্য সহায়তা পাঠায়।
রাজধানী থেকে দূরে বাত্তামবাং বা কান্দাল প্রদেশের দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলো যখন তুরস্ক বা আরব দেশ থেকে আসা উপহার পায়, তখন তাদের চোখের জল আর হাসি মিশে একাকার হয়ে যায়।