চুল মানুষের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের একটি অংশ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চুলে পাক ধরা স্বাভাবিক। তবে অনেকের অল্প বয়সেই চুল সাদা হয়ে যায়। নানা কারণে এমনটি হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো যুবতী নারীর অল্প বয়সেই চুল সাদা হয়ে গেলে তা তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যে কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে। স্বামীও যদি বিষয়টি অপছন্দ করেন, তখন চুলের সাদা অংশ ঢাকার জন্য খেজাব ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিতে পারে।
চুলে খেজাব ব্যবহারের অনুমতি
চুলে খেজাব ব্যবহার করা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়; বরং সাদা চুল পরিবর্তন করার ব্যাপারে নবীজি (সা.) সাহাবিদের উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, ‘ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা (চুল) রং করে না। অতএব, তোমরা তাদের বিরোধিতা করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৫৯)
হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারির ‘খেজাব’ অধ্যায়ে। ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) এর ব্যাখ্যায় বলেন, ‘খেজাব বলতে মাথা ও দাড়ির পাকা চুলের রং পরিবর্তনের কথা বোঝানো হয়েছে।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ১৮/২০২, আর-রিসালাহ আল-আলামিয়্যাহ, দিমাশক, ২০১৩)
এ থেকে বোঝা যায়, সাদা চুলকে স্বাভাবিক রঙে পরিবর্তন করা নিষিদ্ধ নয়। তবে কোন রং এবং কোন পরিস্থিতিতে তা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা অবশ্যই বিবেচ্য বিষয়।
ফকিহরা কালো খেজাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হানাফি ফিকহে সাদা চুল হলুদ বা লালচে রং দিয়ে রাঙানোকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে এবং (স্বাভাবিক অবস্থায়) কালো খেজাবকে হারাম বলা হয়েছে।
কালো খেজাব নিয়ে সতর্কতা
কালো খেজাবের বিষয়ে কিছু হাদিসে সতর্কবাণী এসেছে। মক্কা বিজয়ের দিন আবু কুহাফাকে নবীজির কাছে আনা হলে তাঁর মাথা ও দাড়ি অত্যন্ত সাদা ছিল। তখন নবীজি (সা.) বলেন, ‘এটি কোনো কিছু দিয়ে পরিবর্তন করো এবং কালো রং থেকে বিরত থাকো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২১০২)
এ কারণেই ফকিহরা কালো খেজাবের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। হানাফি ফিকহে সাদা চুল হলুদ বা লালচে রং দিয়ে রাঙানোকে মুস্তাহাব বলা হয়েছে এবং (স্বাভাবিক অবস্থায়) কালো খেজাবকে হারাম বলা হয়েছে। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১০/৪৮৮, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)
অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে
কালো খেজাবের নিষেধাজ্ঞার পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর মাধ্যমে মানুষের স্বাভাবিক বার্ধক্যের ছাপ গোপন করা। প্রবীণ ব্যক্তি কালো খেজাব ব্যবহার করলে তার পাকা চুল ও বার্ধক্যের চিহ্ন আড়াল হয়ে যায়।
কিন্তু অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে সেখানে বার্ধক্য গোপন করার বিষয়টি থাকে না; বরং স্বাভাবিক বয়সের আগেই সাদা হয়ে যাওয়া চুলকে স্বাভাবিক সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্য থাকে।
এ পার্থক্যের প্রতি ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাবেয়ি ইবনে শিহাব জুহরি (রহ.)-এর বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘চেহারায় যখন যৌবনের সতেজতা ছিল, তখন আমরা কালো খেজাব ব্যবহার করতাম। অতঃপর যখন চেহারায় বার্ধক্যের ছাপ ফুটে উঠল এবং দাঁত দুর্বল হয়ে পড়ল, তখন তা ছেড়ে দিয়েছি।’ (ইবনে হাজার আসকালানি, ফাতহুল বারি বি-শরহি সহিহিল বুখারি, ১৮/২০৩, আর-রিসালাহ আল-আলামিয়্যাহ, দিমাশক, ২০১৩)
বার্ধক্যের ছাপ গোপন করার উদ্দেশ্যে কালো খেজাব ব্যবহার করা এবং অল্প বয়সে অকালপক্বতার কারণে সাদা হয়ে যাওয়া চুল ঢেকে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়।
অতএব, বার্ধক্যের ছাপ গোপন করার উদ্দেশ্যে কালো খেজাব ব্যবহার করা এবং অল্প বয়সে অকালপক্বতার কারণে সাদা হয়ে যাওয়া চুল ঢেকে স্বাভাবিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা এক বিষয় নয়। অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে তাই কালো খেজাব ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।
এই অবকাশের সঙ্গে দাম্পত্য জীবনের প্রেক্ষাপটও সংগতিপূর্ণ। বিবাহিত জীবনে স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য সুন্দর ও পরিপাটি থাকার চেষ্টা করবেন। এটি ইসলামি দাম্পত্য জীবনের স্বাভাবিক সৌন্দর্য। আর বৈধ উপায়ে নিজেকে আকর্ষণীয় রাখা দাম্পত্য সম্পর্ককে আরও প্রীতিময় করে তোলে।
তাই কোনো নারীর অল্প বয়সে চুল পেকে গেলে এবং স্বামী তা অপছন্দ করলে, বৈধ পদ্ধতিতে চুলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা দাম্পত্য জীবনের সৌন্দর্যের পরিপন্থী নয়। এমন ক্ষেত্রে নারীর জন্যও কালো খেজাব ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে। (রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ১০/৪৮৮, দারু আলামিল কুতুব, রিয়াদ, ২০০৩)
সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা
কালো খেজাবের ব্যাপারে যেহেতু হাদিসে সতর্কতা রয়েছে, তাই যুবতীদের জন্যও কালোর সঙ্গে মেহেদি বা লালচে রং মিশিয়ে ব্যবহার করা উত্তম এবং অধিক সতর্কতাপূর্ণ।
এতে একদিকে অল্প বয়সে পেকে যাওয়া চুলের সৌন্দর্যগত সমস্যা দূর হবে, অন্যদিকে কালো রং সম্পর্কে বর্ণিত সতর্কতার প্রতিও যতটা সম্ভব আমল করা হবে।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা