দাড়ি কেন রাখতে বলে ইসলাম

ছবি: পেক্সেলস

ইসলামে দাড়ি রাখা একটি আবশ্যকীয় বিধান, যা একজন মুসলিমের পরিচয় বহন করে। আধুনিক যুগে অনেকে একে ঐচ্ছিক বা গুরুত্বহীন মনে করলেও, কোরআন ও হাদিসের আলোকে দাড়ি রাখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়।

দাড়ি রাখা নবীদের সুন্নত

দাড়ি রাখা শুধু নবীজির সুন্নত নয়, বরং এটি পূর্ববর্তী নবী-রাসুলদেরও রীতি ছিল। পবিত্র কোরআনে নবী হারুনের দাড়ির কথা রয়েছে, যেখানে তিনি তাঁর ভাই নবী মুসাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, ‘হে আমার সহোদর, আমার দাড়ি ও মাথার চুল ধরো না।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ৯৪)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, দাড়ি নবীদের একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত বৈশিষ্ট্য ছিল।

হাদিসে দাড়ি রাখার নির্দেশ

দাড়ি রাখার ব্যাপারে পবিত্র হাদিসে স্পষ্ট নির্দেশনা এসেছে। নবীজি (সা.) নিজে দাড়ি রাখতেন এবং উম্মতকে দাড়ি লম্বা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘মোচ কাটো এবং দাড়ি ছেড়ে দাও (লম্বা করো), আর অগ্নিপূজকদের বিপরীত আচরণ করো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬০)

আরও পড়ুন

দাড়ি রাখার বিধান

দাড়ি ইসলামের শিআর ও পরিচয়চিহ্ন। যেহেতু এটি সব নবীর পবিত্র রীতি ছিল, তাই একে ‘সুন্নত’ও বলা হয়। তবে এটি সাধারণ ঐচ্ছিক সুন্নতের মতো নয়, বরং ‘সুন্নাতে ওয়াজিবা’, যা সুন্নাতে মুআক্কাদা অপেক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ এবং যা পরিত্যাগ করলে পাপ হয়।

দাড়ি রাখার পরিমাণ হলো সর্বনিম্ন এক মুষ্টি। এর কমে দাড়ি কাটা সব ইমামের ঐকমত্যে নিষিদ্ধ। (আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি, ফাইজুল বারি শারহু বুখারি, ৬/৯৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫)

দাড়ি রাখার ফজিলত

দাড়ি ইসলামি শরিয়তে একটি স্বীকৃত সুন্নত ও মুসলিম পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দাড়ি রাখার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত রয়েছে। যেমন—

১. সুন্নতের অনুসরণ : দাড়ি রাখার মাধ্যমে একজন মুসলিম রাসুল (সা.) ও পূর্ববর্তী নবীদের সুন্নতকে জীবনে বাস্তবায়ন করেন, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি মাধ্যম। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ২১)

২. রাসুলের আদেশ মানা: দাড়ি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ মান্য করার একটি দৃশ্যমান প্রকাশ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি যখন তোমাদের কোনো ব্যাপারে নিষেধ করি, তখন তা থেকে বেঁচে থাকো। আর যখন কোনো বিষয়ে আদেশ করি, তখন সাধ্যানুযায়ী তা পালন করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭২৮৮)

৩. ভিন্ন ধর্ম থেকে স্বাতন্ত্র্য: দাড়ি রাখার মাধ্যমে একজন মুসলিম মুশরিক ও অন্যান্য জাতি থেকে নিজেকে পৃথক রাখে, যা নবীজির সুস্পষ্ট নির্দেশ। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের উল্টো করবে—দাড়ি লম্বা রাখবে, গোঁফ ছোট করবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৮৯২)

আরও পড়ুন

৪. পাপ থেকে বাঁচার মাধ্যম: মুখে দাড়ি থাকলে একজন মানুষ স্বভাবতই অনেক অন্যায়, অশ্লীল বা পাপের কাজ থেকে লজ্জাবোধ করে দূরে থাকে, আর লজ্জা ইমানেরই একটি অংশ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘ইমানের ষাটেরও অধিক শাখা আছে। আর লজ্জা হচ্ছে ইমানের একটি শাখা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯)

৫. শহীদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ: বর্তমান সময়ে ভিন্নধর্মীদের অনুকরণ মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন নাজুক সময়ে যে নবীজির সুন্নত পালনকারীর জন্য রয়েছে মহা সুসংবাদ। হাদিসে এসেছে, ‘আমার উম্মতের ফাসাদের সময় যে আমার সুন্নতকে ধারণ করবে, সে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।’ (তাবরানি, হাদিস ৫৪১৪)

৬. নবীজি চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য: একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় সৌভাগ্য আর কী হতে পারে যে তার চেহারা প্রিয় নবীজির চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে! তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪০৩১)

৭. জান্নাতে নবীজির সঙ্গলাভ: সুন্নাহ অনুসরণের মধ্য দিয়ে নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ পায়, যার প্রতিদানে তিনি বলেছেন, ‘যে আমার সুন্নত জীবিত রাখল, সে আমাকে ভালোবাসল। আর যে আমাকে ভালোবাসল, সে জান্নাতে আমার সঙ্গে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৬৭৮)

আরও পড়ুন