সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিচারে ইসলামের ইতিহাস কেবল বিজয় বা সাম্রাজ্য বিস্তারের গল্প নয়, বরং এটি বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মিলেমিশে থাকার এক অনন্য উপাখ্যানও বটে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক প্রণীত ‘মদিনা সনদ’ থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন মুসলিম খেলাফতের শাসনামল পর্যন্ত—প্রতিটি যুগেই অমুসলিমদের নাগরিক অধিকার এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার এক সুসংহত রূপ লক্ষ করা যায়।
ইতিহাসের পাতায় তাকালে দেখা যায়, মুসলিমদের বিপদে যেমন অমুসলিমরা এগিয়ে এসেছে, তেমনি অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তায় মুসলিম শাসকেরাও ছিলেন আপসহীন।
নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদল যখন মদিনায় আসে, তখন তিনি তাদের মসজিদে নববির এক পাশে নিজ ধর্মের উপাসনা করার সাময়িক অনুমতি দিয়েছিলেন।
নবীজি ও সাহাবিদের যুগ
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মদিনা ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের মিলনস্থল। সহিহ বুখারির বর্ণনা অনুযায়ী, তৎকালীন মদিনায় মুসলিম, মুশরিক এবং ইহুদিদের এক মিশ্র জনবসতি ছিল। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪,৫৬৬)
আল্লাহর রাসুল (সা.) ‘মদিনা সনদ’ নামক একটি ঐতিহাসিক দলিলের মাধ্যমে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রকাঠামো গঠন করেন। সেখানে নাগরিকত্বের ভিত্তি নির্দিষ্ট ধর্ম ছিল না।
নবীজির ব্যবহারিক জীবনেও অমুসলিমদের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার অসংখ্য প্রমাণ মেলে। তিনি অসুস্থ ইহুদিকে দেখতে গিয়েছেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫৬) এবং অমুসলিমের শবদেহের সামনে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১১)
এমনকি নাজরানের খ্রিষ্টান প্রতিনিধিদল যখন মদিনায় আসে, তখন তিনি তাদের মসজিদে নববির এক পাশে নিজ ধর্মের উপাসনা করার সাময়িক অনুমতি দিয়েছিলেন। (ইবনুল কাইয়িম, আহকামু আহলিজ জিম্মাহ, ১/৩৯৭, দারুল ইলম, বৈরুত, ১৯৮৩)
সাহাবিদের যুগেও এই ঐতিহ্য অব্যাহত ছিল। ঐতিহাসিক ইবনে আসাকির (মৃ. ৫৭১ হি.) বর্ণনা করেছেন, হারিস ইবনে আবি রাবিয়ার খ্রিষ্টান মা যখন ইন্তেকাল করেন, তখন মহানবী (সা.)-এর অনেক সাহাবি তাঁর শেষকৃত্যে উপস্থিত হয়ে শোকাতুর পরিবারের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়েছিলেন। (তারিখু দিমাস্ক, ২৪/৪১১, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
জ্ঞানবিজ্ঞানে পারস্পরিক অংশীদারত্ব
মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে জ্ঞান অর্জন ছিল সর্বজনীন। মুসলিম ও অমুসলিমরা একে অপরের থেকে জ্ঞান আহরণ করতেন। প্রখ্যাত মুফাসসির মুকাতিল বিন সুলাইমান (মৃ. ১৫০ হি.) অনেক ক্ষেত্রে আহলে কিতাবদের (ইহুদি-খ্রিষ্টান) কাছ থেকে প্রাচীন গ্রন্থসমূহের জ্ঞান লাভ করেছেন। (ইবনে হাজার আসকালানি, তাহজিবুত তাহজিব, ১০/২৫০, মাতবাআতু দাইরাতুল মাআরিফ, হায়দ্রাবাদ, ১৩২৬ হি.)
অন্যদিকে ইবনে খাল্লিকান (মৃ. ৬৮১ হি.) প্রখ্যাত খ্রিষ্টান চিকিৎসক ইয়াহইয়া ইবনে জাজলার জীবনীতে উল্লেখ করেছেন, তিনি মুসলিম আলেমদের মজলিশে নিয়মিত যাতায়াত করতেন এবং তাঁদের সান্নিধ্যে থেকে চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শন চর্চা করতেন। (ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ’ইয়ান, ৬/২৫৫, দারু সাদির, বৈরুত, ১৯৭২)
এমনকি বাগদাদের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাঠাগারে মুসলিম-অমুসলিম শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে জ্ঞানচর্চা করত।
যখন শহরে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন মুসলিমরা কোরআন, খ্রিষ্টানরা ইঞ্জিল এবং ইহুদিরা তাওরাত হাতে নিয়ে সম্মিলিতভাবে রাজপথে নেমে আসেন এবং উমাইয়া মসজিদের চত্বরে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করেন।
সংকট ও প্রতিবাদে
ইতিহাসের কঠিন সময়েও মুসলিম ও অমুসলিমরা একে অপরের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছেন। ৩৯৪ হিজরিতে (১০০৫ খ্রিষ্টাব্দ) যখন শামে (সিরিয়া) জুলুম বৃদ্ধি পায়, তখন ফাতেমি সাম্রাজ্যের একজন উঁচু পদের খ্রিষ্টান কর্মকর্তা খলিফার বোন ‘সিত্তুল মুলকের’ কাছে গিয়ে শামের মুসলিমদের ওপর হওয়া অবিচার বন্ধের আবেদন জানান। (তারিখু দিমাস্ক, পৃষ্ঠা: ১৩০, মাতবাআতু আবিল আল-আরাবি, কায়রো, ১৯০৮)
আরও বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে ৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে দামেস্কে। যখন শহরে চরম অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তখন মুসলিমরা কোরআন, খ্রিষ্টানরা ইঞ্জিল এবং ইহুদিরা তাওরাত হাতে নিয়ে সম্মিলিতভাবে রাজপথে নেমে আসেন এবং উমাইয়া মসজিদের চত্বরে সমবেত হয়ে প্রার্থনা করেন। (আল-মাকরিজি, ইত্তিআযুল হুনাফা, ১/২২০, কায়রো, ১৯৬৭)
এটি প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সব ধর্মের মানুষ ঐক্যবদ্ধ ছিলেন।
ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তা
ইসলামি শরিয়তে অমুসলিমদের গির্জা ও সিনাগগ রক্ষা করা মুসলিমদের দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ যদি মানুষের এক দলকে অন্য দল দিয়ে প্রতিহত না করতেন, তবে মঠ, গির্জা, সিনাগগ এবং মসজিদ—যেগুলোতে আল্লাহর নাম অধিক স্মরণ করা হয়—তা ধ্বংস হয়ে যেত।’ (সুরা হাজ, আয়াত: ৪০)
ইতিহাসবিদ ইবনে কাসির উল্লেখ করেছেন, দামেস্ক বিজয়ের পর প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত মুসলিম ও খ্রিষ্টানরা একই চত্বরে নিজ নিজ ধর্ম পালন করেছেন। চত্বরের এক পাশে ছিল গির্জা এবং অন্য পাশে ছিল মসজিদ, আর উভয় ধর্মাবলম্বীরা একই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেন। (ইবনে কাসির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৯/১৪৬, দারু ইহইয়ায়িত তুরাসিল আরাবি, বৈরুত, ১৯৮৮)
বিখ্যাত ফকিহ লাইস ইবনে সাদ এবং ইবনে লাহিয়া ফতোয়া দিয়েছিলেন, খ্রিষ্টানদের গির্জা নির্মাণ ও সংস্কারের অনুমতি দেওয়া দেশ গড়ারই অংশ। (আল-মাকরিজি, আল-মাওয়ায়িজ ওয়াল ই’তিবার, ৪/৪৪৬, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৭)
ইবনে তাইমিয়ার মহানুভবতা
তাতাররা দামেস্ক আক্রমণ করে বিপুলসংখ্যক মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিককে বন্দী করে নিয়ে গেলে ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তাতার সেনাপতি কুতলু শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান।
সেনাপতি কেবল মুসলিমদের ছেড়ে দিতে রাজি হলে ইবনে তাইমিয়া কঠোর প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ‘আমরা কেবল মুসলিমদের মুক্তি নিয়ে সন্তুষ্ট হব না। আমাদের অমুসলিম নাগরিক, যারা ইহুদি ও খ্রিষ্টান, তাদেরও মুক্তি দিতে হবে। কারণ, তারা আমাদের আশ্রয়ে আছে এবং তাদের রক্ষা করা আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।’
১৩০৩ খ্রিষ্টাব্দে (৭০২ হিজরি) মারজ আস-সাফফারের যুদ্ধের পর ইবনে তাইমিয়া তাতারদের হাত থেকে বন্দীদের মুক্ত করতে এই সাহসী ভূমিকা রাখেন। তিনি নিজেই তাঁর গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা করে লেখেন, ‘যখন সে (সেনাপতি) আমাদের এই দৃঢ়তা দেখল যে আমরা সবাইকে মুক্তি দেওয়া ছাড়া ফিরব না, তখন সে আমাদের খাতিরে তাদের সবাইকে মুক্তি দিল।’ (ইবনে তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৬১৭, রিয়াদ সংস্করণ)
ইবনে জুবায়ের তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লেবাননের পাহাড় অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা সেখানে নির্জনে ইবাদত করা মুসলিম দরবেশদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন।
সমাজ ও উৎসবে মৈত্রীর বন্ধন
মুসলিম সমাজে বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবে অমুসলিম প্রতিবেশীদের অংশগ্রহণ ছিল অতি সাধারণ বিষয়। ইবনে জুবায়ের তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লেবাননের পাহাড় অঞ্চলের খ্রিষ্টানদের সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা সেখানে নির্জনে ইবাদত করা মুসলিম দরবেশদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেন এবং তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন। (রিহলাতু ইবনি জুবায়ের, পৃষ্ঠা: ২৭৯, দারু সাদির, বৈরুত)
এমনকি ১৯১৯ সালে মিসরের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় খ্রিষ্টান পাদরি সারজিউস আজহার মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে মুসলিমদের উদ্দেশে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা ধর্মীয় সম্প্রীতির ইতিহাসে এক অমলিন স্মৃতি হয়ে আছে।
ইসলামি ইতিহাসের এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় যে উদারতা ও সহিষ্ণুতা দেখা গেছে, তা আধুনিক যুগের মানবাধিকারের ধারণার চেয়েও প্রাচীন এবং শক্তিশালী। মাঝে মাঝে রাজনৈতিক কারণে কিংবা যুদ্ধের বিভীষিকায় এই সম্পর্কে চির ধরলেও ইসলামের মূল শিক্ষা ও ইতিহাসের মূল ধারাটি সব সময়ই ছিল ‘প্রীতি ও ন্যায়ের’।
এই আদর্শিক মৈত্রীই হাজার বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বৈচিত্র্যময় জনপদগুলোকে এক সুতায় বেঁধে রেখেছে।
আল-জাজিরা ডট নেট অবলম্বনে