ধর্মীয় রীতিনীতির ইতিহাসে কিছু দিন থাকে, যা একটিমাত্র সম্প্রদায়ের গণ্ডি পেরিয়ে একাধিক ঐতিহ্যের মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। মহররমের ১০ তারিখ বা আশুরা তেমনই একটি দিন।
আধুনিক মুসলিম সমাজে এই দিনটি মূলত কারবালার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু কারবালার বহু শতাব্দী আগে থেকে আশুরার একটি আলাদা ইতিহাস আছে—ইহুদি ও ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যকার একটি ধর্মতাত্ত্বিক সংযোগের ইতিহাস।
মদিনায় দুই সংস্কৃতির সাক্ষাৎ
হিজরতের পর মহানবী (সা.) মদিনায় এক বহুমাত্রিক সামাজিক পরিবেশের মুখোমুখি হন। মদিনায় তখন আরব গোত্রগুলোর পাশাপাশি বনু কুরাইজা, বনু নাজির ও বনু কাইনুকার মতো ইহুদি গোষ্ঠীর শক্তিশালী উপস্থিতি ছিল।
এই পরিবেশেই মহানবী (সা.) লক্ষ করলেন, ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে বিশেষ রোজা পালন করছে।
কারণ জানতে চাইলে তারা বলল, এই দিনে আল্লাহ বনি ইসরায়েলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং হজরত মুসা (আ.) কৃতজ্ঞতাস্বরূপ রোজা রেখেছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৯৪৩)
মহানবী (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তোমাদের চেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং তিনিও সেই দিন রোজা রাখলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০০২)
কারবালার বহু শতাব্দী আগে থেকে আশুরার একটি আলাদা ইতিহাস আছে—ইহুদি ও ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যকার একটি ধর্মতাত্ত্বিক সংযোগের ইতিহাস।
ধর্মতাত্ত্বিক ধারাবাহিকতা
নবীজির এই পদক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক বার্তা বহন করে। ইসলাম নিজেকে পূর্ববর্তী নবীদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ধর্ম হিসেবে দেখে না; বরং নবী আদম থেকে মুসা (আ.) হয়ে শেষ নবী পর্যন্ত একই তাওহিদি ধারার পরিসমাপ্তি হিসেবে।
পবিত্র কোরআনে পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি বিশ্বাসকে ইমানের অংশ করা হয়েছে (সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৩৬)। মুসা (আ.)-এর মুক্তির দিনটিকে ইসলামের ইবাদতের অংশ করে নেওয়ার মধ্যে এই ধারাবাহিকতারই স্বীকৃতি আছে।
ইওম কিপুর ও আশুরা: একটি জটিল প্রশ্ন
তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের গবেষকেরা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করে আসছেন—ইহুদি পঞ্জিকার কোন দিনটি মূলত হিজরি মহররমের ১০ তারিখের সঙ্গে মিলেছিল? ইহুদি ধর্মে ‘ইওম কিপুর’ বা প্রায়শ্চিত্তের দিন তাদের ‘তিশরেই’ মাসের ১০ তারিখে পালিত হয়, যেখানে কঠোর উপবাস ও আত্মশুদ্ধির রীতি আছে।
ইওম কিপুর এবং আশুরার মধ্যে একটি কাঠামোগত মিল দেখা যায়—উভয় ক্ষেত্রেই মাসের দশম দিন, উপবাস এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা বা ক্ষমা প্রার্থনার ধারণা আছে।
তবে এই তুলনাটি নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ আছে। দুটি ভিন্ন চান্দ্র পঞ্জিকা এবং দুটি ভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যের সূক্ষ্ম পার্থক্যকে উপেক্ষা করে সহজ তুলনায় না যাওয়াই সতর্ক অবস্থান।
ইওম কিপুর এবং আশুরার মধ্যে একটি কাঠামোগত মিল দেখা যায়—উভয় ক্ষেত্রেই মাসের দশম দিন, উপবাস এবং ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা বা ক্ষমা প্রার্থনার ধারণা আছে।
স্বতন্ত্র পরিচয় রক্ষার বিধান
ইহুদিদের রোজার সঙ্গে ধর্মতাত্ত্বিক যোগসূত্র থাকলেও ইসলাম তার অনুসারীদের নিজস্ব ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখার ব্যাপারে সচেতন। জীবনের শেষভাগে মহানবী (সা.) বলেছিলেন, ‘আগামী বছর বেঁচে থাকলে ৯ মহররমেও রোজা রাখব—যাতে ইহুদিদের সঙ্গে হুবহু মিল না থাকে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩৪)
পরের বছর ১০ মহররম আসার আগেই তিনি ইন্তেকাল করেন, কিন্তু তাঁর এই ইচ্ছার ভিত্তিতে ফিকহবিদেরা সিদ্ধান্ত নেন যে ৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ মহররম একসঙ্গে রোজা রাখা সুন্নাত। (ইমাম ইবনে কুদামাহ, আল-মুগনি, ৩/১৭৪, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮৫)
এই একটি বিধানে একসঙ্গে দুটি বিষয় আছে—পূর্ববর্তী নবীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজস্ব ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য রক্ষা।
শেষ কথা
আশুরার ইহুদি-ইসলামি সংযোগের ইতিহাস তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের একটি আগ্রহজনক অধ্যায়। এটি দেখায় যে ধর্মীয় ঐতিহ্যগুলো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়—একটি আদি ধারা থেকে একাধিক ঐতিহ্যে প্রবাহিত হওয়ার ইতিহাস আছে।
আশুরাকে শুধু কারবালার শোকের দিন হিসেবে দেখলে এই দীর্ঘ ইতিহাসের একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যায়। মুসা (আ.)-এর মুক্তির কৃতজ্ঞতায় রোজা রাখার যে মূল চেতনা, সেটিই আশুরার প্রথম এবং প্রামাণিক শিক্ষা।